সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
রামায়ণ ভারতবর্ষের সবচেয়ে জনপ্রিয় পুরাণ কথা। অন্যটি মহাভারত। তবে রামায়ণ শুধু পুরাণ নয়। সেই কোন সুদূর অতীতের রামায়ণ অনায়াসে উঠে আসে বর্তমানের রাজনীতির আঙিনায়। এই তো সেদিন ভারতীয় জনতা পার্টির সর্বভারতীয় নেতা এল.কে. আদবানী পুরাণের রামকে ফিরিয়ে আনলেন তার রথযাত্রায়। শুরু হল ভারতীয় রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদের আবির্ভাব এবং ক্ষমতা দখল। অবশ্যই ভোটের মাধ্যমে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে আশ্রয় করে। একইসঙ্গে জুড়ে গেল বাবরি মসজিদ ভাঙার উল্লাস। ধর্মকে আশ্রয় করে পুরাণ নির্ভর এরকম রাজনীতি এর আগে কখনও ভারতবর্ষে দেখা যায়নি। বাবরি মসজিদ ভাঙার একটি মারাত্মক ফলাফল হল: পুরাতত্ত্ব চলে এল আদালতে। এই বিষয়ের পণ্ডিতদের অনেকে মনে করছেন যে ভারতবর্ষে পুরাতত্ত্বকে আদালতের আঙিনায় এনে দাঁড় করানোর ফলে এটাই প্রমাণ হয় যে এই দেশে এমন এক শ্রেণির মানুষ এবং জনমত তৈরি হয়েছে যা সরকারি পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (Archaeological Survey of India) যে জ্ঞান ভান্ডার তৈরি করে, তাকে নিজেদের আদর্শগত উদ্দেশ্য সিদ্ধির কাজে লাগানোর দাবি করতে সক্ষম। নৃতাত্ত্বিক শিরিন রত্নাগর প্রখ্যাত নৃতত্ত্বের জার্নাল Current Anthropologyতে প্রকাশিত প্রবন্ধে বলেনঃ
বৈজ্ঞানিক তথা পরীক্ষাগার নির্ভরশীল অনুসন্ধানে নিযুক্ত পুরাতত্ত্ব আসলে একটি সমাজবিজ্ঞান যার কাজ হল বস্তুসংস্কৃতির নানা পড়ে থাকা নমুনা সম্পর্কে গবেষণা করা। যেহেতু কোন সমাজবিজ্ঞানই আদর্শগত (Ideological) শূন্যতায় বসবাস করে না তাই পুরাতত্ত্বও প্রতিনিয়ত আদর্শগত জগতেই ঘোরাফেরা করে। (রত্নাগর, ২০০৪:২৩৯)।
অতএব এটা কোন আশ্চর্যের বিষয় নয় যে পৌরাণিক রাম ও তার অযোধ্যা পুরাতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক এবং বিচারিক (Judicial) বিশেষজ্ঞগণের নিজ নিজ আদর্শগত অবস্থান থেকে আলোচিত হবেন। এ প্রসঙ্গে মনে করা যায় যে তদানীন্তন ইউনিয়ন সরকার বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দশ দিন পর হাইকোর্টের বিচারপতি এম.এস. লিবারহানকে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানের জন্য নিয়োগ করেন। বিচারপতি লিবারহানের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী একদল অমঙ্গলকারী নেতৃবর্গ ভগবান রামের নাম ব্যবহার করে শান্তিপ্রিয় জনগোষ্ঠীগুলিকে একদল অসহিষ্ণু মানবগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত করেছিল (লিবারহান অনুসন্ধান কমিটি, ১৯৯২: ৯১৯-৯২০)। আর একটু পিছিয়ে যাই। প্রখ্যাত পুরাতাত্ত্বিক বিজ্ঞানী এইচ.ডি. সাংকালিয়া ১৯৭৭-৭৮ সালে প্রকাশিত ভান্ডারকর প্রাচ্য গবেষণা কেন্দ্রের পত্রিকায় বলেছিলেন যে খ্রীষ্টপূর্ব ৮০০-১০০০ বছর নাগাদ অযোধ্যা একটি ছোট গ্রাম এবং আরও পরে একটি ছোট শহর হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করে। ওই শহরের অধিবাসীরা পশুপালন, শিকার এবং ধানচাষের উপর নির্ভর করেই জীবনযাপন করত। বুদ্ধ এবং সম্রাট অশোকের সময়ে উক্ত শহরে বৌদ্ধ স্তূপ এবং মঠ গড়ে উঠেছিল। বহু বছর ধরে অযোধ্যা ছিল একটি বৌদ্ধ শহর। এই শহরে প্রথম হিন্দু মন্দির তৈরি শুরু হয় গুপ্ত রাজাদের আমলে।
সাংকালিয়া দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাঁর প্রবন্ধে লিখেছেনঃ
যদি অযোধ্যা এভাবেই গড়ে ওঠে তাহলে রামায়ণের বর্তমান রূপ, এমনকি তার নানা সংস্করণ শহরটি সম্পর্কে একটি একপেশে বর্ণনাই করেছে। বৌদ্ধ এবং জৈনদের কোনো উল্লেখ, যা আমরা অন্যান্য সূত্রগুলি থেকে পাই, এমনকি চৈনিক ভ্রমণবিদদের লেখায় পাওয়া যায়, সেসবের কোনো বর্ণনা রামায়ণে নেই। নিঃসন্দেহে বৌদ্ধ এবং জৈনরা ওই শহরে খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে বসবাস করতেন (সাংকালিয়া, ১৯৭৭-৭৮:৯১৭-১৮)।
সুতরাং, রামায়ণের নিজস্ব পক্ষপাত ছিল এবং ওই গ্রন্থটিকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই দেখা উচিত।
ধর্মীয় ভাবাবেগ বিবর্জিত রামায়ণ গবেষণা বেশ কিছুদিন আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। আরম্ভ করব প্রখ্যাত পন্ডিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক সুকুমার সেনের ছোট্ট একটি বই থেকে। বইটির নাম 'রামকথার প্রাক্ ইতিহাস' (১৯৭৭)। দেশ-কালের পরিপ্রেক্ষিতে রামায়ণ ও তার নানা সংস্করণের বিবর্তন খুঁজে বের করাই ছিল অধ্যাপক সেনের প্রধান উদ্দেশ্য। বইয়ের শুরুতেই লেখক তাঁর কাজটিকে বলেছেন ঐতিহাসিক, ধর্মবিশ্বাসীর দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে উনি রামায়ণকে দেখেন নি। সেন বলেছেন ইতিহাসবিদ তথ্য, প্রমাণ এবং যুক্তি নিয়ে চলেন। ধর্ম বিশ্বাসী চলেন বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে। সেনের মতে এই দুই পদ্ধতির মধ্যে কোন বিরোধ নেই। যে যার নিজের জগতে সত্যি। মুখবন্ধে অবশ্য উনি বলেছেন যে ধর্মবিশ্বাসীদের এই বই না পড়াই ভাল! সেন যাত্রা শুরু করেছেন ঋকবেদ থেকে। উনি বলেছেন বৌদ্ধ এবং জাতকের গল্পে রাম-সীতা সহোদর ভ্রাতা-ভগ্নী। দ্বিতীয়ত, কোন একটি গল্পেও রাবণের সীতা হরণের উল্লেখই নেই। জৈন এক গ্রন্থে রামের মায়ের নাম অপরাজিতা এবং রাবণকে হত্যা করেছিলেন লক্ষণ, রাম নয়। বৌদ্ধ জাতকের গল্পে রাম, সীতা এবং লক্ষণ নিরামিশাষী।
প্রথ্যাত সাহিত্যিক রাজশেখর বসু সংস্কৃত মূল রামায়ণের সারানুবাদ করেন ১৯৪৬ সালে। ভূমিকায় উনি বলেন যে বনবাসে থাকাকালীন রাম, সীতা ও লক্ষণ রীতিমত মাংস ভক্ষণ করতেন। এছাড়া রাম স্বহস্তে নারদমুনির উপদেশে নিম্নবর্ণের সন্ন্যাসী শম্বুককে হত্যা করেন। কারণ শম্বুক তপস্যা করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে আমাদের মনে রাখা উচিত যে রাম নিম্নবর্ণের গুহকের কাছে প্রচুর সাহায্য পেয়েছিলেন। রামের গোটা সৈন্যদল ছিল বানরদের (নিঃসন্ধেহে নিম্ন বর্ণের মানুষ) এবং সুগ্রীব ও হনুমান স্বয়ং ওই বানর সেনাদের দলপতি ছিলেন। এদের সাহায্য ছাড়া রামের পক্ষে রাবণকে যুদ্ধে পরাজিত করে সীতাকে উদ্ধার করা সম্ভব হত না। এহেন রাম কিন্তু সুগ্রীবের দাদা বালীকে যুদ্ধে অন্যায়ভাবে হত্যা করেন। নৃতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক কুমার সুরেশ সিংহ তাঁর প্রবন্ধ 'রামকথার আদিবাসী সংস্করণ: একটি নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গী' প্রবন্ধে যথাযথভাবেই পর্যবেক্ষণ করেছেন:
লুক্কায়িত স্থান থেকে বালীকে হত্যা করার কারণ হিসেবে রাম যে সমস্ত যুক্তি দিয়েছিলেন তার মধ্যে প্রধান হল বালী তার ভ্রাতা সুগ্রীবের স্ত্রীকে বিবাহ করেছিলেন যদিও সুগ্রীবের বালীর স্ত্রীকে, বালীর মৃত্যুর পর বিবাহ করা সম্পর্কে রাম কোনো আপত্তি করেন নি (সিংহ, ১৯৯৩: ৫৪-৫৫)।
রামায়ণের উপর নৃতাত্ত্বিক গবেষণা প্রসঙ্গে প্রথমেই বলা প্রয়োজন কুমার সুরেশ সিংহ ও বীরেন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত এবং ভারতীয় নৃবিজ্ঞান সর্বেক্ষণ দ্বারা প্রকাশিত বইটির কথা। এই বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। বইয়ের শুরুতেই সুরেশ সিংহ বলেন যে রামায়ণের জনপ্রিয়তার ভিত্তি ধর্মীয় মৌলবাদের মধ্যে নিহিত নয়। রামায়ণ এমন একটি গ্রন্থ যা আসলে ভালবাসার একটি গল্প যে গল্পের মধ্যে বেশিরভাগ ভারতীয় তার ছেলেবেলাকে ফিরে পায় এবং শুধু উচ্চবর্ণের মানুষরা নয়, ভারতের বিভিন্ন আদিবাসীরাও রামায়ণের গল্পে আকৃষ্ট হয়ে এসেছে। সুরেশ সিংহ সম্পাদিত বইতে নৃতাত্ত্বিক টি.বি. নায়েক ভারতের পশ্চিম থেকে পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত আদিবাসী রামায়ণগুলির খুঁটিয়ে বর্ণনা করেছেন।
পূর্ব গুজরাটের পাঁচমহল জেলার ভীলজাতির মধ্যে অতীব জনপ্রিয় এক রামায়ণের কাহিনী পাওয়া যায়। এর নাম ভীললী রামায়ণ। পাঁচমহলের ভীলজাতিরা বিশ্বাস করে যে রামায়ণ রচয়িতা ঋষি বাল্মীকি ছিলেন এক ভীল, তাঁর নাম ছিল ভালিও। রামায়ণের ভীল সংস্করণ শুরু হচ্ছে এভাবে- রাম, লক্ষণ এবং হনুমান সীতাকে খুঁজতে বেরিয়েছেন। ইতিমধ্যে রাবণের লোকজন হনুমানকে পাকড়াও করার জন্য বীরহড় নামের আদিম জাতির মানুষদের নিয়োগ করেছে। কারণ বীরহড়রা বাঁদর ধরায় পটু। কিন্তু বীরহড়রা সেই কাজে বিফল হল। তখন হনুমান নিজেই তাকে ধরার উপায় বীরহড়দের বললেন। হনুমান বললেন মানুষের আঙুলের তিনগুণ প্রস্থের সমান ফুটো সম্বলিত জাল দিয়ে তাকে ধরা সম্ভব। বীরহড়রা সেরকম জাল বানিয়ে হনুমানকে ধরেও ফেলল। কিন্তু হনুমান বীরহড়দের অনুরোধ করলেন যে তিনি নিজেই নিজেকে হত্যা করবেন। অতএব বীরহড়রা যেন তাঁকে মুক্তি দেয়। ওরা হনুমানকে ছেড়ে দিল। এরপরের কাহিনী মূল রামায়ণের মত। হনুমান লঙ্কায় আগুণ লাগালেন ইত্যাদি, ইত্যাদি। সবশেষে হনুমান রামের কাছে গিয়ে নিজের মৃত্যুকামনা করলেন এবং মৃত্যুর পর তাঁর নশ্বর দেহটির কিভাবে সৎকার করা হবে তাও জানতে চাইলেন। রাম তখন বললেন, 'যে বীরহড় জাতি তোমাকে ফাঁদ পেতে বন্দি করেছিল তারাই তোমাকে এবং তোমার জাতির প্রাণীগণকে ভক্ষণ করবে'। তারপর থেকেই বীরহড় জাতির মানুষরা আজও বাঁদর এবং হনুমানদের ফাঁদ পেতে ধরে এবং তাদের মাংস ভক্ষণ করে থাকে। এরপর মধ্যপ্রদেশের গোন্ড জাতির কথায় আসা যাক। ইন্দিরা গান্ধী রাষ্ট্রীয় কলাকেন্দ্রের অধ্যাপিকা মলি কৌশল দেখেছেন যে গোন্ড জাতির রামায়ণে রাম নয়, লক্ষণই প্রধান চরিত্র। গোন্ডী রামায়ণে সীতা নন, লক্ষণই নিজের সততা প্রমাণ করার জন্য পাতালে প্রবেশ করেন। এবং তার আগে আগুণেও প্রবেশ করেছিলেন। আর একজন নৃতাত্ত্বিক এন.এন. ভায়াস রাজস্থান এবং মধ্যপ্রদেশের আদিবাসী সম্প্রদায়গুলির মধ্যে যে রামায়ণী কথার সন্ধান পান, তা মূল রামায়ণের থেকে শুধু আলাদাই নয়, আশ্চর্যজনকও বটে।
উপরিউক্ত আদিবাসীদের রামায়ণে রাজা দশরথ একজন ধূর্ত মানুষ এবং সীতার জন্ম হয়েছিল এক বৃষ্টিপাতহীন খরার সময় যখন সীতার মাতা-পিতা খাদ্যাভাবে তাদের শিশু কন্যাটিকে জমিতে পুঁতে দিয়ে আসেন। জনক রাজা ওই জমিতে লাঙল চালানোর সময় সীতাকে উদ্ধার করেন। উপরন্ত, রাজা দশরথের স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের জন্যই তিনি একদিন হঠাৎই রাম এবং লক্ষণকে বনবাসে পাঠান ও একইসঙ্গে ভরত ও শত্রুয়ের উপর রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। ওই অঞ্চলের আদিবাসীদের রামায়ণে কথিত আছে যে সীতার মাংস ভক্ষণের ইচ্ছাপূরণের জন্যই রাম-লক্ষণ হরিণ শিকারে যান। ওরা মোটেও বনের ফলপাকুড় সংগ্রহে অরণ্যে গিয়ে সোনার হরিণ দেখতে পাননি। আদিবাসী গল্পের বাকি অংশটি বাল্মীকি রামায়ণেরই মত।
কুমার সুরেশ সিংহ মুন্ডা জাতির মধ্যে প্রচলিত রামায়ণের যে কাহিনী খুঁজে পান সেখানে রাম একজন আদর্শ রাজা এবং অবতার নন। বরং তিনি একজন দোষে-গুণে ভরা সাধারণ মানুষ। উত্তর-পূর্ব ভারতের মেচ জাতির রামায়ণে লক্ষণ গোমাংস ভক্ষণ করেছিলেন এবং উনি মুসলমান ধর্ম অবলম্বন করেন। লক্ষণের দুই পুত্র সন্তানের নাম যথাক্রমে হাসান ও হোসেন এবং পরবর্তীকালে লব-কুশ তাদের হত্যা করেন (রায় বর্মণ-১৯৫৮:৬৭-৬৯)। সাহিত্যিক নবনীতা দেবসেন তাঁর একটি বক্তৃতায় দেখিয়েছেন যে বাংলা, মারাঠী, মৈথিলী ও তেলেগু ভাষায় মহিলাদের রামায়ণী কথা শুনতে পাওয়া যায়। এর কোন লিখিত রূপ নেই। এই রামায়ণী কথাগুলিতে রাম প্রায় অনুপস্থিত। উল্টে রাম এখানে একজন দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষ, যিনি তার স্ত্রী সীতাকে অযথা বহু কষ্টের মধ্যে রেখেছিলেন। রামায়ণের নানা সংস্করণ এবং বিশেষ করে আদিবাসী রামায়ণ ও মহিলাদের মুখের কথায় বলা রামায়ণগুলি শুনলে মনে হয় যে রামায়ণ শুধু বাল্মীকি কথিত একটি কাহিনী নয়। ভারতবর্ষে রামায়ণের নানা ভাষ্য আছে। মূল একটি গল্প আছে বটে কিন্তু একই সঙ্গে আছে মহাকাব্যটির নানা বিচিত্র ভাষ্য। ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র এইসব নানা কাহিনীর মধ্যে বিবৃত হয়েছে। এই বৈচিত্রকে অস্বীকার করলে ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেই অস্বীকার করা হয়।
প্রখ্যাত পন্ডিত দীনেশ চন্দ্র সেনের মতে রামায়ণের একমাত্র নিষ্কলঙ্ক চরিত্র হলেন ভরত। ভরতের রাজত্বে সরকারী কোষাগারে প্রভূত অর্থ জমা হয়েছিল এবং রাজার বিরুদ্ধে প্রজাদের কোন অভিযোগ ছিল না। অবশ্য রামের চণ্ডাল বন্ধু গুহকই একমাত্র ভরতের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। দীনেশ চন্দ্র সেনের গ্রন্থ 'রামায়ণী কথা'র ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবিগুরুর ভাষায়:
রামায়ণ-মহাভারতকে কেবলমাত্র মহাকাব্য বলিলে চলিবে না, তাহা ইতিহাসও বটে। ঘটনাবলীর ইতিহাস নহে; কারণ সেরূপ ইতিহাস সময় বিশেষকে অবলম্বন করিয়া থাকে, রামায়ণ মহাভারত ভারতবর্ষের চিরকালের ইতিহাস।... রামের চরিত্র উচ্চ কি নীচ, লক্ষণের চরিত্র আমার ভালো লাগে কি মন্দ লাগে, এই আলোচনাই যথেষ্ট নহে। স্তব্ধ হইয়া শ্রদ্ধার সহিত বিচার করিতে হইবে সমস্ত ভারতবর্ষ অনেক সহস্র বৎসর ইহাদিগকে কিরূপভাবে গ্রহণ করিয়াছে। (ঠাকুর ১৯০৭:৫-১৩)।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ আজও সত্য। সমস্ত ভারতবর্ষ তার বিপুল বৈচিত্র্য বজায় রেখেই রামায়ণ পাঠ করেছে এবং আজও সেই পাঠ চালু আছে। ভরতের কথায় ফেরা যাক। আমরা সকলেই জানি যে ভরতের মাতা কৈকেয়ীর প্ররোচনায় দশরথ রাম, লক্ষণ ও সীতাকে বনবাসে পাঠিয়ে ভরতকে সিংহাসনে বসান। কিন্তু যা আমরা কমই জানি সেটা হল ভরত চৌদ্দ বছর রাজা ছিলেন বটে কিন্তু উনি একজন সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করতেন। দীনেশ চন্দ্র বলেছেন ভরত অযোধ্যা নগরী থেকে কিছু দূরে নন্দীগ্রাম নামে একটি স্থান থেকে রাজ্য পরিচালনা করতেন। (সেন, ১৯২৫:১২১)। এমনকি রাম, সীতা ও লক্ষণ যখন বনবাসের পথে তখন ভরত তাঁর সেনাদল নিয়ে ওদের পুনরায় অযোধ্যায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টাও করেছিলেন। রামের সাহায্যকারী চণ্ডাল বন্ধু গুহক ভরতকে বলেছিলেন: 'তুমি নিজের সিংহাসন রামকে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছ, তুমি আশীর্বাদযোগ্য, আমি তোমার মত কাউকে দেখিনি। (সেন, ১৯২৫:১২২)।
আগে একবার মেচ জাতির অতীব আশ্চর্য রামায়ণ কাহিনীর উল্লেখ করেছি। ওই প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসছি। প্রখ্যাত নৃতাত্ত্বিক বিক্রম রায়বর্মণ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আদিবাসী গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহ-অধিকর্তা থাকাকালীন উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলায় বোড়ো-কাছারী আদিবাসী গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত মেচ জাতির বর্ণনায় প্রথমেই উল্লেখ করেছেন যে মেচরা ওই অঞ্চলে প্রায় সপ্তম খ্রীষ্টাব্দ থেকেই বসবাস করত। পদ্মপুরাণে পাওয়া যায় যে মেচরাই স্লেচ্ছ নামে অভিহিত এবং এরা সবকিছুই খায়। তারা নির্বুদ্ধি, গোহত্যা ও ব্রাহ্মণদের হত্যা করে এই মেচরা। তাদের ভাষা পিশাচ এবং নীচ সামাজিক প্রথায় পরিপূর্ণ। এই অঞ্চলে চা বাগান শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত হিন্দু এবং মুসলমানদের সঙ্গে মেচদের খানিকটা যোগাযোগ ছিল। মেচরা তুলো চাষ করত। তুলোর বিনিময়ে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়গুলির থেকে ওরা ধান এবং লবণ নিত। যাইহোক, মোটামুটিভাবে পাহাড়ে বসবাসকারী মেচদের সঙ্গে সমতলভূমির হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সাংস্কৃতিক আদান প্রদান ছিল অনেকটাই সীমিত। এতদসত্ত্বেও ১৯৫২ সালে রায়বর্মণ মেচদের মধ্যে দুটি প্রাইমারী স্কুলে অনুসন্ধান চালানোর সময় দেখতে পান যে ওরা রামায়ণ ও মহাভারতের চরিত্রগুলির সঙ্গে পরিচিত। চরিত্রগুলি হল, ভীম, হনুমান, কৃষ্ণ, রাম এবং লক্ষণ। অর্জুন এবং সীতা ওদের কাছে অতটা চেনা নয়। রামায়ণ এবং মহাভারতের অন্য চরিত্রগুলি মেচদের কাছে পরিচিতই নয়। রায়বর্মণ ৮৬ বছর বয়স্ক বৃদ্ধ কানুরাম বসুমাতারি নামে একজন মেচ ব্যক্তির কাছ থেকে ওদের রামায়ণের কাহিনী শোনেন। ওই বৃদ্ধ উক্ত কাহিনী শুনেছিলেন তার বাবার কাছ থেকে। এবার আমি রায়বর্মণ সংগৃহীত মেচ রামায়ণের কাহিনী বর্ণনা করব।
রাম এবং লক্ষণ দুই ভাই ছিলেন। রাম ছিলেন রাজা আর লক্ষণ তার দাদার কাছে থাকতেন। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা দুই ভাইকে অনেকটা দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। কোন এক বিবাহ অনুষ্ঠানের সময় নিমন্ত্রিতদের পরিবেশন করার মাংস কম পড়ে গেছিল। এক ভৃত্য এই ঘটনার কথা রামকে জানায়। রাম যখন বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন ঠিক তখনই মুনি বিশ্বামিত্র রামের সঙ্গে দেখা করতে চলে এলেন। রাম যথারীতি বিশ্বামিত্রের সঙ্গে আলোচনায় মগ্ন হলেন এবং মাংস কম পড়ার কথা ভুলে গেলেন। ঠিক এইসময় একটি গরু রাজসভায় ঢুকে পড়ে উপদ্রব শুরু করে। রাম ভৃত্যের দিকে তাকিয়ে গরুটিকে সরিয়ে নিয়ে যেতে নির্দেশ করলেন। কিন্তু চাকরটি রামের ইসারাকে ভুল বুঝল। সে ভাবল রাম গরুটিকে সরিয়ে মাংস কম পড়ার ব্যাপারটি সমাধান করতে বলেছেন। এরপর রামের কাজকর্ম হয়ে গেলে উনি ভৃত্যটিকে ডেকে মাংস কম পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলেন। ভৃত্য উত্তর দিল যে সে রাজার নির্দেশ অনুযায়ী সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে। রাম প্রথমটা ভৃত্যের উত্তরের অর্থ বুঝতে পারলেন না। কিন্তু একটু পরেই সত্য উদঘাটিত হল। তখন রাম লক্ষণকে ডাকলেন এবং জানতে পারলেন যে লক্ষণের নির্দেশে ওই গরুটিকে হত্যা করে নিমন্ত্রিতদের গোমাংস পরিবেশন করা হয়েছিল। রাম তৎক্ষণাৎ ঘোষণা করলেন যে লক্ষণ আজ থেকে আর হিন্দু নন। তিনি হলেন মুসলমান। এরপর লক্ষণের ফতিমা নামে এক মুসলমান মহিলার সঙ্গে বিবাহ হয় এবং ওদের দুই যমজ পুত্র জন্মলাভ করে। ওই পুত্রদের নাম রাখা হয় হাসান ও হোসেন। ইতিমধ্যে রাম-সীতারও দুই পুত্র জন্মলাভ করেছে। তাদের নাম লব ও কুশ। কিন্তু সীতা খুব সংকীর্ণমনা ছিলেন। উনি নিজের ছেলেদের সবসময় ওদের মুসলমান কাকীমার থেকে কোন খাবার খেতে নিষেধ করতেন। সীতা এদিকে আবার হাসান-হোসেন বাড়িতে এলে তাদের সাথে খুব সুন্দর ব্যবহার করতেন। হাসান-হোসেন নিজেদের মা-কে লব ও কুশকে কোন খাবার না দেবার জন্য বকাবকি করত। অবশেষে বাধ্য হয়ে ফতিমা একদিন লব-কুশকে মিষ্টান্ন খেতে দিলেন। কিন্তু ওরা খেতে অস্বীকার করল। লব-কুশের এই ব্যবহারে হাসান-হোসেন অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয় এবং ওদের ধারণা হয় যে লব-কুশ ওদের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। এরপর থেকে হাসান-হোসেন যে কোনো হিন্দুকে বলপূর্বক মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করতে শুরু করে। লব-কুশ তখন আর উপায় না দেখে হাসান-হোসেনকে সম্মুখ যুদ্ধে আহ্বান করে। যুদ্ধের স্থান ঠিক করা হয় গঙ্গা নদীর অপর পাড়ে। গঙ্গা পেরোবার সময় লব-কুশ গঙ্গা মাতাকে প্রণাম করে। কিন্তু হাসান-হোসেন করেনি। গঙ্গা মাতা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে হাসান-হোসেন যাতে যুদ্ধের সময় তৃষ্ণার্ত হয়ে পানীয় জল না পান তার ব্যবস্থা করেন। এরপর রণক্লান্ত হাসান-হোসেন লব-কুশকে সাময়িক যুদ্ধ বিরতির জন্য অনুরোধ করলে রামের পুত্ররা সেই অনুরোধ রক্ষা না করে যুদ্ধ চালিয়ে যান। তখন হাসান-হোসেন রণভূমি ছেড়ে পলায়ন করেন। লব-কুশ ওদের তাড়া করে এক শুকিয়ে যাওয়া কুয়োর মধ্যে হাসান-হোসেনকে খুঁজে পান। একটি মাকড়শা কুয়োর মুখে ঘন জাল বুনে হাসান-হোসেনকে লুকিয়ে রাখা চেষ্টা করেছিল। কিন্তু একটি গিরগিটি পুরো ব্যাপারটি লক্ষ্য করেছিল এবং সে লব-কুশকে ইসারায় কুয়োটিকে আরও ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করার ইঙ্গিত দেয়। লব-কুশ হাসান-হোসেনকে খুঁজে পায় এবং বর্শার সাহায্যে ওদের হত্যা করে। হাসান-হোসেনের মর্মান্তিক মৃত্যুর সঙ্গে মেচদের রামায়ণ কাহিনী শেষ হয়। তবে সবশেষে ওই রামায়ণে বলা আছে যে এরপর থেকে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে এক চরম তিক্ততা সৃষ্টি হয় যা কিনা আজ পর্যন্ত চলে আসছে। (রায় বর্মণ, ১৯৫৮:৬৯)।
রামায়ণের উপর এ পর্যন্ত যে সমস্ত নৃতাত্ত্বিক গবেষণা হয়েছে তার সারমর্ম একটিই। সেটি হল ভারতবর্ষে রামায়ণের নানা সংস্করণ আজও বিদ্যমান যা বাল্মীকি রামায়ণের থেকে অনেকাংশেই আলাদা। এই সমস্ত রামায়ণে রামকে অবতার বা দেবতা হিসেবে দেখা হয়নি বরং একজন সাধারণ দোষ-গুণ সম্পন্ন মানুষ হিসেবেই দেখা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাম রাজ্যের চেয়ে ভরত পরিচালিত অযোধ্যা কোন অংশে কম শ্রেষ্ঠ ছিল না। রাজা হিসেবেও ভরত একজন অত্যন্ত সফল মানুষ। লক্ষণও একজন অত্যন্ত ন্যায় পরায়ণ মানুষ ছিলেন যিনি এমনকি মুসলমান হয়েও কখনও রামের ক্ষতি করেন নি। রামায়ণকে শুধু একটি ভক্তিমূলক ও নীতি উপদেশে ঠাসা ধর্মগ্রন্থ হিসেবে না দেখে সমাজদর্পণ হিসেবেও পাঠ করা যায় এবং এ ব্যাপারে নৃতাত্ত্বিকদের অবদান কম নয়।
১। Basu, R. (1946) Valmiki Ramayana (Summarized and translated in Bengali from original Sanskrit)
Calcutta: M.C. Sarkar and Sons.
২। Royburman, B. (1958). 'Story of Ramayana as related by a Mech elder'. Indian Folk-Lore. 1(IV):
67:69.
৩। Dev Sen, N. (2002). 'Meyeder Ramayan Gaan'. Fifth Chandan Kumar Bhattacharyya Memorial Lecture held on 29th April 2001 at the Presidency College, Kolkata.
৪। Karve, I. (2017). Yuganta: The End of an Epoch. Orient Blackswan: Hyderabad.
৫। Kaushal, M. (2021). Lakshman's Trial by Fire: Does the Gond Ramayani Invert the Ramayan? https://indianculturalforum.in/2021/08/12/lakshmans-trial-by-fire-does-the-gond-ramayani-
invert-the-ramayan (Accessed on 03.05.2025).
৬। Naik, T.B. (1993). 'Rama-katha among the Tribes of India' in Rama-katha in Tribal and Folk Traditions of India, pp 31-48. Eds. K.S. Singh and Birendranath Datta. Anthropological Survey of India. Calcutta: Seagull Books.
৭। Ratnagar, S. (2004). 'Archaeology at the Heart of a Political Confrontation: The Case of Ayodhya' in Current Anthropology. 45(2):239-249.
৮। Report of the Liberhan Commission of Inquiry (1992). Conclusions (Chaper 14). New Delhi: Government of India.
৯। Sankalia, H.D. (1977-1978). 'Ayodhya of the Ramayana in a Historical Perspective. Annals of the Bhandarkar Oriental Research Institute. Vol. 58/59, Diamond Jubilee Volume (1977-1978), pp. 893-919.
১০। Singh, K.S. (1993). 'Introduction' in Rama-katha in Tribal and Folk Traditions of India, pp. 1-9. Eds. K.S. Singh and B. Datta. Anthropological Survey of India, Calcutta: Seagull Books.
১১। Singh, K.S. (1993). "Tribal Versions of Rama-Katha: An Anthropological Perspective' in Rama-katha in Tribal and Film Traditions of India, pp. 31-48. Eds. K.S. Singh and B. Datta.
১২। Anthropological Survey of India, Calcutta: Seagull Books.
১৩। Varghese, R.A. (2024). 'Archacology for the courtroom: The Ayodhya Case and the fashioning of a hybrid episteme'. Journal of Social Archaeology. 24(2): 109-129.
১৪। Sen, D. (1925). Ramayani Katha. Bhattacharya and Sons: Kolkata.
১৫। Sen, S. (1977). Ramkathar Prak Itihas. Kolkata: Jigyasa.
১৬। Tagore, R. (1907). Ramayan. pp. 5-13. In Prachin Sahitya by R. Tagore. Viswa Bharati.
১৭। Vyas, N.N. (1993). 'The Tribal view of the Ramayana: An Exercise in the Anthropology of Knowledge', in Rama-katha in Tribal and Folk Traditions of India, pp. 10-14. Eds. K.S. Singh and B. Datta. Anthropological Survey of India, Calcutta: Seagull Books.