সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
ষাটের দশকের স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত কথাসাহিত্যিক, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার নিরিখে পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র এবং 'পরিচয়' পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলির অন্যতম হিসাবে সুপরিচিত সাধন চট্টোপাধ্যায় (জন্ম :১৯৪৪)। ২০২৫-এর বইমেলায় 'মণীষা গ্ৰন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড'- প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ সংকলন 'কথাসাহিত্যিকের চোখে পূর্বসূরী'-তে যে বারোটি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে তাতে পূর্বসুরী নির্বাচনে এবং তাঁদের সাহিত্যকৃতির আলোচনায় লেখকের বিজ্ঞানচেতনা এবং বামপন্থী মনন আগাগোড়াই হাত ধরাধরি করে চলেছে। রবীন্দ্রনাথ (জন্ম:১৮৬১)-এর 'সে' কেন্দ্রিত প্রবন্ধে সূচিত পূর্বজ গদ্যলেখকদের নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে অমলেন্দু চক্রবর্তী (জন্ম: ১৯৩৪) পর্যন্ত জন্মসনের অনুক্রম বজায় রেখে; তবে সংকলনের শেষতম প্রবন্ধে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ (জন্ম: ১৯৩০)-কে উপস্থাপন করা হয়েছে এই কালক্রম ভেঙে। সবমিলিয়ে দুই মলাটের মধ্যে সাজিয়ে দেওয়া রয়েছে দশ জন অগ্ৰজ কথাসাহিত্যিককে নিয়ে ১৯৯০ থেকে ২০২৪ এর মধ্যে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এবং কিছু স্মারক প্রবন্ধসংকলনের অঙ্গ হিসাবে পূর্বপ্রকাশিত বারোটি প্রবন্ধের সম্ভার। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সমরেশ বসু সম্পর্কে দুটি করে প্রবন্ধ রয়েছে , অন্য আটজনের প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ একটি করে প্রবন্ধ। ঐ দশ জনের প্রত্যেকেরই প্রায় অনালোচিত অথচ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিশিষ্টতার দিকে সাধারণ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই আলোচিত সাহিত্যিকদের , যেমন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বা সমরেশ বসুর মতো যশস্বীদের পাশাপাশি ননী ভৌমিক বা সুলেখা সান্যালের মতো খানিক একটেরে কথাসাহিত্যিকেরও, ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে চেনা, আধোচেনা এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রায় অজানা তথ্যও সরবরাহ করেছেন, যা পাঠকের বাড়তি পাওনা।
বইটির কোনো আলোচনাই কোনো একজন সাহিত্যিক বা তাঁর একটি মাত্র রচনায় আটকে না থেকে সহিত্য,সমাজ এবং রাজনীতি তথা অর্থনীতির ব্যাপ্ত ক্ষেত্রে বিচরণ করেছে সাবলীল ভাবে।
গ্ৰন্থের ' রবীন্দ্রনাথের সে : বাংলা ভাষার সায়েন্স ফিকশন-এর অগ্রপথিক 'শীর্ষক প্রথম প্রবন্ধটির সূচনা "সায়েন্স ফিকশন"-এর বাংলা ভাষান্তরিত সমার্থক 'কল্পবিজ্ঞান' শব্দবন্ধটির আপাত বৈপরীত্য থেকে শব্দটির প্রকৃত তাৎপর্য উদ্ধারের প্রয়াসে এবং বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশের ফলশ্রুতিতে কীভাবে সায়েন্স ফিকশনের আবির্ভাব তার ব্যাখ্যায়। (প্রবন্ধকার সায়েন্স ফিকশন এর একটি যুক্তিসঙ্গত নতুন পরিভাষার প্রস্তাব করেছেন — "বিজ্ঞানকল্প"।) প্রবন্ধের দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছে শিশুপাঠ্য তথা অদ্ভুত রসের আধার বিবেচনায় কিছুদূর উপেক্ষিত গ্ৰন্থ 'সে' নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা। রবীন্দ্রনাথের উৎসর্গপত্রটি বিশ্লেষণ করে প্রাবন্ধিক যেমন গ্ৰন্থটির অন্তর্নিহিত বিজ্ঞানমনস্কতার প্রমাণ পেশ করেছেন, তেমনি নিষ্কাশন করেছেন ১৯৩৭-এ প্রকাশিত গ্ৰন্থটির আখ্যানে বাখতিন কথিত দ্বিবাচনিকতার চিহ্ন।
আবার এই ১৯৩৭-কালচিহ্নিত গ্ৰন্থেই প্রবন্ধকার সন্ধান পেয়েছেন ১৯৬১ বা ১৯৬৯-এ মানুষের মহাকাশচারণার ভবিষ্যতবাণী, আপাত আজগুবিত্বের তলায় সনাক্ত করেছেন প্রথম প্রাণের আবির্ভাব, এককোষী শৈবাল থেকে বহুকোষী মানুষে বিবর্তনের ভাষ্য থেকে শুরু করে রূপান্তরকামীর অধিকার ও সমস্যার কিংবা ঈশ্বরকণার প্রসঙ্গ। তাই প্রবন্ধের শেষ ভাগে এসে এই অপূর্ব সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়েছে — "শুধু প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নয় ভাষাবিজ্ঞান সমাজতত্ত্ব থেকে মানব সভ্যতার নানা প্রবর্তনের ইঙ্গিত 'সে' গ্রন্থের গল্পকাঠামোটির তলায় আলো বিতরণ করছে।... বর্তমান বাংলায় বিজ্ঞানকল্প বা কল্পবিজ্ঞানের ধারায় আমি গ্রন্থটিকে অগ্রপথিক হিসেবে চিহ্নিত করতে চাই।"(পৃঃ ১৬-১৭)।
গ্ৰন্থটির একাধিক রচনায় প্রাবন্ধিক সাধন চট্টোপাধ্যায় প্রসঙ্গের খাতিরে বাংলা গল্পরচনার ধারাবাহিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বের টুকরো টুকরো রূপরেখা বা মানচিত্র নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছেন। এগুলিকে একত্র করলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এরকম যে, ইওরোপে শিল্পবিপ্লবের অভিঘাতে ব্যক্তি-চিহ্ন বিরহিত সামন্ততান্ত্রিক কৌম গ্ৰামীণ সমাজকাঠামো ভেঙে নগরকেন্দ্রিক যে শিল্পপুঁজিনির্ভর সমাজের জন্ম হ'ল, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যই সেই নতুন সমাজের প্রধান অভিজ্ঞান হয়ে ওঠায় এই নবগঠিত সমাজকাঠামোর অন্যতম সাংস্কৃতিক ফলশ্রুতি হিসেবে ছোটগল্পের উদ্ভব। বাংলা ছোটগল্পের আবির্ভাবের ক্ষেত্রে ইওরোপসদৃশ তেমন কোনো শিল্পবিপ্লবের চিহ্নমাত্র ছিল না; প্রধানত দেশীয় ঐতিহ্যে নিহিত কথকতার উত্তরাধিকার আর ইওরোপীয় ব্যক্তিনির্ভর কাহিনী বর্ণনের রীতি — দুইয়ের মিশেল রবীন্দ্রনাথের অলোকসামান্য প্রতিভাগুণে বাংলা ছোটগল্পে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে। রবীন্দ্রনাথের অব্যবহিত উত্তরকালে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার মধ্যে ঐ মধ্যযুগীয় কৌম সমাজ এবং তার কথকতাপ্রতিম উপস্থাপনা এমন সজীবতা নিয়ে ফুটে উঠল যে, ইওরোপমুখী সেযুগের তথাকথিত 'আধুনিক' বুদ্ধিজীবীদের স্বাদকোরকে তা গ্ৰাম্যতা দোষে দুষ্ট এবং অশিক্ষিতপটুত্ব হয়ে ঠেকল। অথচ সাধন চট্টোপাধ্যায় এই গ্ৰন্থভুক্ত দ্বিতীয় প্রবন্ধে 'হাঁসুলি বাঁকের উপকথা'-কে নমুনা-স্বরূপ ব্যবহার করে দেখিয়েছেন যে রাঢ়ের আঞ্চলিকতায় জারিত রসের সুবাসই— যাকে ঐ 'আধুনিক'-রা গ্ৰাম্যতা বা অপটুতা ভেবে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন— জন্মের ১২৫বছর পরেও বাংলাভাষার উপন্যাসকার হিসাবে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাসঙ্গিকতাকে প্রাণবন্ত করে রেখেছে। প্রসঙ্গত, এই অঞ্চলত্বের প্রধান উপকরণ যে মিথ বা আঞ্চলিক পুরাণ এবং বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থাকা আধুনিক সর্বব্যাপী যুক্তিবাদপুষ্ট মূলস্রোতের ইতিহাস — এই দুই বিষয় নিয়ে নাতিদীর্ঘ আলোচনা এবং সর্বোপরি 'হাঁসুলি বাঁকের উপকথা'য় ব্যবহৃত কিছু আঞ্চলিক শব্দের অর্থ সহ প্রবন্ধকারের দেওয়া তালিকাটি গবেষক ও অভিধানকারের কাছে প্রবন্ধটিকে অত্যন্ত আদরণীয় করে তুলবে বলেই মনে হয়।
গত শতাব্দীর বিশের দশকে কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা এবং ত্রিশের দশকে গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘের উত্থান চল্লিশ এবং পঞ্চাশের দশকে বাংলা গল্পরচনার পরিস্থিতিকে ব্যাপক প্রভাবিত করে। উঠে আসে বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় একদল তরুণ-তরুণী যাঁরা সমাজতান্ত্রিক আদর্শের পতাকার তলায় দাঁড়িয়ে প্রগতিশীল সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমে ভবিষ্যত শ্রেণিহীন সমাজের পথ তৈরি করতে চাইলেন । এই আদর্শবাদী লেখককুলেরও ছিল প্রধানত পাশ্চাত্যের গল্প-উপন্যাসের ধারায় তীক্ষ্ণ নজর, ফলত, দেশীয় কথকতার ধারাটি ক্রমেই স্তিমিত হতে থাকে। যুগপৎ বিস্তৃত হতে থাকে প্রগতিশীল লেখক শিবির। এমনকি জাতীয়তাবাদী তারাশঙ্করও এই নতুন ধারার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছিলেন।
প্রগতিবাদী এই শিবিরের তৎকালীন প্রধান মুখ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে প্রবন্ধকারের যথার্থ মূল্যায়ন:"আসলে, ব্যক্তি,ব্যক্তির সংকট ও ব্যাধি এবং তার হাত থেকে ব্যক্তির পরিত্রাণের পথ খোঁজাই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (-এর?) সাহিত্য জীবনের odyssey বা দর্শন যাত্রা।"(পৃঃ২৭) । প্রথম জীবনে ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের ওপর ভর করে সেই অভিযাত্রা সূচিত হলেও ১৯৪৪-এ কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভের পর সমাজ বিপ্লবের আদর্শে প্রাণিত হয়ে সমষ্টিগত জীবনের মধ্যে থেকেই মানিক ব্যক্তির সংকটমুক্তির পথ খুঁজেছেন। পরাধীন ভারতীয় সমাজে অন্যতম শেষ উপন্যাস মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিহ্ন (১৯৪৭)। প্রবন্ধকার সাধন চট্টোপাধ্যায় মনে করেন যে এই উপন্যাসের মাধ্যমে আসলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে বাংলা উপন্যাসের ধারায় ভাবিকালের গণসাহিত্যের একটি বীজ উপ্ত হয়েছে। ১৯৪৫ এর ২১শে নভেম্বর আজাদ হিন্দ ফৌজ দিবসে ছাত্র মিছিলের ওপর ঘটে যাওয়া পুলিশী সন্ত্রাসের প্রতিক্রিয়ায় প্রতিবাদী জনমানসে সৃষ্ট আলোড়নের মধ্যেই ব্যতিক্রমী উপন্যাসটির অনুপ্রেরণাকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন প্রবন্ধকার।
আবার দে'জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপ্রকাশিত প্রবন্ধের সংকলন 'প্রবন্ধসমগ্র এবং' গ্ৰন্থের সমালোচনা প্রসঙ্গে প্রবন্ধকার দেখিয়েছেন ১৯৭৪-৭৫-এ 'এক্ষণ' পত্রিকার উদ্যোগে অপ্রকাশিত ডায়েরি ও চিঠিপত্র প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণার বাইরে গিয়ে পার্টি প্রগতি আন্দোলন এবং ব্যক্তি মানিক নতুন নতুন লেন্সের মধ্য দিয়ে’ সেই যে পরিচয় উন্মোচনের সূত্রপাত, একে একে যুগান্তর চক্রবর্তীর সম্পাদনায় অরুণা প্রকাশনী থেকে বেরোনো অপ্রকাশিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি থেকে প্রকাশিত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাবলী,সজনীকান্ত দাস কৃত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনাপঞ্জির তালিকা সেই ধারাকেই পূর্ণতা দিতে প্রয়াস পেয়েছে। প্রথমে দীপ প্রকাশন এবং কালক্রমে দে'জ থেকে প্রকাশিত 'প্রবন্ধসমগ্র এবং' গ্ৰন্থটিও সেই প্রয়াসের ক্ষেত্রে একটি নতুন এবং উজ্জ্বল সংযোজন।
প্রগতিপন্থী গদ্যলেখকদের মধ্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু এবং ননী ভৌমিক রাশিয়াপ্রবাসী হওয়ার পর, প্রবন্ধকার মনে করেন, উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক ছিলেন সমরেশ বসু। মাইকেল মধুসূদন কিংবা রামকিঙ্করের মতো সমরেশ বসুর জীবনও ছিল গড়পড়তা বাঙালির তুলনায় বেশ অন্যরকম, সমরেশ বসুর নিজের কথায় বলতে গেলে বেশ নাটকীয় তথা বিতর্কিত। এ হেন সমরেশ বসুর জন্মশতবর্ষে পুনর্বিবেচনা প্রসঙ্গে একজন কমিটেড অথচ পেশাদার লেখকের কালক্রমে আনন্দবাজার-পোষিত তারকা সাহিত্যিক হয়ে ওঠার মধ্যে আদর্শচ্যুতি ঘটেছে কি না আর ঘটলে তার সূত্রপাত কোন্ বিন্দুতে, আজকের বাজারমুখী মূল ধারার সাংস্কৃতিক আবহের প্রেক্ষিতে জরুরী এই প্রশ্নগুলি প্রাবন্ধিক উত্থাপন এবং বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। প্রসঙ্গত পেশ করা হয়েছে সমরেশ বসুর জীবনের একটি সরল রেখাচিত্র এবং এসেছে সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে লিখেও না পাঠানো একটি অত্যন্ত জরুরি চিঠির প্রসঙ্গ । পরবর্তী স্বতন্ত্র একটি প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে সমরেশের গল্পের অন্তর্নিহিত নাট্যবস্তুর স্বরূপ ও প্রকৃতি। ষষ্ঠ ঋতু,অকাল বৃষ্টি ইত্যাদির বিশ্লেষণের পাশাপাশি তাঁর রচনার নাট্যরূপগুলির একটি নির্বাচিত সংকলন প্রকাশের আর্জিতে প্রবন্ধের সমাপ্তি।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে একদা চালু ধারণা ছিল, তিনি নিছকই স্বভাবজাত প্রতিভাবান। "এই প্রতিভার সঙ্গে বিস্তর পড়াশোনার যোগ থাকলে আরো কত বড় সাহিত্যই না আমরা পেতাম.." — এই বিভ্রান্তিকর মন্তব্য অকাল প্রয়াত সোমেন চন্দের (পৃঃ ৪০-৪১)। কিন্তু অব্যবহিত পরের প্রবন্ধে সাধনবাবু দেখিয়েছেন যে নির্দিষ্ট আদর্শ রক্ষার জন্য বাঙলা সাহিত্যের আঙিনায় প্রথম শহীদের প্রতি শুধু মাত্র সহানুভূতি সম্পন্ন পূর্বসংস্কারের অনচ্ছতা কাটিয়ে ২২ বছরের জীবৎকালে লিখিত সোমেন চন্দের অল্প সংখ্যক গল্পের দিকে যদি নিবিষ্ট চোখে তাকানো যায় তাহলে দেখা যাবে, সমাজতান্ত্রিক ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়েও গদ্যকার সোমেন চন্দ অনেক বেশি রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের অনুসারী। তৎকালীন প্রগতি শিবিরের শরিক হলেও তাঁর লেখায় শ্রেণিচেতনা প্রকাশের তাড়না বিশেষ চোখে পড়ে না, বরঞ্চ জীবনের স্বাভাবিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে সূক্ষ্ম রেখায় তুলে আনার মুন্সিয়ানা সোমেন চন্দের বিশিষ্টতার দ্যোতক। তাঁর গল্পে যৌনশক্তি যে সুস্থ জীবনধারণের একটি উপাদান হিসাবে সাবলীলভাবে ফুটে উঠেছে, কোন বিকার বা বিকৃতি হিসাবে নয়,তা তাঁর বহুল আলোচিত 'ইঁদুর'গল্পের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে 'সোমেন চন্দকে নিয়ে' শীর্ষক প্রবন্ধে। সোমেন চন্দের প্রতি বাঙালি পাঠকের উদাসীনতার কথায় কথায় বাংলা সাহিত্যে কলকাতাকেন্দ্রিকতা এবং "এলিটিজম ও নন-এলিটিজমের দ্বন্দ্ব"-র ব্যাপারটিও এই লেখাটিতে ঢুকে পড়েছে।
আর বাঙালি পাঠকের উদাসীনতার কথা বলতে গেলে বলতে হয়,বাঙলা ভাষায় প্রাক্-স্বাধীনতা যুগের লেখিকাদের মধ্যে সর্বাধিক উপেক্ষার শিকার সুলেখা সান্যাল। সাম্যবাদে আস্থাশীল এক লেখিকার কলমে নারীর ভাষাগত স্বাতন্ত্র্য এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-সংসারকে দেখার নিজস্ব ভঙ্গি কীভাবে ফুটে উঠেছে তা প্রবন্ধকার দেখিয়েছেন 'উলুখড়','সংঘাত' এবং 'খেলনা' গল্পগুলির সংক্ষিপ্ত আলোচনার সূত্র ধরে।
পঞ্চাশের দশকে সমাজমুখী প্রগতিবাদী সাহিত্যিকদের রচনা যখন ধর্মঘট, মিছিল, বুর্জোয়া শোষকের হাত থেকে শোষিত মানুষের মুক্তির পথ খুঁজে সমাজতান্ত্রিক জগত গড়ার লক্ষ্য পূরণ এসবে অনন্যমনা, সেই সময় প্রগতিশীল শিবিরের দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলম থেকে বেরিয়ে এল এমন কিছু গল্প, চরিত্রগতভাবে একান্ত 'আর্বান' হয়েও যাদের মধ্যে শুধু মাত্র শ্রেণিবিভক্ত সমাজে সর্বহারার ভবিষ্যত জয়ের আশা মোটা দাগে চিত্রিত না হয়ে প্রায় বিপরীত শিবিরের বিমল করের 'নতুন গল্প' লেখার আহ্বানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ব্যক্তিমানুষের মনস্তাত্ত্বিক সংকট, রাজনৈতিক চেতনা ও অস্তিত্ববাদী চিন্তার দ্বন্দ্ব, অন্তর্মুখী আত্মজিজ্ঞাসা, গল্পের নিরীক্ষা মূলক কাঠামো নির্মাণ ইত্যাকার প্রবণতা দেখা দিল। বয়সের বিচারে সোমেন চন্দের তুলনায় একদশক নবীনতর দীপেন্দ্রনাথেরও লেখা গল্প-উপন্যাস-রিপোর্টাজ ধর্মী রচনার সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। পার্টি নেতৃত্বের বিরাগভাজন হয়েও দীপেন্দ্রনাথ নিজস্ব চিন্তাচেতনাকে কোনো মতেই বিসর্জন দেননি। বর্তমান গ্ৰন্থে 'দায়ী', 'উৎসর্গ' এবং 'শোকমিছিল' গল্প তিনটিকে আশ্রয় করে দীপেন্দ্রনাথের সেই দৃপ্ত মৌলিকতার সন্ধান করা হয়েছে। সাথে রিপোর্টাজধর্মী সাহিত্যসৃজনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকৌশলী দীপেন্দ্রনাথের আখ্যান বুননের তথা আঙ্গিক সচেতনতার মুগ্ধ মূল্যায়ন মেলে এই গ্ৰন্থে।
প্রাগাধুনিক বাঙালি সমাজে কথকতার উত্তরাধিকার ছিল ঐতিহ্যগত, সে কথা আগেই বলা হয়েছে। বিশ্ববীক্ষায় আধুনিক হয়ে ওঠার অসম্ভব তাগিদে তথা ইওরোপঅনুসারী নগরকেন্দ্রিকতার ঝোঁকে কল্লোল-কালিকলম-উত্তর বাংলা ছোটগল্প থেকে যে সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার অপসৃত হতে বসেছিল, বর্তমান প্রবন্ধগ্ৰন্থে দেখানো হয়েছে, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের কলমে ভর করে তা আবার কীভাবে প্রাণ পেল। মুস্তাফা সিরাজের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে লেখক বলতে চেয়েছেন যে মুসলিম সমাজ ও সংস্কৃতির কাহিনীর রূপায়ণের দক্ষতাতে তার প্রতিভা সীমাবদ্ধ নয়। তিনি আসলে আধুনিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যনির্ভর ইউরোপীয় ছোটগল্পের উপস্থাপন রীতির সঙ্গে লৌকিক বাংলার কথকতা ভিত্তিক কথনরীতির সার্থক মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। আর এই বক্তব্য উপস্থাপন করতে গিয়ে জন্মসূত্রে ইউরোপীয় ছোটগল্পের ব্যক্তিনির্ভর কথন ভঙ্গিমার সাথে বাংলা গল্পের নাড়ির যোগ এবং ঐতিহ্যবাহী কথকতার সাথে এই আধুনিক সাহিত্যিক রূপকল্পের মিলন-বিচ্ছেদের ধারাটির একটি অসাধারণ পরিচিতি প্রবন্ধটিকে সমৃদ্ধ করেছে। মুস্তাফা সিরাজের লোকজীবনের সাথে নিবিড় যোগাযোগ এবং বামপন্থী মানসের পারিবারিক উত্তরাধিকার — এসবের কথাও প্রবন্ধে জায়গা পেয়েছে।
'ধূলোমাটি'র রচনাকার এবং রুশ ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি অনুবাদকের ভাষান্তরনের সাবলীলতা এবং রুশ ভাষায় লেখা বিচিত্র বিষয়ের অনুবাদের সপ্রশংস উল্লেখের চেয়েও ননী ভৌমিকের পরোপকারী স্বভাব, তাঁর এদেশের একটি অমসৃণ প্রেমসম্পর্ক এবং পরবর্তী কালে প্রবাসে বিদেশি স্ত্রীকে ঘিরে একান্ত ব্যক্তিজীবনের ট্র্যাজেডি সাধন বাবুর প্রবন্ধে বেশি জায়গা পেয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে জানা যায়, সেযুগের রাশিয়া-প্রবাসী বাঙালি অনুবাদকেরা প্রগতি প্রকাশনায় কাজ করতেন নির্দিষ্ট মাইনের বিনিময়ে নয়, ফুরনে, অর্থাৎ যে যত অনুবাদ করবেন তাঁর তত উপার্জন। সাধারণ পাঠকের জন্য ননী ভৌমিককে অন্য ভাবে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে প্রবন্ধটি।
বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত । বাংলা গল্পের মননশীল তত্ত্বজিজ্ঞাসু পাঠকের কাছে বইটি সমাদৃত হবে,এই আশা রাখি। তবে এমন একটি ভালো প্রবন্ধগ্ৰন্থের সবচেয়ে বড় ত্রুটি ভয়াবহ মুদ্রণপ্রমাদ।