সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
দেশের স্বাধীনতা আসছে। ভারতবর্ষ স্বাধীন হচ্ছে। আমরা স্বাধীন হচ্ছি।
প্রমোদবাবু স্যার ব্যতিক্রমী চিন্তার মানুষ। ইংরাজ-ভক্ত। ১৯২০ সালে তিনি অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাবরণ করেছিলেন। দুমাস পর কারামুক্ত হয়ে বাইরে এলেন একেবারে অন্য মানুষ। ইংরাজভক্ত সেই থেকে। তাঁর চিন্তাভাবনা, যুক্তি বিচার সেই মতো। কথাবার্তায় তিনি অকপট। এখন তিনি বলতে শুরু করেছেন, বলো আমরা পরাধীন হতে চলেছি। আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতা তো এনে দিয়েছে ইংরাজ শাসক। আজকের আমরা, আমাদের যাবতীয় চিন্তাভাবনা, এমনকি এই রাজনৈতিক কার্যকলাপ বা এই জাতীয়তাবোধ, সব-সবই তো ইংরাজদের অবদান। একালের আমরা, আমাদের চিন্তাভাবনা, আচার বিচার, সবই তো ইংরাজ শাসক সৃষ্ট। তাদেরই অবদান তাদেরই ছত্রছায়ায় আমাদের জীবন যাপন। সেই ইংরাজ চলে গেলে আমাদের কোন দশা হবে? ইংরাজের এই গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, আমাদের এই ব্যক্তি স্বাধীনতা, এ কি বজায় থাকবে ইংরাজ চলে গেলে? বলতে পারো, তাহলে কি হবে? এক কথায় এর উত্তর মিলবে না। তবে ইঙ্গিত দেওয়া যায় কিছুটা। সিপাহী বিদ্রোহের কথাই ধরো। কারা করেছিল? ক্ষমতাচ্যুত কিছু সামন্তরাজা, তাঁদের বেকার সেনাপতি আর সেনা বিদ্রোহের ধ্বজা তুলেছিল, মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহকে তাঁদের নেতা খাড়া করে। যদি তারা জিততো! তাহলে? ফিরে আসতো সেই মোগল শাসন, সেই মধ্যযুগীয় সামন্ত্রতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা। সেটা স্বাধীনতা না পরাধীনতা? আর সেখানেও বিদ্রোহের সূচনা করা হলো ধর্মকে অস্ত্র করে। বন্দুকের টোটায় শুকর চর্বি লাগানোর গুজব। ধর্মীয় আবেগকে উসকে তোলা।
কাজী নজরুল আক্ষেপ করে লিখেছেন -
"ভারত ভাগ্য করেছে লোহিত
ত্রিশূল ও তরবারি।"
হিন্দু রাজা ও মুসলমান রাজায় যুদ্ধ হচ্ছে, হিন্দু সৈন্যেরা ধ্বনি তুলছে হর হর মহাদেও, মুসলমান সৈন্যেরা আল্লাহো আকবর। যেন রাজায় রাজায় যুদ্ধ নয়, যুদ্ধ ধর্মে ধর্মে। সিপাহী বিদ্রোহে সেই ধর্মকেই ব্যবহার করা হলো। যেন বলা হলো, খৃষ্টান তাড়াও, ইংরাজ নয়। আমরা তো এই গণ্ডির বাইরে আসতে পারিনি। ১৯২০ সালে আমি স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দিয়ে জেল খাটলাম। তখনই আমাার চিন্তা-ভাবনা পালটে গেল। তখনই মনে হলো ইংরাজই আমাদের মুক্তিদাতা। আমরা চলেছি ভুল পথে। ইংরাজ তাড়ানো আন্দোলনেও সেই ধর্ম পালন করতে হবে। বঙ্কিমের আনন্দমঠ পড়া হবে, গীতা পাঠ করতে হবে, আরও ওই রকম কতো কি। কেন? রাজনৈতিক সংঘাতে ধর্ম কেন? ইংরাজ শাসন কি আদৌ শাসন? আমরা হিন্দু মেলা করলাম, হিন্দু কলেজ, হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় খুললাম, অর্থাৎ আমরা বিচ্ছিন্ন হলাম - অন্যদের থেকে। তারা চুপ করে থাকবে কেন? তারা মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় খুলল। শেষে পাকিস্তানের দাবী তুলল। আমরা স্বখাত সলিলে ডুবলাম। সিপাহী বিদ্রোহ মান্যতাও পেয়েছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতা -
পঞ্চশরে দগ্ধ করে
করেছ একি সন্ন্যাসী
বিশ্বময় দিয়েছ তাকে ছড়ায়ে।
সিপাহী বিদ্রোহের সেই ভূত ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে স্বাধীনতা আন্দোলনের নামে। তার পরিণতি তো দেখা যাচ্ছে। এরপর যখন ইংরাজ থাকবে না তখন আমাদের ভূমিকা কি হবে সে তো স্পষ্ট। স্বাধীনতা হারিয়ে মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিকতার অন্ধকারে পুনরায় চতুর্দিক আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া। আমি স্পষ্ট দেখছি, আমাদের জীবনে অন্ধকার যুগ নেমে আসছে। আমরা হেরে যাচ্ছি, পরাজিত হচ্ছি। ইংরাজ শাসক বিদায় নেবে। আমরা আবার স্বাধীন হবো। আমাদের নিজেদের ধর্ম-কর্ম নিয়ে ইচ্ছামত জীবন যাপন করতে পারব। মানুষের মনে তার প্রস্তুতি চলছিল যে কত ভাবে।
দেশে যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামা চলেছে অশান্তি ও অস্থিরতার কালো ছায়া গ্রাস করছে সমাজকে, মানুষ ক্রমশই ভয় তাড়িত, তখন উচ্চবর্ণের শিক্ষিত কিছু হিন্দু ব্যক্তি শহরে একটা নতুন হাওয়া তুললেন। মেহেরপুর শহরে একটি কালীবাড়ি ছিল, সিদ্ধেশ্বরী কালী। অনেক কালের পুরনো। সেখানে ভক্তরা পাঁঠা মানত করে। পাঁঠা নিয়ে আসে মন্দিরে। পুরোহিত পাঁঠাকে উৎসর্গ করে দেন দেবীর নামে মন্ত্রপাঠ করে। কিন্তু পাঁঠা বলি হয় না সেখানে। পুরোহিত পাঁঠা নিয়ে বাড়ির ভিতর খোঁয়াড়ে পুরে দেন। তারপর নিজেরা মাংস খান কিংবা বিক্রি করে দেন। দীর্ঘকাল ধরে এই রীতি চলে আসছিল।
এখন এই ব্যক্তিরা বললেন, এটা অনাচার। বলির পাঁঠা দেবীর সামনে বলি হওয়াই রীতি। সেটাই শাস্ত্রীয় আচার। সেটা না করে নিজেরা কেটে খাওয়া কিংবা কসাইয়ের কাছে বিক্রি করা ঘোরতর অনাচার, অশাস্ত্রীয় কাণ্ড। ধর্মের ব্যভিচার। ধর্মীয় আচারকে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন, স্বাধীনতা আন্দোলনের এটা একটা অঙ্গ। শুধু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা তো প্রকৃত স্বাধীনতা নয়।
গান্ধীজী বলছেন সর্বোদয়, তার অর্থ কি? আমাাদের এখন মাথা তুলে দাঁড়ানো প্রয়োজন। ভক্ত পাঁঠা মানত করছেন দেবীর উদ্দেশে। সে পাঁঠা দেবীর সামনে বলি দিতেই হবে। উৎসর্গ করা পাঁঠা নিজেরা কেটে খাওয়া কিম্বা কসাইয়ের কাছে বিক্রী করা সাংঘাতিক ব্যাপার। দেবতার অসম্মান।
তাঁরা প্রচার শুরু করলেন, কালীবাড়িতে পাঁঠা বলি হবে। তাঁরা আন্দোলন করলেন, সত্যাগ্রহ করলেন। পুরোহিত সেবাইতরা বলতে থাকলেন, আমরা কখনো ওসব করিনি, আমরা তো ওসব করতে পারব না। কিন্তু শহরের মানুষ যদি জোর করে তাহলে আমরা কি করব?
বস্ত্র ব্যবসায়ী সুরজমল আগরওয়ালরা (সূর্যদাদা) মাড়োয়াড়ি সমাজকে ডেকে বললেন, ভাই কালীবাড়ির পাশে আমাদের বাড়ি ঘর। কালীবাড়িকে আমরা অর্থ সাহায্য করি নিয়মিত। এখন ওখানে পাঁঠাবলি দেবে বলেছে, তোমার হাতে তো শহরের অনেক ছেলে, তুমি সকলকে বলে এটা যাতে না হয় তার ব্যবস্থা করে দাও। তোমাদের ক্লাবকে আমরা চাঁদা দেব। তোমরা অনুষ্ঠান করো, ওর তো খরচ আছে। দেখ ভাই, একটু চেষ্টা করো।
আমি ব্যাপারটা জানতাম। উদ্যোগীদের অনেকেই ছিলেন আমার পরিচিত, কারও কারও বাড়িতে আবার যাতায়াত ছিল। তাঁদের কথাবার্তা শুনতাম। তাঁরা হিন্দুত্বের জাগরণ ও শাস্ত্রীয় আচারের প্রতিষ্ঠায় উৎসাহী। তাঁদের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা এমনই যে আমার পক্ষে প্রত্যক্ষভাবে কিছু বলা সম্ভব ছিল না। আমি আমার সংস্থার যুবকদের সঙ্গে আলোচনা করলাম। ওই বলি কেউই চায় না। শেষে পালটা আন্দোলন ঠিক নয়, বিরোধী শক্তি দানা বাধল। জনমত বিরুদ্ধে চলে যাওয়ায় পাঁঠা বলির উদ্যোগীরা পিছু হটলেন। কারণ যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে শান্তিভঙ্গের ফলে পুলিশ হস্তক্ষেপ করবেই - পরিস্থিতি অন্যরকম হয়ে যাবে। অতএব তাঁরা রণে ভঙ্গ দিলেন। কিন্তু ফুঁসতে থাকলেন এই বলে যে - এটাই হচ্ছে পরাধীনতা। দেশ স্বাধীন হোক - তখন দেখা যাবে - তখন তো আর কোন ধর্ম কর্মে বাধা থাকবে না।
ধনুদা - রবীন মুখোপাধ্যায় - এখানকার মুখোপাধ্যায় জমিদার বংশীয় যুবক। লেখাপড়ায় বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেননি। সঙ্গীতচর্চা করেন - বেকার জীবন। এঁর দাদা পরোধিকুমার মুখোপাধ্যায় - সাহিত্য চর্চা করেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সজ্জন পরিবার। পিতা উমানাথ মুখোপাধ্যায় কলকাতায় এন্ট্রান্স অবধি পড়েছেন। হিতবাদী, বঙ্গদর্শন ইত্যাদি পত্রিকার গ্রাহক ছিলেন। কিন্তু জমিদারের বংশ কমতে কমতে তলানিতে এসে ঠেকেছে। শহরের প্রাচীন জমিদার পরিবার। প্রাচীন বাড়ি-ঘর দুর্গের মতন। সদর দেউড়ি পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলে চারদিকে বাড়ি-ঘর, মাঝখানে সরু অন্ধকার গলিপথ। সেকেলে বাড়ি, কত ধ্বংসস্তূপ - বন, ঝোপ, সাপখোপের আড্ডা। সেসব পেরিয়ে গলি দিয়ে গিয়ে একটা বাড়ির দোতলায় এঁদের বসবাস। দোতলায় উঠলে ছাদ কাঁপে, মনে হয় ভেঙে পড়বে এখনই। ধনুদা, পয়োধিদা, এঁদের বৃদ্ধ পিতা উমানাথ মুখোপাধ্যায় রূপবান পুরুষ, জমিদার - সকলে মিলে বসে কত গল্প কত আলোচনা করেন কত পুরনো যুগের জীবনযাপন কথা। শুনতে শুনতে কোন এক মায়াময় জগতে চলে যেতে হয়। দেহ মনে রোমাঞ্চ জাগে।
বিকালে ওঁদের ঘর থেকে বেরিয়ে খিড়কি দিয়ে নামছিলাম - পাশে ধনুদা। প্রশ্ন করলাম ধনুদা আপনাদের ঘরের ছাদ কাঁপে কেউ হাঁটা চলা করলেই, কিন্তু সিঁড়িটা তো বেশ শক্তপোক্ত।
- সিঁড়িটা যে নতুন। ধনুদা বললেন, ঠাকুর্দার মৃত্যুর পর বাড়ি ভাগ হলো। বাবা পেলেন দোতলা অংশ। উঠবেন কিভাবে? তখন এই সিঁড়ি করতে হলো। সিড়ির শেষ ধাপে নেমে তিনি বললেন, এই যে ধাপ এই যে চাতাল দেখছ - এখানে ছিল মস্ত এক ইঁদারা জলের জন্য নয়। এই জায়গাটা ছিল গুমখানা - মানুষ খুন করে এনে এই ইঁদারায় ফেলত। কাকপক্ষী কেউ জানতে পারত না।
এই জমিদার বংশের অতীতের অনেক অনৈতিক কার্যকলাপের কথা গল্প হিসাবে প্রচলিত। সে সব আমিও শুনেছি। কিন্তু এখন সন্ধ্যার প্রাক্কালে নির্জন স্থানে চাতালের ওপর দাঁড়িয়ে গুমখানার কথা শুনে আমি হতবাক। জমিদার বাড়ির গুমখানার সেই ভয়ংকর ইঁদারার ওপরে আমি দাঁড়িয়ে আছি জেনে। রোমাঞ্চিত কলেবর। আমি উনিশ। ধনুদার বয়স বছর পঁচিশ। জমিদার নন্দন। তিনি কেঁদে উঠলেন ফুঁপিয়ে। কেঁদে কেঁদে বলতে থাকলেন, আমরা অভিশপ্ত। আমাদের অভিশপ্ত জীবন। কিন্তু আমাদের কোন অপরাধ! পূর্বপুরুষ পাপ করেছে, আমাদের ওপর সেই পাপের ফল বর্তেশে - প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে জীবন দিয়ে। লেখাপড়া হলো না - বেকার, কপর্দক শূন্য - কেন? সব পূর্বপুরুষের অপরাধের ফল।
কিছুটা অপ্রতিভতা কাটিয়ে বললাম, কাঁদছেন কেন?
- কাঁদব না? কান্নায় যে বুক ফেটে যায় - কী জীবন আমাদের!
আমি তাঁর চোখ মুছিয়ে দিলাম। তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে এলাম, তাঁদের দেউড়ির সামনের মাঠে। সবুজ ঘাসের ওপর দুজনে বসলাম। সুপ্রশস্ত মাঠ। মাঝখান দিয়ে চলে গিয়েছে রাজপথ। এই মাঠেই রথ- নাগরদোলার মেলা বসে। এই জমিদার বাড়িরই উৎসব।
ধনুদা তাঁর মনের ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকলেন। আমাদের কপালটা খুবই মন্দ। ঠাকুরদার মৃত্যুর পর পৈতৃক সম্পত্তি ভাগ হলো। জায়গাজমি বাদে বাবা ভাগে পেলেন নগদ এক লক্ষ টাকা। সেটা উনিশ শতকের শেষ দিকের কথা। কিন্তু বাবা সেই সব টাকা খুইয়ে ফেললেন। কোন বদখেয়ালে নয় - বাস্তববোধশূন্য আদর্শবাদিতার জন্য। দীনেশ কুমার রায় সাহিত্যিক, মেহেরপুরের মানুষ। তিনি বাবাকে নিয়ে কটা গল্প লিখেছেন - সে তো তুমি জানো। সেখানেও বলা হয়েছে বাবার অবাস্তব চিন্তাভাবনার কথা। অর্থের অপচয় ঘটেছে। কিছু কাজ ভালও হয়েছে। হাইস্কুলটা মুখার্জী আর মল্লিক জমিদারদের দানেই তৈরি। একবার উঠে যাওয়ার দশা হয়েছিল। সেসময় দেশে এক বছর অতি বর্ষণ আর বন্যা হলো, পর বৎসর হলো খরা-দুর্ভিক্ষ। গ্রামের হিন্দু-মুসলমান, খৃষ্টান হয়ে যেতে থাকল প্রাণের দায়ে, পেটের দায়ে। তখন গ্রামের ছেলে আর পড়তে আসে না ইস্কুলে। ছাত্রবেতন আদায় হয় না। শিক্ষকদের বেতন হয় না। ইস্কুল থাকবে কেমন করে? এস.ডি.ও. সাহেব সভা ডেকে শহরের শিল্পীদের বললেন, আপনারা অর্থ সাহায্য না করলে ইস্কুল থাকে না? শিক্ষকদের এক বছরের বেতন হয় তেমন একটা অর্থ ভাণ্ডার দরকার।
চাঁদা উঠতে থাকল। দু’টাকা তিন টাকা, বড়জোর পাঁচ টাকা। এস.ডি.ও. সাহেব বললেন, এতে তো হবে না। মাত্র কয়েক’শ টাকায় তো হবে না। অন্তত দু-তিন হাজার দরকার। আর দাতা নেই। কেউ কথা বলে না আর।
এস.ডি.ও. সাহেব বললেন, তাহলে ইস্কুলটা থাকে না। একবার বন্ধ হলে আর কি খুলবে? আপনাদের ছেলেরাই তো পড়ে। বাবা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, লিখে নিন আমার চাঁদা বাবদ দশ হাজার টাকা। এস.ডি.ও. সাহেব বলে উঠলেন, আর দরকার নেই, এতেই হবে। অনেক হবে।
শরিকরা বললেন, নিঃশর্ত ভাবে দেবেন না। শর্ত আরোপ করুন। বলুন এই দানের বিনিময়ে আমাদের বংশের একজন ম্যানেজিং কমিটিতে থাকবে। আর বলুন চারজন ছাত্রকে ফ্রি স্টুডেন্টশিপ দিতে হবে। নির্বাচন করবে আমাদের বংশের প্রতিনিধি।
বাবা বললেন, না - আমার দান নিঃশর্ত। কোন শর্তই থাকবে না। ইস্কুলের ভালো-মন্দ নিয়ে যা করার করবেন জনপ্রতিনিধি আর শিক্ষকেরা। অকারণ তাঁদের অবিশ্বাস করা কেন?
এই আদর্শবাদী মানুষও পরাজিত হলেন কী বলে! কপর্দক শূন্য। কাঁদেন বসে বসে। ওই ইস্কুলে কত ছেলে পড়াশোনা করে। কিন্তু আমি পারলাম না। কেন? এ কি অকারণ? আমাদের রক্ত মধ্যে সেই পাপ, সেই বিষ আমাদের সর্বনাশ করে চলেছে। ভালো হতে চাইলেও ভালো হতে পারিনে। মাধবদা, মটরদা, ভোম্বলদা (ডা: শক্তি ভট্টাচার্য) কম্যুনিস্ট পার্টি করেন। ওঁদের বক্তৃতা শুনি - জমিদারের বিরুদ্ধে বলেন - খুব ভালো বলেন। মাঝে মাঝে মনে হয় ওঁদের দলে ঢুকে পড়ি। পারিনে। এই জীবন, এই বেকারির জ্বালা সহ্য হয় না। এই জমিদারি থেকে, এই পরিবেশ থেকে পালাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কোথায় যাব? দেশের স্বাধীনতা এলে হয়তো পরিবর্তন আসবে। বাঁচার পথ খুলে যাবে। তখন সেটার জন্যই প্রতীক্ষা। স্বাধীনতা পরিবর্তন আনবে - কি বল?
একটা চওড়া সুরকি ঢালা পথ চলে গিয়েছে মুখার্জী পাড়ার ভিতর দিয়ে। সেই পথের ধারেই নিচু পাঁচিল দেওয়া একটা বাড়ি। বাঁশের একটা হুড়কো লাগানো রয়েছে প্রবেশ পথে। ভিতরে খানিকটা সবুজ মাটি। তারপর খোলা রোয়াকওয়ালা ছোট একতলা বাড়ি। বৈঠকখানা নেই। তাই মাঠের একপাশে খুঁটি দিয়ে টিনের চালা তোলা হয়েছে। এটাই ড: ভবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি। চারদিক খোলা টিনের চালার তলায় একটা ইজিচেয়ার, দুটো চেয়ার আর একটি ছোট টুল পাতা। টুলে একটা পাত্রে রাখা আগুন। বিকালে ভবনাথ ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে থাকেন। মাঝে মাঝে অর্ধপোড়া বিড়িটা আগুনে ধরিয়ে নিয়ে টানেন। অথবা কাস্তে দিয়ে মাঠের ঘাসের ডগাগুলো ছাঁটেন।
বাল্যকালে তাঁকে দেখেছি - পথে হাঁটছেন- পায়ে জুতো মোজা, পরনে খাঁকি হাফপ্যান্ট, সাদা হাফ সার্ট, মাথায় হ্যাট (সোলার টুপি), একহাতে শৌখিন লাঠি, অন্য হাতে সিগারেট আর দেশলাই, মুখে জ্বলন্ত সিগারেট। হাঁটছেন যেন ছুটছেন - যেন কেউ তাকে ধরতে না পারেন। সকলে বলত সাহেব বাবু।
এখন পায়ে টায়ারের চটি, পরনে নীল রঙের মোটা ছিটের পাজামা, নীল রঙেরই মোটা ছিটের পাঞ্জাবি। মাথায় সেই হ্যাট, মুখে বিড়ি, হাতে লাঠি। সেই আগের মতোই দৌড়ে হাঁটেন - কেউ যেন ছুঁতে না পারেন। লোকে বলে পাগল, পাগলা সাহেব। শিক্ষিতজনেরা কেউ মৃদু হেসে বিদ্রুপের সুরে বলেন, হ্যামিলটন সাহেব।
সত্যিই এ শহরের কেউ তাঁকে ছুঁতে পারেনি কোন দিন। তাঁর মতো শিক্ষিত পদমর্যাদা সম্পন্ন ভাগ্যবান আর কেউ নেই। তাঁর মতো বিপন্ন অসহায় ভাগ্য বিপর্যস্তও আর কেউ নেই এই শহরে। তিনি অনন্য, একক, নিঃসঙ্গ। মেশেন না তেমন বিশেষ কারও সঙ্গে। নিজের আত্মীয়দের সঙ্গেও নয়। কারও সঙ্গে মিশতে দেন না পরিবারের কাউকে। স্বপরিবারে এক অভিশপ্ত বন্দী জীবনযাপন করেন। কেউ যেন সাহসও করে না তাঁর সঙ্গে মিশতে।
আমি মাঝে মাঝে তাঁর কাছে যাই। তাঁর সেই চালার তলায় বসি তাঁর পাশে। পরিচিতরা অবাক হয়ে বলেন, বাঘের খাঁচায় ঢুকেছিলে? কিছু বলে না? কি গল্প করো? তোমার সাহস আছে বলতে হবে - কিন্তু সাবধান থেকো - কোনদিন ক্ষেপে যাবে। সত্যিই - এঁর আঙিনায় প্রবেশ সেও এক অঘটন।
বিকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এক কবি বন্ধুর কাছে যাচ্ছিলাম। এই বাড়ির কাছে এসে দেখি পথে কৌতূহলী মানুষের ভীড়। প্রশ্ন করলাম,
- কি হয়েছে?
একজন মৃদু স্বরে বলল, একজন মরেছে - পুঁতছে।
- পুঁতছে?
- হ্যাঁ, খেরেষ্টানতো।
আমি সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। আর দেখলাম, প্রবেশপথের ওপাশে পাঁচিল ঘেঁষে ডান দিকে কোদাল দিয়ে গর্ত খুঁড়ছেন ইংরাজ পাদরী রেভারেন্ড হার্ডফোর্ড। পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন ড: বন্দ্যোপাধ্যায়।
হার্ডফোর্ড আমার পরিচিত। শহরের দক্ষিণপ্রান্তে মুন্সেফবাবুর নদীতীরে একটা গীর্জা। বাড়ি আছে, প্রটেস্টটান্টদের। সেখানে থাকেন হার্ডফোর্ড। কতোকাল যে এখানে আছেন! এখন বয়স প্রায় ষাট হবে। পরনে সাদা প্যান্ট সার্ট লম্বা ছিপছিপে মানুষ।
একটা ছোট গর্ত খোঁড়া হল। তারপর ড: ভবনাথের সঙ্গে হার্ডফোর্ড ঘরের দিকে গেলেন। ফিরে এলেন একটি মৃত শিশুকে কোলে নিয়ে। তখন ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে পরিবারের মহিলারা ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। শিশুকে গর্তে শায়িত করে প্রথমে ড: ব্যানার্জী তাতে মটি দিলেন। তারপর হার্ডফোর্ড মাটি দিয়ে গর্ত ভরাট করলেন। ভবনাথের দু'চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
হার্ডফোর্ড এবার বাইরের জনতার দিকে তাকালেন। আমার দিকে এগিয়ে এলেন। আমার হাতে ছিল কাগজের মোড়া গোলাপের একটি তোড়া। আমার কবি বন্ধুর জন্য নিয়ে যাচ্ছিলাম। হার্ডফোর্ড বললেন, ফুল তোমার?
- হ্যাঁ।
- তাহলে দাও - সমাধিতে দিই।
আমি তোড়াটা দিলাম। হার্ডফোর্ড সেটা সমাধিতে রাখলেন। তখন ড: ব্যানার্জী আমার দিকে তাকালেন। হার্ডফোর্ড ভবনাথকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। আমাকে বললেন, কোথায় যাবে?
- বাজারের দিকে।
- চলো, এক সাথে যাই খানিকটা।
হার্ডফোর্ড বললেন, আমি সময় পেয়েই চলে এলাম। জানি তো জানি, বড় অভিমানী মানুষ। কারও সাহায্য চাইবেন না, কারও করুণা নির্ভর হবেন না। সব দুঃখ কষ্ট একা সইবেন। আজ কী করুণ পরিণতি! দুর্ভিক্ষ এলো - জিনিসপত্র অগ্নিমূল্য হলো। অর্থাভাবে কাতর হলেন। সমস্ত পরিবার বেরীবেরী রোগে আক্রান্ত - অপুষ্টি। শিশুকন্যা বাঁচতে পারল না। দুর্ভাগ্য। তোমার ফুলের তোড়াটা খুব ভালো কাজে লেগে গেল। তোমরা ড: ব্যানার্জীকে একটু দেখো। তোমাদের মধ্যেই তো থাকেন।
- উনি কি খৃষ্টধর্মাবলম্বী?
- না-না। হিন্দু। ব্রাহ্মণ।
পরদিন বিকালে স্কুল থেকে ফেরার পথে ড: ব্যানার্জীর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সমাধিটা দেখছিলাম। আমার দেয়া ফুলগুলো রোদে পুড়ে শুকিয়ে গিয়েছে। ড: ব্যানার্জী ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। শান্ত কন্ঠে বললেন, তুমি কাল ফুল দিয়েছিলে?
- হ্যাঁ।
- তোমার বাড়ির ফুল?
- হ্যাঁ।
- অনেক গাছ আছে?
- কিছু আছে।
- কোথায় পেলে গাছ?
- কলকাতার গ্লোব নার্সারি থেকে আনিয়েছি।
- তোমার বাড়ি কোথায়?
- তাঁতি পাড়ায়।
- কি করো?
- স্কুলের শিক্ষক।
- এই ফুল আরও দিতে পারো? কদিন এখানে দিতাম।
- দেব। আজই এনে দিচ্ছি।
দিন তিনেক পর বিকালে ড: ব্যানার্জী বললেন, ভিতরে আসবে? একটু চা পান করলে খুশি হবো। আমি বাঁশের হুড়কো সরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম। চা পান করলাম। তারপর কী ভাবে যে অন্তরঙ্গতায় জড়িয়ে গেলাম তার সঙ্গে! বিকালে তিনি আমার আগমনের প্রতীক্ষায় থাকেন। মাঝে মাঝে চা খাই। সেই চালার তলায় চেয়ারে বসি। উনি ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে বসে থাকেন। ইচ্ছা হলে নিজের কথা বলে যান। আমি নীরব শ্রোতা। ড: ভবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কেম্ব্রিজ থেকে পিএইচডি.। পদার্থবিজ্ঞানে। তারপর ভারতের অসামরিক বিমান চলাচল দপ্তরের আবহাওয়াবিদ ডিরেক্টর। কাজ করেছেন সিমলা, করাচি, মুম্বাইতে।
তিনি বলেন, করাচি বিমানবন্দর তাঁরই তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছিল। তখন তিনি সেখানকার ডিরেক্টর। রবীন্দ্রনাথ পারস্য ভ্রমণ সেরে ফিরলেন। করাচিতে তাঁর বিমান থামল। আমি গিয়ে বিমানের ককপিটে বসে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করলাম। তিনি আমাকে শান্তিনিকেতন দর্শনের আমন্ত্রণ জানালেন।
দু'জনের মধ্যে কথা হচ্ছিল ইংরাজীতে। রবীন্দ্রনাথ বললেন, তুমি কি বাঙালি?তিনি বললেন, আমার বাবা-মা বাঙালি বলে জানি। আমি বেনারসে লালিত, তারপর লখনৌতে। সেখান থেকে ইংল্যাণ্ড এবং এখন এখানে। আমি বাঙালি কিনা জানি না - এখন আন্তর্জাতিক।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, শান্তিনিকেতনে এসো। তুমি যে একজন বাঙালি সেটা আমি বুঝিয়ে দেব। মহীরূহ ডালপালা ছড়ালেও, মূলকে অস্বীকার করতে পারে না। মূলের শক্তিতেই দাঁড়িয়ে থাকে।
শান্তিনিকেতন থেকেও রবীন্দ্রনাথ আমন্ত্রণ লিপি পাঠিয়েছিলেন। তিনি যেতে পারেননি। কারণ সেই সময়েই তাঁর জীবনে দুঃসময় ঘনিয়ে এলো। বিপর্যয় নামল।
তখন তিনি মুম্বাইতে। পদোন্নতি ঘটবে আশা করছিলেন। কিন্তু যে পদে তিনি যাবেন ভাবছিলেন, সেই পদে চলে এলেন অন্য একজন এবং তাঁকে বদলি করা হলো সিমলায়।
যিনি তাঁর ওপরওয়ালা হয়ে এলেন তিনি একজন ইংরাজ। এই ইংরাজ ছিলেন লণ্ডনের আবহাওয়া দপ্তরের এ্যাসিটেন্ট ডিরেক্টর।
ড: ব্যানার্জী প্রতিবাদ জানালেন। লণ্ডনের ডিরেক্টর এবং আমার একই পদমর্যাদা। একই দপ্তর থেকে নিযুক্ত। তাহলে একজন ডিরেক্টরের সহকারী কিভাবে আরেকজন ডিরেক্টরের ওপরওয়ালা হতে পারে? কোন আইন বলে? ইংরাজ বলে কি? আমি এই ব্যবস্থা মানি না। পুনর্বিবেচনা করা হোল। তাঁকে জানানো হল - তুমি সিমলা যাও। তিনি বললেন, যাব না। একদিন সকালে ইংরাজ পুলিশ সুপার এসে বললেন, আপনি এই বাসা ছেড়ে দিন। ড: ব্যানার্জী ক্ষিপ্ত। যেখানে আই.জি-র আসার কথা কিছু বলার থাকলে - সেখানে একজন পুলিশসুপার? এ তো অপমান!
তিনি পুলিশ সুপারের গালে চড় মেরে বললেন, যাও তোমার ওপরওয়ালাকে গিয়ে বলো তোমার প্রাপ্য দিয়েছি। তিনি বিকালে গভর্নরের সঙ্গে টেনিস খেলতেন। বিকালে গিয়ে তিনি গভর্নরকে এই সংবাদ দিলেন। বললেন, এই কি তোমাদের ব্রিটিশ ল যার গর্ব করো? আইনের চোখ রাঙাচ্ছে? আইনের পথে আসতে বলো তোমার গভর্নমেন্টকে।
পরদিন পুলিশ বাহিনী এসে ড: ব্যানার্জীকে ধরে নিয়ে মানসিক হাসপাতালে পাঠিয়ে দিল। পাগল, মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। অতএব চাকরি গেল।
ড: ভবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় পথে নেমে এলেন সপরিবারে। অসহায়, বিপন্ন, দিশেহারা। ড: বন্দ্যোপাধ্যায় তখন পারস্য উপসাগরের আবহাওয়া নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। সেই গবেষণার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেই বিমান চলাচল করত। পারস্য সরকার খুব খুশি। তাঁকে সপরিবারে পারস্য ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তিনি পারস্য ভ্রমণে গেলেন, রাজকীয় সম্বর্ধনা পেলেন। প্রস্তাব দেওয়া হলো - পারস্যের আবহাওয়া দপ্তরের ডিরেক্টর জেনারেলের পদ নিতে। তিনি সম্মত হলেন না।
ফিরে এলেন দেশে। লখনৌতে স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লেন। টাকা পয়সা ফুরিয়ে আসছে, হোটেলে থেকে চিকিৎসা করাচ্ছিলেন, খবর পেয়ে হোটেলে ছুটে এলেন বন্ধু ড: শান্তিস্বরূপ ভাটনগর। না-না হোটেলে থাকবেন কেন? আমার বাড়িতে চলুন।
এক মাস সেই বাড়িতে। ভাটনগরের মা’র সেবাযত্নে এবং ডাক্তারের চিকিৎসায় রোগমুক্ত হলেন স্ত্রী। একটা পয়সাও খরচ করতে দিলেন না ড: ভাটনগর। তাঁরা নিরামিষাশি। কিন্তু বাঙালিরা মাছ খায়। তাই হোটেল থেকে ওদের জন্য মাছ পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলেন ভাটনগর। ড: বন্দ্যোপাধ্যায় ধরা গলায় বলেন, ভাটনগর একজন মহাপুরুষ। লখনৌ থেকে ওঁরা চলে এলেন কাশীতে।
ভবনাথের প্রথম জীবন তো কেটেছে এখানেই। পড়েছেন এ্যানি বেশান্তের কাছে। কাশী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শাখায় প্রথম দলের ছাত্র তিনি।
মদনমোহন মালব্য বললেন, আমি খুবই দুঃখিত ভবনাথ। তুমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করো। - যাবে কি?
- না-না আমার মাথায় ওসব এখন কিছুই ঢুকছে না। আমি পারব না।
অবশেষে তিনি চলে এলেন মেহেরপুরে। সেই থেকে এখানেই। একদিন আধপোড়া বিড়িটা ধরিয়ে নিয়ে দুটো টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন - এই যে বাড়িটায় আছি এর একটা ইতিহাস আছে।
তখন বম্বেতে আছি। জীবনযাপন ধারাই অন্যরকম। বন্ধু সি.ভি. রমন আসছেন, আচার্য পি.সি.রায় বিজ্ঞান কংগ্রেসের সভাপতি হয়ে। বম্বে গিয়ে আমার অতিথি হচ্ছেন। আরও কতো জ্ঞানী বিজ্ঞানী আসছেন। পার্টির পর পার্টি চলছে। বিকালে গভর্নরের সঙ্গে টেনিস খেলছি। এই সময় বাবা চিঠি লিখে জানালেন, আমাদের এক আত্মীয়ের বাড়ি বিক্রি হচ্ছে। পাঁচ’শ টাকা চায়। তুমি যদি ওই টাকাটা দাও তাহলে তোমার নামেই বাড়িটা কিনি। বাড়িটা কেনার আমার ইচ্ছা। আমি টাকা পাঠিয়ে লিখলাম, টাকা চেয়েছেন, টাকা পাঠালাম। কার নামে বাড়ি কিনবেন সেটা আপনার ব্যাপার। আমার মাথা ব্যাথা নেই।
তখন সেই বোম্বেতে বসে কোন দূর পল্লীগ্রাম, মেহেরপুরের পাঁচ’শ টাকার বাড়ির কথা কি ভাবা যায়?
শেষ অবধি, সেই বাড়িতেই চলে আসতে হলো। তখন বাবা যদি না কিনতেন, আমি কোথায় যেতাম? ভারতবর্ষের আর কোথাও তো আমার কোন আশ্রয় নেই। পাঁচ’শ টাকায় কেনা এই আমার আশ্রয়। এখানেই আছি। তাঁর চাকরির নিয়োগপত্র দিত ইংল্যান্ডের সেক্রেটারি ফর এয়ার সার্ভিস। ভারত সরকার নয়। বলা হতো ইমপিরিয়াল সার্ভিস। এঁদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। চাকরি যদি চলে যায়, পেনশনের কাল পর্যন্ত যদি না পৌঁছায় - তাহলে সেই কর্মীকে মাসোহারা দেওয়া হবে। যাতে অনাহারে মৃত্যু না হয়। ড: বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য ধার্য হয়েছিল মাসিক সাড়ে তিন’শ টাকা। সে কালে অনেক টাকা। ড: বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রহণ করলেন না সে ভাতা।
ও তো গরু মেরে জুতো দান। সাধু সাজা। মাসিক পঞ্চাশ টাকা পেতেন এক স্থান থেকে। তাতেই সংসার চলত। এলো ১৩৫০ সাল। মন্বন্তর, আকাল, খাদ্যদ্রব্য অগ্নিমূল্য। চলেছে চোরা কারবারি। দুবেলা ভাত খাওয়া আর সম্ভব নয়।
বাজারে মোড়ের মাথায় বাগচীদের মুদিখানা দোকান। নিখিল আর পরিমল বাগচি দুজনে দোকান চালান। স্বাধীনোত্তরকালে পরিমল বাগচি হয়েছিলেন নদীয়া জেলা পরিষদের প্রথম সভাধিপতি।
এদের কাছে গিয়ে ড: ব্যানার্জী বললেন, চাল তো আর মিলবে না!
- মিলবে। অনেক দাম।
- এই মশুরি খাওয়া যায় না - ভাতের মতো করে?
- হ্যাঁ, তা যায়।
- তাহলে এক বস্তা মশুরি পাঠিয়ে দিন আমার বাড়িতে।
তারপরই সমগ্র পরিবার বেরীবেরীতে আক্রান্ত। শিশুকন্যার মৃত্যু হলো। নিরাভরণ গৃহ। ঘরে দুটি ফটো। একটি পি.সি.রায়ের সঙ্গে পরিবারের ফটো, অন্যটি এক সাহেবের। কী যেন ছুঁড়ছেন। আমার প্রথম মনে হয়েছিল ওটা কাস্তে।
ড: বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন ওটা বুমেরাং। ছুঁড়ে আমাকে দেখাচ্ছিলেন। সে সময় আমি ফটোটা তুলেছিলাম। ওই ভদ্রলোক ছিলেন আমার ওপরওয়ালা - স্যার গিলবার্ট ওয়াকার। বুমেরাঙের গাণিতিক হিসাব বার করায় রয়্যাল সোসাইটির ফেলো হয়েছিলেন।
তিনি বসে বসে বিড়ি টানেন। আমি পাশে বসে থাকি চেয়ারে।
মাঝে মাঝে তাঁর মনোভাব প্রকাশ করেন। আমি যদি চাকরিতে থাকতাম ডিরেক্টর জেনারেল হয়ে রিটায়ার করতাম। দিল্লি না হয় সিমলায় একটা বাড়ি করতাম - হয়নি - ক্ষতি কি?
ছেলে দুটো অক্সফোর্ড কেম্ব্রিজে পড়ত আর দিল্লিতে দুটো দপ্তরের সেক্রেটারি হতো। মেয়ে দুটোর বিয়ে হতো - দুজন সেক্রেটারির সঙ্গে - হয়নি। ক্ষতি কি! ওসব হতেই হবে এমন কোন কথা! পরিবেশ পরিস্থিতি চিন্তা ভাবনা কত যে পাল্টে দেয়। আগে কাঠালের গন্ধ সইতে পারতাম না। এখন বাগানের ঘাসচারা গন্ধের সঙ্গে কাঠালের গন্ধ পেলেই মন নেড়ে ওঠে।
ড: ব্যানার্জী একজন ব্রিটিশ বিরোধী মানুষ। নিজের জীবন দিয়ে তিনি ইংরেজকে বুঝেছেন। দেশের স্বাধীনতা আসছে। এ বিষয়ে তিনি কি বলেন!
শিশুকন্যার সমাধির পাশে একটা জবা গাছ লাগানো হয়েছে। ফুল ফোটে, তারপর ঝরে পড়ে সমাধির ওপর। রক্তজবার গাছও আছে।
ড: ব্যানার্জী সেই রক্তজবা তুলে সমাধির ওপর দিচ্ছিলেন। ফুলটা মেয়ের সমাধির ওপর রেখে খানিক দাঁড়িয়ে থাকলেন সেখানে। তারপর ধীর পদে এগিয়ে এসে আমার পাশে ইজিচেয়ারে বসলেন। পরনে পাজামা, গায়ে গেঞ্জি। খৃষ্টান নন, ব্রাহ্মণ। কিন্তু পৈতে নেই। ছেলেদের পৈতে আছে।
বিড়িতে সুখটান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, চা খাবে তো? ছোট মেয়েকে ডেকে চা দিতে বললেন। তারপর বললেন, কি খাবে বলো।
-দেশ তো স্বাধীন হচ্ছে। আপনার কি মনে হচ্ছে?
-আমার মন্তব্য শুনতে চাও?
তিনি থেমে গেলেন। অন্যমনস্ক। তারপর চোখদুটো ঝাপসা হলো। একটু ধরা গলায় বললেন,
আমার জীবনই তো আমার কথা। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আমি তো আত্মাহুতি দিয়েছি। সপরিবারে গৃহবন্দী জীবন - ওই সমাধি আগুনে বসে আছি। আমার কাছে আর কোন মন্তব্য আশা করো? আমি সেই কবে থেকে বলে আসছি - ব্রিটিশ-ইণ্ডিয়া-কুইট ইণ্ডিয়া। কলোনিয়াল মাস্ট গো। আমার এই মনোভাবটা জেগেছিল আরও কিছু আগে এক ঘটনার ভিতর দিয়ে। তখন সুইডেনে আছি এক নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানীর বাড়িতে অতিথি হয়ে, কয়েক মাসের জন্য। কাজে ব্যস্ত। একটি সুইডিস মেয়ে আমার সেক্রেটারি। অল্প বয়সী মেয়ে। বেশ সপ্রতিভ। হাসি-খুশি আর বুদ্ধিমতী। আমি তো তখন তার প্রভু। তাই সম্পর্কটা ভিন্ন। সমীহ করে চলে। একদিন সে বলল, ড: ব্যানার্জী আপনি তো বাঙালি?
- হ্যাঁ।
- তাহলে খুব ভালো হলো। আপনার সাহায্য পাবো।
- আমি বললাম, কি ব্যাপারে?
সে বলল, আমি আপনাদের কবি রবীন্দ্রনাথের অনুরাগী। তাঁর কাব্য, তাঁর দর্শন আমার খুব ভালো লাগে। কিছু পড়েছি। কিন্তু তাঁর দর্শন ক্রমেই জটিল হচ্ছে। আর বুঝতে পারছিনে। আপনি যদি একটু সাহায্য করেন - যদি বুঝিয়ে দেন। বললাম, ও তো আমি পারব না। আমি তো বিজ্ঞানী, কবি নই, রবীন্দ্রনাথ পড়িনি, ওসব জানিনে।
সে বলল, তুমি তোমার দেশের সমাজ, সংস্কৃতি, দর্শন সম্বন্ধে কিছু জান না! তোমার দেশের অত বড় কবির সম্পর্কে, তাঁর কাব্য আর দর্শন পড়নি বলছ - অথচ তুমি একজন বাঙালি! আমি ভাবতে পারছিনে এটা কি সম্ভব! আমি বুঝতে পারছিনে! আমি তাকে বলেছিলাম, তোমাকে কথা দিচ্ছি দেশে ফিরে রবীন্দ্রনাথকে জানতে চেষ্টা করবো।
সেই রাতে বিছানায় শুয়ে আমি খুব কেঁদেছিলাম। মেয়েটির ধিক্কার ধ্বনি কানে বাজছিল। জীবনে সেই আমার প্রথম পরাজয়। আমার চিন্তাটাই পাল্টে গেল। আমার মনে একটা অহংকার ছিল এই ভেবে যে আমি একজন বিজ্ঞানী - বিজ্ঞান গবেষক। আমার দেশ নেই, জাতি নেই, মন নেই, ধর্ম নেই, আমি আন্তর্জাতিক। কিন্তু মেয়েটি বলল, তুমি তো বাঙালি। তাইতো! সব বিজ্ঞানীরই জাতি পরিচয় আছে। তারা তাদের দেশ নিয়ে, সমাজ নিয়ে, সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করে। আমি?
মেয়েটি বলল, তোমার দেশের অত বড় কবির খবর তুমি জানো না একজন বাঙালি হয়েও? এত কাল আমার পরিচয় ছিল ভিন্ন রকম।
প্রশ্ন হতো কোন দেশের মানুষ? বলতাম - ইণ্ডিয়া। প্রশ্ন হতো - ব্রিটিশ ইণ্ডিয়া? ইউরোপের সর্বত্র আমার পরিচয় ছিল, ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ার মানুষ। এতে আমি আত্মপ্রসাদ লাভ করতাম। ভাবতাম ইণ্ডিয়ান হলেও আমি ব্রিটিশ কালচারের সঙ্গে যুক্ত। নিছক ইণ্ডিয়ান নই।
মেয়েটি বলল, তুমি বাঙালি। রবীন্দ্রনাথের দেশ - ওই মহান দেশের মানুষ তুমি! ব্রিটিশের ভারত নয়, ব্রিটিশের বাঙলা নয় - শুধুই ভারত - শুধুই বাঙলা - মহান দেশ।
তারপর চাকরি জীবনে এসে বুঝলাম ব্রিটিশ ভারত অর্থ - ওরা রাজা, আমরা প্রজা। আমরা ওদের কাছে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। আমাদের যে বিদ্যাবুদ্ধি, যোগ্যতাই থাক ইংরাজ হলেই সে আমাদের ওপরওয়ালা। আমি সহ্য করিনি প্রতিবাদ জানিয়েছি জীবন দিয়ে। সর্বদা বলেছি ব্রিটিশ কুইট ইণ্ডিয়া, স্বাধীনতা আসছে ওয়েলকাম, নিশ্চয় ওয়েলকাম করব।
তবে আমরা তো মনের মতো স্বাধীনতা আনতে পারলাম না। ওরা ওদের মনের মতো করে আমাদের ছেড়ে দিয়ে গেল। ছেড়ে আগেই দিত কিন্তু ওদের পরিকল্পনা মতো কাজ হচ্ছিল না। ক্রীপস এলেন, ওয়াভেল এলেন - তাঁরা ব্রিটিশের উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারলেন। শেষে মাউন্টব্যাটেনকে পাঠান হলো। তিনি এসেই যেন জাদুবিদ্যা শুরু করলেন। ধরাশায়ী প্রতিপক্ষ। গান্ধীকে বলা হচ্ছে জাতির জনক। তিনি বলেছিলেন - দেশ বিভাগ যদি হয়, তবে হবে আমার মৃতদেহের ওপর দিয়ে। কি হলো? দেশ বিভাগ হচ্ছে। গান্ধী বেঁচেই আছেন। মুখে কথা নেই। আসলে রাজনৈতিক লড়াই তো হলো না - হলো ক্ষমতা দখলের লড়াই। এই জাতি তৈরি হলো আমাদের। তার জনক হলেন গান্ধী। দেশ বিভক্ত হচ্ছে এর পরিণতি যে কী হবে - কতো ভয়ংকর পরিস্থিতি হবে কে জানে। তবু যা আসছে তাকেই মেনে নেওয়া ভালো। ব্রিটিশ চলে যাক। কলোনিয়াল এ্যাডমিনিস্ট্রেশন মাস্ট গো। ওয়েলকাম ফ্রী ইণ্ডিয়া। ফ্রীডম ফার্স্ট। ফ্রীডম লাস্ট। ফ্রীডম অলওয়েজ।
এটাও তো ইউটোপিয়া। তবে ভাবতে ভালো লাগে, বলতে ভালো লাগে স্বাধীনোত্তর কালে ড: ভবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতীয় এসট্রোনমিক্যাল কমিশনের সদস্য হন। তাঁর বন্ধু ড: মেঘনাদ সাহা তাঁকে সদস্য করেছিলেন।
একদিন পাড়ার মোড়ে অশত্থ তলায় বুলি পিসির সঙ্গে দেখা। ওদের বাড়ির পাশে ছিল আমাদের পাঠশালা। সেখানে পানীয় জলের ব্যবস্থা ছিল না। ওঁদের বাড়িতে যেতাম জল পান করতে। বাল্য বিধবা বুলি পিসি এখন মিউনিসিপ্যালিটির কর্মী। বাড়ি বাড়ি ঘুরে বসন্তের টীকা দিয়ে বেড়ান। তখন তিনি অফিস থেকে ফিরছেন।
কাছাকাছি হতেই তিনি বললেন,
- হ্যাঁগো কি বুঝছ?
- কোন বিষয়ে?
-এই দেশ ভাগ। আমাদের মেহেরপুর পারিস্তান হবে না হিন্দুস্তান হবে?
- আমি বলতে পারবো না।
- তুমি তো মস্তো বড় বড় লোকের সঙ্গে ওঠাবসা করো। তারা কিছু বলে না?
- না। তেমন খবর কেউ জানে না। তবে আমাদের দেশ স্বাধীন হচ্ছে - এটা জানি। বুলি পিসি গম্ভীর হলেন। বললেন, দেশ স্বাধীন হলে আর আমার কি? দাদা যদি থাকত - কথা শেষ না করেই পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন বুলি পিসি।
বুলি পিসির দাদা - এটা আমার বাবার গল্প। বাবার মুখে শুনেছি। বুলি পিসির দাদা খোকা ছিলেন বাবার সহপাঠী। স্কুলে একসঙ্গে পড়তেন। একসঙ্গে খেলা করতেন। খুব শান্ত, ভদ্র, বুদ্ধিমান ছেলে। দু'জনের পাশাপাশি পাড়ায় বাস - তাই সম্পর্ক নিবিড়। কিন্তু খোকার সংসারে বিপদ নামল। ওরা কৃষিজীবী। পান চাষী। পানের বরজ আছে। আর সামান্য কিছু কৃষিজমি। বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন চিকিৎসায় অনেক ব্যয় হলো। জমি বিক্রি হলো। বাবা বাঁচলেন না। খরার বছর এলো। বরজের পান শুকিয়ে গেল। খোকা ম্যাট্রিক পাশ করল। কিন্তু খাবে কি? মা আর ছেলের সংসার। কোন পথই খুঁজে পেল না খোকা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। খোকা ইংরাজের সেনাবাহিনীতে যোগ দিল। বাবা বলেন, খোকা বলল, ভাই আর অন্য পথ পেলাম না। এতে সুবিধা এই যে, আমি খেতে পাব, মাকে টাকা পাঠাব। তঁার খাওয়ার ভাবনা থাকবে না। আমি যদি মরে যাই, তাহলেও মা টাকা পাবে। তাঁর মৃত্যুকাল পর্যন্ত। একটা বছর সে ভাবেই চলেছিল ঠিকঠাক মতো। খোকার কাছ থেকে টাকা আসত মার কাছে। চিঠি আসত। হঠাৎ সে সব বন্ধ হয়ে গেল। না টাকা, না চিঠি কিছুই আর আসে না খোকার কাছ থেকে। মা চিন্তিত। আমার বাবার কাছে আসেন। কি হলো গো খোকার? একদিন পুলিশ এলো খোকার মার কাছে।
- ছেলে কোথায়?
- তাতো জানিনে বাবা। আমিও তো পাইনে।
- সে সব আর পাবেন না। পুলিশ বলল। মানুষ খুন করে সে পলাতক। সে খুনী। আপনার কাছে এলে আমাদের খবর দেবেন। নাহলে আপনি বিপদে পড়বেন।
খোকার বাড়িতে মাঝে মাঝে পুলিশ আসে। খোঁজ নেয়। তঁার কাছ থেকে গোপন কথা বার করতে চায়। খোকা আসে না। খোকার খোঁজ নেই। কিছু কাল পরে এক বিকালে খোকার মা এলেন আমার বাবার কাছে। বাবাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে তিনি বললেন, খোকা এসেছে। তোমাকে দেখতে চাচ্ছে। রাতে যেও চুপি চুপি।
বাবা গিয়েছিলেন। ওঁদের বাড়িটা নিরালায়। জনবসতি কম। বনজঙ্গল ঘেষা বাড়ি, লোকজন চলাচল খুব কম, বিশেষত রত্রিবেলা। সেই নির্জনতার ভিতর দিয়ে বাবা ওঁদের বাড়িতে গেলেন। খড়ো চাল, মাটির ঘরের বাড়ি। ঘরে আলো জ্বলছে। বাবা উঠোনে যেতেই খোকার মা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বললেন, এসো।
বাবা ঘরে উঠে গেলেন। ঘরের ভিতরে এক কোণে কুশী জ্বলছে। বিপরীত দিকে চৌকীর ওপর বসে আছে একটা মূর্তি। কাঁচাপাকা চুল দাড়ি, তৈলহীন রুক্ষ, শীর্ণ দেহ, চক্ষু কোটরগত। বুঝি কোনো উন্মাদ-ছন্নছাড়া ক্ষুধার্ত ভিখারি। বাবা ঘরে দাঁড়িয়ে বললেন, খোকা! সেই মনুষ্যমূর্তি বলে উঠল খোকা - আমি তোমার খোকা। তারপরই সে কেঁদে উঠল হাউমাউ করে।
খানিক পরে সে সাব্যস্ত হলে - বাবা তাঁর সামনে বসে বললেন কি হয়েছিল? খোকা বললেন, সেদিন শরীরটা ভালো ছিল না। মনও খারাপ ছিল। মার খবর পাইনি অনেক দিন। ঘর বাড়ি ছেড়ে তোমাদের ছেড়ে পড়ে আছি কতো দূরে। তাই সেদিন প্যারেডে গিয়ে পা মেলাতে পারছিলাম না। ভালো লাগছিল না প্যারেড করতে।
তখন প্যারেড মাস্টার সেই ইংরাজ অফিসার এসে লাথি মারল আমার পায়ে। তার বুটজুতোর আঘাতে আমার পা কেটে গেল। আমি ছিটকে পড়ে রক্তঝরা পা চেপে ধরলাম। খুব যন্ত্রণা হচ্ছিল। সাহেব এসে আবার লাথ মারল আমার পায়ে, পিঠে আর গালাগালি দিতে শুরু করল, আমার মার নামে, আমার দেশ-জাতির নামে, আমার জন্ম সম্পর্কে। আমি উন্মাদ হয়ে গেলাম। প্রথমে কাঁদতে থাকলাম শুধু। তারপর আত্মহত্যা করার ইচ্ছা জাগল। এতো অপমান দুঃসহ। একটা রিভলবার জোগাড় করলাম। নির্জন স্থান খুঁজেছিলাম। সেই সময় সহসা সেই নির্জন স্থানে দেখা হয়ে গেল সেই ইংরাজ সাহেবের সঙ্গে। মুহূর্তে কী যে হলো আমি তাকে গুলি করে খুন করলাম। আর তারপর ব্যারাক থেকে পালিয়েও আসতে পারলাম। তারপর থেকে পালাচ্ছি আর পালাচ্ছি। দিন নেই, রাত নেই, শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা নেই, পাহাড় পর্বত, বন-জঙ্গল কোন বোধই নেই যেন। জানি পুলিশ হন্যে হয়ে ছুটছে আমার পিছনে আমিও পালাচ্ছি। মাকে একবার দেখার বড় ইচ্ছা ছিল, দেখলাম। ভাই, আমি অযোগ্য সন্তান। মার সেবা করতে পারলাম না। মাকে কষ্ট দিয়ে দুঃখ দিয়ে গেলাম। তোমরা আছো আমার মাকে দেখো। আমার এই অনুরোধটা মনে ভুলো না। আমি আর পারছিনে। আর একটা কাজ বাকি। আমার কাছে সেই রিভলবারটা আছে। কোনো বিপ্লবীকে পেলে তাকে দিতাম - খুঁজছি- কিন্তু...।
সে রাতে বাবা তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসার খানিক পরেই তিনিও মার কাছে থেকে বিদায় নিয়ে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে অন্ধকারে মিশে গিয়েছিলেন। তারপর থেকে আর কোন খবর মেলেনি তাঁর।
দীর্ঘকাল ধরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং দেশাত্মবোধক বাঙলা সাহিত্য দেশবাসীকে বিশেষত শিক্ষিত সমাজ ও যুব সম্প্রদায়কে যথেষ্টই প্রভাবিত করেছে অনেককাল থেকেই। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আজাদ হিন্দ ফৌজের ঘটনা। ফলে যুবমন দেশের স্বাধীনতা লাভ বিষয়ে নানাভাবে চিন্তা ভাবনা করছে। মনে কতো স্বপ্ন, কতো পরিকল্পনা সেসব নিয়ে অলোচনা চলছে।
মেহেরপুরের যুবকদের নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছে বছর দুই আগে। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়। যুব সমাজের প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। সাহিত্য সঙ্গীত, অভিনয়, খেলাধুলা, ব্যায়াম নানা শাখা। শাখাগুলি স্বতন্ত্র্য, স্বাধীন। যুব সংঘ। রেজিস্টার্ড সংগঠন নয়। একটি মিলিত শক্তি। এক সঙ্গে ওঠা-বসা, মেলামেশা চলে। প্রয়োজনে পরস্পরকে সাহায্য করা হয়। এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে শহরের যুব সমাজের চিন্তা-ভাবনার সন্ধান মেলে ভালো ভাবেই। শহরের আধুনিক পল্লী হোটেলপাড়া। সেখানকার বিশিষ্ট ব্যক্তি নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য। শহরের বিশিষ্ট আইনজীবী। তাঁর বড় ছেলে কার্তিক ভট্টাচার্য। সামাজিক নানা কর্মে উদ্যোগী ও উৎসাহী যুবক। আমার ঘনিষ্ঠ অগ্রজতুল্য সুহৃদ কার্তিক। তাঁর মনে নানা স্বপ্ন, নানা পরিকল্পনা। মেহেরপুরে রেল স্টেশন ছিল না। কৃষ্ণনগরের দূরত্ব ছিল মেহেরপুর থেকে ত্রিশ মাইল। কিন্তু যেতে হতো ঘুর পথে। চুয়াডাঙায় গিয়ে ট্রেনে উঠে, রানাঘাটে নেমে, ট্রেন বদল করে কৃষ্ণনগরগামী ট্রেনে যেতে হতো। সকাল সাতটায় মেহেরপুর থেকে যাত্রা করলে বিকাল সাড়ে চারটেয় কৃষ্ণনগর। একবার অধ্যাপক চিন্তাহরণ চক্রবর্তীকে কৃষ্ণনগর থেকে মেহেরপুরে এনেছিলাম সাহিত্যসভায় প্রধান অতিথি করে। তাঁকে সকাল সাতটায় বাড়ি থেকে বার হতে হয়েছিল। মেহেরপুরে এসে পৌঁছলেন বিকাল সাড়ে চারটেয়। মটর গাড়ি থেকে নেমেই আমাকে বললেন, হ্যাঁগো এর চেয়ে লঙ্কাদ্বীপে যাওয়া যে সহজ।
মটর গাড়ি যাবার একটা পথ ছিল। মেহেরপুর থেকে কৃষ্ণনগর ওই ত্রিশ মাইল পথ যেত। সময় লাগত মাত্র তিন ঘন্টা। মাটির কাঁচা রাস্তা। বর্ষাকালে ক’মাস গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকত। সে পথ ছিল মেহেরপুর থেকে ছেড়ে রোনাখাবলি, দারিয়াপুরের কাছে ভৈরব নদ পার হয়ে, নাটুদহ, বৈদ্যনাথতলা, হৃদয়পুর, চাপড়া হয়ে কৃষ্ণনগর। কার্তিকদার চিন্তা ছিল দেশ স্বাধীন হলেই ওই রাস্তাটা পাকা করার দাবি তুলতে হবে। রাস্তা পাকা হোক আর নদীর ওপর সেতু হোক। সময় কম লাগবে, দুপাশের পল্লী উন্নত হবে, তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধা হবে। দেশ স্বাধীন হলেই ওটা করতে হবে। হয়েও যাবে। আমাদের লোকেদের হাতেই তো তখন ক্ষমতা।
- আর রেল লাইন?
- হ্যাঁ সেটাও দাবী জানাতে হবে। চুয়াডাঙা থেকে মেহেরপুর হয়ে লাইন চলে যাবে পলাশীতে। আর মেহেরপুর থেকে আরেকটা লাইন চলে যাবে কৃষ্ণনগর। তখন দেখো মেহেরপুরের চেহারা কেমন হয়। আমাদের এই ছোট মেহেরপুর তখন হয়ে যাবে মস্ত শহর। দেখো হবেই,আমরা করবই।
- আর কি আনতে হবে?
ইলেকট্রিক আলো। ওটা আনতে পারলে শহরের রূপ বদলে যাবে। এখন কারও ঘরে রেডিও নেই। ব্যাটারিতে চালানো রেডিও এনে দুদিন পরেই পড়ে থাকে অকেজো হয়ে। মেরামত করার মিস্ত্রি নেই। ইলেকট্রিক এলে ফোন আসবে। আর শহরের রাস্তা বাড়িঘর আলোয় ঝলমল করবে। রাতে অন্ধকার পথে চলতে হাততালি দিয়ে কিংবা লাঠি ঠুকে সাপ তাড়িয়ে চলতে হবেনা। ইলেকট্রিক থাকলে কতো সব আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। শহর জমে উঠবে।
মুখার্জী জমিদারদের দেউড়ির পিছনের ঘরে যাত্রা ক্লাব, থিয়েটার ক্লাব, সংস্কৃতি সংঘ, সবই শহরের যুবকদের সংগঠন। সন্ধ্যাবেলা সেখানেও আসর জমে ওঠে। সেখানেও মোমবাতি কিংবা লণ্ঠনের মৃদু আলোর সামনে বসে আসন্ন স্বাধীনতা বিষয়ে কত রকম চিন্তাভাবনা, স্বপ্নকথা জেগে ওঠে। ইলেকট্রিকের মতো আরও কতো কিছুর অভাব আছে এ শহরে।
যানবাহন একটা বড় সমস্যা। শহরে সাইকেল আর গরুরগাড়ি ছাড়া অন্য কোন যান নেই। মটর গাড়ি যাত্রী নিয়ে আসে। মহিলা যাত্রী থাকলে একটু দূরে যদি যেতে হয় মহিলাদের, হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। অথবা গরুর গাড়ি ভাড়া করো। গ্রামীণ পরিবেশ থেকে শহর ক্রমশ জেগে উঠছে মেহেরপুরে। যানবাহনের প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে। আশা স্বাধীনতা এলেই যানবাহনের সমস্যা মিটবে।
স্বাধীনতা এলেই অনেক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
১। ম্যালেরিয়ার মশা তাড়াতে হবে। পচা ডোবা বন্ধ করতে হবে। শহরের বনঝোপ সাফ করতে হবে। এখন আজাদ হিন্দ ফৌজের ও নেতাজীর কথা নিয়ে কাজ। নেতাজী এ শহরে এসে এক ব্যবসায়ীর গুদাম থেকে বিলাতি বস্ত্রের গাঁট বার করে বাজারের রোডের মাথায় আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। সে কাহিনী শহরে প্রচারিত। সেই সূত্র ধরে যুবকরা শহরের সেই সব ব্যবসায়ীর প্রতি বিরূপ। দুর্ভিক্ষের পর এসেছে কালোবাজারি আর ভেজাল।
২। ব্যবসায়ীরা এখন ওইসব কাজে লিপ্ত। সকলেই দেখে ব্যবসায়ীরা দোকানের সামনের বারান্দায় প্রকাশ্যে সরষের তেলের সঙ্গে হোয়াইট অয়েল মেশাচ্ছে। যুক্তি শোনাচ্ছে তেলের আমদানি কম আর দাম অত্যন্ত চড়া। খাঁটি তেল ক’জন কিনতে পারবে? তাছাড়া অত তেলই বা কোথায়? তাই ওটা মিশিয়ে দাম কমিয়ে দিচ্ছি আর পরিমাণও বাড়ছে। আমরা তো সাধারণ মানুষের সুবিধাই করছি। আরও কতো সব যুক্তি। সরকার নীরব। আইন অকেজো। ক্ষুব্ধ যুবক দল স্বপ্ন দেখছে, স্বাধীনতা এলে হয়। ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে ওই সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এই সব চিন্তা তাদের নিয়ে চলেছে আরও অনেক দূর।
৩। মেহেরপুর বাজারে মারোয়াড়ি ব্যবসায়ী অনেক। পুরুষানুক্রমে তাঁরা এখানে ব্যবসা করছেন। বড় বড় অট্টালিকা গড়েছেন। মেহেরপুরের জনজীবনের সঙ্গে তাঁরা মিশে আছেন। তাঁদের কথা বার্তা পড়াশোনা, বেশভূষা সবই বাঙালির মত। এখন এই যুবকরা জাতীয়তাবাদী ভাবনায় ভাবিত হয়ে বলতে শুরু করেছে - ওরা কেন এখানে থাকবে - ওরা বাঙালির মুখের গ্রাস কেড়ে খাচ্ছে। ওরা দুর্নীতিপরায়ণ। ওদের তাড়াতে হবে স্বাধীনতা এলেই।
৪। কেউ বলছে ইংরেজ গেলেই ইংরাজী ভাষাটাকেও তাড়াতে হবে। মাতৃভাষা চাই - ইংরাজী নয়। ওটাই পরাধীনতার চিহ্ন। ওই ইংরাজীর জন্যই অনেকে ম্যাট্রিক পাশ করতে পারে না - ফেল করে। ওটাকে তাড়াতে হবে। আরও কতোরকম উদ্ভট কথাবার্তা যে শোনাচ্ছে! স্বাধীনতা এলেই তাদের সর্বপ্রকার অসুবিধা দূর হয়ে যাবে। তারা যা চাইবে তাই হবে। কেননা স্বাধীন দেশ, তাদের দেশ তাদের সুবিধা দেখবেই।
(এর পর পরবর্তী সংখ্যায়)