সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
হুটারের শব্দটা আসছিল। এরপর হেডলাইটের আলো চোখে পড়াতে দীপনরা বুঝল, এবার আসছে। ইতিউতি ছড়ানো মানুষগুলো সচেতন হয়ে উঠল, একজায়গায় এসে জড়ো হল। বিকেলের আলো মরে আসছে। গাড়িটা এসে পড়েছে। সামনে লেখা ‘স্বর্গরথ’! এই সময়েও দীপন একটু হাসল। স্বর্গেই যেতে চেয়েছিল তাহলে চাঁদু দা? এইভাবে? পোশাকী নাম চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। ইস্কুলে সবার কাছে সিএনবি। আবার কারুর কারুর কাছে বাংলা স্যার। দীপনও ওঁর ছাত্র। তবে সিএনবি যে কবে দীপনের কাছে চাঁদু দা হয়ে গেল, সেটা দীপনের মনে পড়ে না! ইস্কুল ছাড়ার অনেক পরে তো বটেই। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পরে ক্লাসের অনেকের সাথেই আর যোগাযোগ নেই, আর চাঁদু দা তো স্যার! চাঁদু দা ক্লাসে বলেছিল একদিন, আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইণ্ড। তবু রাস্তাঘাটে দেখা হলে না চেনার ভান করে মুখ ঘুরিয়ে চলে যাস না, বাবারা! মুখ ঘুরিয়ে তো তুমিই চলে গেলে চাঁদু দা! দীপনের গলার কাছটায় দলা পাকিয়ে এল! সারাদিনে এই প্রথম!
শুধু যোগাযোগ নয়, চাঁদু দা দীপনের বন্ধু হয়ে উঠেছিল। সত্যি সত্যি বন্ধু! মনের কথা, প্রাণের কথা শেয়ার করা বন্ধু। শুধু ও চাঁদু দা’র এক পাত্তরের বন্ধু হতে পারেনি! এ কথাটা চাঁদু দা বলেওছে অনেকবার। ‘ তুমি তো খোকাবাবু রয়ে গেলে চিরটাকাল, দীপন! ও রসে বঞ্চিত হলে কবিতার আত্মার সঙ্গে মোলাকাত হবে কী করে তোমার!’ এসব কথা দীপন সবসময় হেসে এড়িয়ে গেছে! উত্তর করেনি। কথাটা মাথায় আসার পর দীপন ভেতরে ভেতরে কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল ! আজকে চাঁদু দার এই পরিণতির জন্য কি ও নিজেও দায়ী নয়? ও কি পারত না, আরেকটু সক্রিয় হয়ে চাঁদু দাকে ঐ কুহক থেকে বের করে আনতে? অন্তত চেষ্টা করতে? প্রশ্নটা আজ সারাদিন যতবার মাথায় এসেছে, ততবারই দীপন অস্থির হয়ে উঠেছে! দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দীপন হাসপাতালে ছুটেছে, তারপর মর্গ, থানা সর্বত্র গিয়েছে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ছুটে চলেছে এই নাছোড় প্রশ্নটা! ওর মাথায় এল, “ …হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়!/ আমি তারে পারি না এড়াতে…”। এখানেও চাঁদু দা ! চাঁদু দা মাথায় চেপে না বসলে এইসব কথায় কথায় কবিতা আসত দীপনের? বন্ধুবান্ধবের কাছে আওয়াজ শুনতে হত আঁতেল বলে?
মাথার মধ্যে হাজার কথা ঘুরপাক খায়। দীপন যখন প্রথম চাঁদু দা’র খবরটা অর্কর ফোনে পেল, তখন ও এতটাই হতভম্ব হয়ে গেছিল, যে ঠিকঠাক রিয়াক্টও করতে পারেনি । ফোন কানে ঠেকিয়ে চুপ করেছিল। অর্কই ধ্যাতানি দিল, কি রে, চুপ মেরে গেলি যে! ফোন ছাড়। স্টেট জেনারেলে আয়, আমরা যাচ্ছি। বহুত ঘোটালা কেস আছে। পিএম ফিএম হবে! অর্ক হয়ত আরও কিছু বলেছিল, এখন মনে করতে পারছে না দীপন। ওর হাত থেকে ফোন ছেড়ে গিয়েছিল।
ওর স্কুল জ্ঞানেন্দ্র বিদ্যানিকেতনের স্যাররা অনেকে এসেছেন। ওঁরাই উদ্যোগ নিয়ে নানা প্রয়োজনীয় কাজ সারছেন। আছেন স্কুলের কমবয়সী হেডমাস্টারমশায়। তিনিই সকলকে নানা কথা বলছেন, কী করতে হবে, জানাচ্ছেন। ইনি দীপনদের সময় ছিলেন না। ভদ্রলোককে বেশ করিৎকর্মা মনে হচ্ছে।
বেশ কিছু মানুষজন জড়ো হয়েছেন চাঁদু দা’র বাড়ির সামনে। সবাইকে দীপন চেনে না। এঁরা পাড়া প্রতিবেশী হবেন নিশ্চয়ই। চাঁদু দা’র বাড়ির একতলা, দোতলার সবকটা দরজা জানলা বন্ধ! কেমন অদ্ভুত লাগে দীপনের! এই সময় তো দশটা মানুষ আসবেন বাড়িতে। সেটাই স্বাভাবিক। এখন এইভাবে খিল এঁটে থাকার কোনো মানে হয়! সংসারের মাথা হিসেবে যিনি ছিলেন, তাঁর এই আকস্মিক এবং অস্বাভাবিক চলে যাওয়াকে মেনে নেওয়া সত্যিই খুব কঠিন, বিশেষত আপনজনেদের পক্ষে! শোকপ্রকাশেরও কোনো বাঁধা, শালীন পথ থাকতে পারে না, এ সব কথাই মানে দীপন। তাই বলে যে মানুষগুলো সকাল থেকে ছুটে এসেছে, সবরকমভাবে পাশে দাঁড়াচ্ছে, সব কাজ, সব ঝঞ্ঝাট নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে, তাদের জন্যও তো দরজা খুলে রাখতে হবে! অনেক হাঁকাহাঁকি, দরজা ধাক্কাতেও যে দরজা খুলছিলেন না ওঁরা, এতে দীপনের বেশ বিরক্ত লাগল। ও ওখান থেকে চলেই যাবে ভাবছিল। যাক, শেষপর্যন্ত দরজা খুলেছে। হেড স্যার সঙ্গে দু’চারজনকে নিয়ে ভেতরে গেছেন। দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেছে!
চাঁদু দা’র বাড়ির সামনে জটলা বড় হচ্ছে ক্রমশ। অনেকে হয়ত মজা দেখতেও দাঁড়িয়ে পড়েছেন! নানা কথা ভেসে আসছে। ইতিউতি নয়, স্পষ্টাস্পষ্টি। অনেক ছাত্ররাও খুল্লামখুল্লা যা মুখে আসছে, বলছে। স্যার তো হেবি মাল খেত! মন্তব্যটা শুনে দীপন গুটিয়ে যায়। অনেকের কথাতেই ঘুরে ফিরে আসছে, আজকাল সব কিছুই শেষ হয়ে আসছে! আগের দিনে রাস্তাঘাটে ইস্কুলমাস্টার দেখলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসত মানুষের! আর আজকে দেখতে হচ্ছে, মাস্টার আর আর তার পোলা রাস্তার ওপর মালের বোতল নিয়ে টানাটানি করছে! হে রে কলিকাল!
দীপন আর পারে না, ওখান থেকে সরে আসে। এতটা না হলেও এ ধরনের কথা এদিক ওদিক থেকে দীপন শুনেছে আগেই। এসব কথা রসিয়ে বলার লোকের অভাব নেই! দীপনের শুধু একটা কথাই মনে হয়, নিজের এলাকায় এত বছর ধরে মাস্টারি করা একটা মানুষ, যিনি যথেষ্ট সুনামের সঙ্গে নিজের কাজটা করেছেন, ছাত্রদরদী হিসেবে যাঁর নাম লোকের মুখে মুখে ফিরত এই সেদিনও, যিনি বাড়িতে অন্যদের মত ছাত্র পড়ানোর টোল খুললে মাইনের টাকা ব্যাঙ্কেই রেখে দিতে পারতেন মাসের পর মাস, যাঁকে কোনোদিন জোরে একটা কথা বলতে শোনেননি কেউ, কী পাড়ার ,কী ইস্কুলের, যিনি সারা জীবনটাই কাটিয়ে দিলেন সাহিতচর্চা, পড়াশোনা বা লেখালেখির মধ্যে দিয়ে, সেই লোকটাই মারা যাবার পর হয়ে গেলেন স্রেফ একটা মাতাল! যেন রাত সাড়ে দশটার পর মানুষটাই সব! তাঁর আগে পরে কেউ নেই, তাঁর আর কোনো পরিচয় মানুষ মনে রাখল না, রাখতে চাইল না! হায় রে দুনিয়া!
অথচ চাঁদু দা’কে দীপন সাহিত্যের একজন যথেষ্ট সমঝদার মানুষ হিসেবেই জানে। অনেক কবিতা চাঁদু দা’র মুখেই প্রথম শুনেছে দীপন, অনেক গল্প উপন্যাসের নাম চাঁদু দা’র মুখে শুনেই দীপন সেগুলো পড়েছে। একটা ভাল কিছু পড়লেই চাঁদু দা’ ফোন করবেই দীপনকে, সে যত রাত্তিরই হোক না কেন! তারপর ফোন ছাড়ার নাম নেই! কত কথা যে চাঁদু দা’ বলে যেত! মা খেতে ডেকে ডেকে বিরক্ত হয়ে যেত! ফোন হাতে টেবিলে গিয়ে বসত দীপন! তারপর আঁচানো হয়ে শোবার ঘরে চলে গেলেও চাঁদু দা’র কথা শেষ হত না! একটা কবিতার সূত্র ধরে চাঁদু দা’ নিজের কথায় চলে আসত, সেখান থেকে আরেকটা কথায়! অন্তহীন কথা স্রোতের মতো ভেসে আসত! ফোন গরম হয়ে উঠত! একসময় দীপন বাধ্য হত বলতে, চার্জ শেষ হয়ে আসছে চাঁদু দা! কাল আবার কথা বলি? তারপরেও কিছুক্ষণ কাটত ফোনালাপে! দীপন বুঝত, চাঁদু দাকে দিয়ে এত কথা বলিয়ে নিল কোন তরল আগুন!
স্যারেরা বেরিয়ে এলেন চাঁদু দা’র ঘরের ভেতর থেকে। দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেছে! স্যারেদের মুখ গম্ভী্র, ভুরু কোঁচকানো! ওঁদের কথা শুনতে লোকের ভিড় হয়ে গেছে। দীপনও এগিয়ে গেল। স্যারেরা জানালেন, চাঁদু দা’র মরদেহের দায়িত্ব পরিবার নেবে না। দাহকার্যসহ অন্য কোনো কাজও ওঁরা করবেন না! এমন কথাও নাকি বলা হয়েছে, ইচ্ছে করলে আপনারা ওঁর বডি যেখানে ইচ্ছে ফেলে দিতে পারেন! আমাদের কিছু বলার নেই! আর শুনতে পারে না দীপন। ও সত্যিই কিছু ভেবে উঠতে পারছে না! অন্ধকার আরও ঘন হয়ে এসেছে। দীপন ওখান থেকে সরে আসে! স্যারেদের মুখে এইকথা শোনার পর উপস্থিত সকলের মধ্যে একটা তৎপরতা শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে ‘স্বর্গরথে’র হুটার আবার বেজে ওঠে। গাড়ি এবার শ্মশানের দিকের রাস্তা ধরে। অন্য লোকেদের সঙ্গে দীপনও সে পথে এগিয়ে যায়!
দীপনের মাথা সত্যি কাজ করে না! এতটা ঘৃণা পুষে রেখেছে চাঁদু দা’র বাড়ির লোক, দীপন সত্যিই আঁচ পায়নি! বৌদির সঙ্গে চাঁদু দা’র সম্পর্ক যে বেশ কিছুদিন ধরে ঠাণ্ডা চলছে, একথা চাঁদু দা নিজেই ওকে বলেছে বেশ কয়েকবার, কিন্তু স্বাভাবিক সৌজন্য আর সঙ্কোচে দীপন কখনও নিজে থেকে কোনো বাড়তি কৌতূহল প্রকাশ করেনি। চাঁদু দা যেটুকু বলেছে, শুনে গেছে! ভেতরে ভেতরে যে এতটা ঘৃণা এরা পুষে রেখেছে, তা দীপন কখনো টের পায়নি। অবশ্য দীপন চাঁদু দা’র বাসাতেও এসেছে কম। হয়ত বার দুয়েক। তখনও বৌদির সঙ্গে খুব কথাবার্তা হয়েছে, এমন নয়। আর চাঁদু দা’র ছেলেকে দীপন একবার দেখেছে, মেয়েকে একবারও না! ওরাও যে মায়ের মতো বাবাকে এতটা সরিয়ে রেখেছে, তা দীপন টের পায়নি কখনো, পাওয়ার কথাও না!
রথ শ্মশানে এসে পৌঁছালো। চাঁদু দা’র নিথর শরীর নামানো হল। মুখটুকু ছাড়া পুরো শরীর সাদা কাপড়ে ঢাকা। প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার অভিঘাতের চিহ্ন মুখ থেকে মুছে গেছে অনেকটাই এই কয়েক ঘণ্টায়। বদলে যেন ফুটে উঠেছে এক অন্তর্লীন যন্ত্রণাকে আত্মস্থ করে নেবার প্রশান্তি! সত্যিই কি তাই! নাকি দীপনের মনের মধ্যে ভিড় করে আসা নানা কথা, নানা স্মৃতি, অনুমান, আশঙ্কা ওকে দিয়ে এইসব ভাবিয়ে নিচ্ছে! “ এই ঘুম চেয়েছিলে বুঝি!/ রক্তফেনামাখা মুখে মড়কের ইঁদুরের মতো ঘাড় গুঁজি/ আঁধার ঘুঁজির বুকে ঘুমায় এবার; / কোনোদিন জাগিবে না আর”।
কে যেন দীপনকে বলে গেল, দীপু, তুই বডির কাছে থাক। এখন দেরি হবে অনেকটা। আমরাএকটু চা টা খেয়ে আসি। তোর চা টা নিয়ে আসব।
এইটাই চাইছিল দীপন! বডির সঙ্গে থাকা নয়, চাঁদু দা’র সঙ্গে থাকা। একা! শেষবারের মতো চাঁদু দা’র সঙ্গে মোলাকাত করে নেওয়া। কী চাঁদু দা? চলবে তো! আমি দীপন। দীপন সান্যাল। তুমি বলতে না, ‘সান্যালকূল ঘোর প্যাঁচ.. ’, আমি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর করতাম, আর বাড়ুয্যে?
‘স্বয়ং শিবের বংশধর!’
তোমার সেই ‘ঘোরপ্যাঁচ’কূলের পো দীপন আমি! চিনতে পারছেন তো সিএনবি স্যার?
বক্তৃতা বন্ধ কর। কী বলতে চাস বল!
কী আবার! এই রকমটা ঘটালে কী করে বলো তো?
আমি কি জানি! ওই অটোওয়ালাকে জিজ্ঞেস কর। ধরেছে ওকে নিশ্চয়ই! আমি তো রাস্তার বাম পাশ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে একমনে যাচ্ছিলাম। যা কিছু হাতযশ ওর! চাঁদু দা রসিকতা করছে!
বামপাশ দিয়ে চলতে হলে অন্যমনস্ক হলে চলে না, তাহলে ইতিহাসের কাছে তার মূল্য চোকাতে হয়, তুমিই আমাদের শিখিয়েছিলে চাঁদু দা !
সাবাস! এইভাবে গুরুদক্ষিণা দিচ্ছ দীপন সান্যাল! যাক! তবু ভালো! ইতিহাস মনে রাখবে, চাঁদু বাড়ুয্যে অন্তত একজন ছাত্রকে রেখে যেতে পারল, যে তার কথা, তার বলা কথা মনে রেখেছে!
ওসব কথা বাদ দাও। তুমি এত অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছ কেন চাঁদু দা! কথাটা বলেই দীপনের মনে হল, ‘পড়ছ’ না বলে, ‘পড়ছিলে’ বলাই তো সঙ্গত হত হয়ত!
তুই কী ভাবছিস, আমি জানি, দীপু। আমাকে অতীত কালে ফেলে দিতে তোর মন চাইছে না, তাই তো! কিন্তু আমি অনেক দিনই অতীত হয়ে গেছি দীপু! আমরা বিশ্বাস করতাম না, কিন্তু পুনর্জন্ম বলে একটা কথা চালু আছে তো! আমি এখন বিশ্বাস করি, পুনর্জন্ম না হোক, পুনর্মৃত্যু হয় মানুষের। যেমন আমার হয়েছে। আমি অনেক আগেই মরে গেছি দীপু, অনেকবার! সেই কলেজ ছাড়ার দিনগুলো থেকেই! আজ একটা অটোওয়ালাকে দোষ দিয়ে কী হবে!
একথা কেন বলছ! তুমি তো নিজেই বলতে, দীপন এবার অনায়াসে অতীতকাল ব্যবহার করে, কলেজ জীবনেই তুমি কবিতার প্রেমে পড়েছিলে , বিশেষত জীবনানন্দের কবিতার!
বলেছি তো! তবে প্রথম প্রেম তো বলিনি! কবিতা আমার, বলতে পারিস, দ্বিতীয় প্রেম!
আর বৌদি? তৃতীয়? দীপনের এই সময়েও একটু ফিচলেমি করতে সাধ হয়! চাঁদু দা কিন্তু একথার জবাব দেয় না! যেন একটা জোরে নিঃশ্বাস ফেলে! মরা মানুষের নিঃশ্বাস!
এই চুপ করে যাওয়ার মধ্যে কি অনেক কথা বলে দেওয়া হয়ে গেল? বেশ কিছুদিন আগে একদিন ব্যাঙ্কের মধ্যে বৌদির সঙ্গে দেখা হয়েছিল দীপনের। দীপন প্রথমটায় চিনতে পারেনি। বৌদিই কথা বললেন, তুমি তোমাদের স্যারের ছাত্র না? দীপন এবার চিনতে পেরে বলে, ও বৌদি! আপনাকে প্রথমে চিনতে পারিনি। ভালো আছেন? উত্তরের বদলে বৌদি একটা অদ্ভুত হাসি হেসেছিলেন, দীপনের মনে আছে। খানিকটা থেমে বললেন, তুমি একটা স্পেশাল কাজুবাদাম এনে দিয়েছিলে ওঁকে, ওটা তোমার স্যারের খুব পছন্দ! আরেকটা এনে দেবে? আমি টাকা দিচ্ছি!
খুবই অবাক হয়েছিল দীপন! চাঁদু দা সবসময় বলে, ওর এই পানাভ্যাসটা বৌদি কিছুতেই মানতে পারেন না! অথচ সেই বৌদিই ওকে হঠাৎ দেখে, চিনতে পেরে অনুপানের ব্যবস্থা করতে টাকা দিতে চাইছে! সেদিন ব্যাঙ্কের ভেতরে বৌদির সঙ্গে অনেক কথাই হয়েছিল। বৌদি যা বলেছিলেন, তার মধ্যে না বলা কথাই ছিল বেশি। কখনো সেই অদ্ভুত হাসি হেসে তার ভেতরে অনেক কথা চালান করে দিতে চাইছেন, দীপনের মনে হচ্ছিল। বৌদির একটা কথা দীপনের খুব মনে আছে। কথাটা বলার সময় দীপনের চোখের দিকে সোজা তাকিয়েছিল বৌদি। তারপর, খুব আস্তে আস্তে কেটে কেটে বৌদি জানতে চেয়েছিল, তোমার বন্ধুকে কখনো খালি গায়ে দেখেছ, দীপন? দেখোনি, না? তারপরেই চোখ নামিয়ে বলেছিল, তোমরা মানুষটাকে একভাবেই দেখে গেছ চিরকাল। বৌদি কথাটা ওখানেই থামিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর খুব ধীর পায়ে ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে গেলেন। দীপন শুধু খেয়াল করেছিল, এই শেষবার বৌদি, স্যার না বলে বন্ধু কথাটা বললেন!
কি রে, চুপ করে গেলি যে?
না, মানে চাঁদু দা, সত্যি কথা বলব, আজ আমি তোমার কাছে অনেকগুলো কথার উত্তর চাই।
কেন এত এত মদ গিলেছি, এই তো?
একেবারেই না!
তা হলে? বৌদির সঙ্গে আমার রিলেশন…
ঠিক তাও না! দীপন এবার খানিকটা মরিয়া ভাবে বলে, কলেজ জীবনের একটা কোনো যন্ত্রণা, যা তুমি সকলের কাছে লুকিয়ে...দীপনকে কথা শেষ করতে না দিয়ে চাঁদু দা বলে ওঠে, সোহিনী আমার কাছে শুধু যন্ত্রণা নয়, দীপন, একটা লালিত যন্ত্রণা বলতে পারিস।
কাব্যি করা এখন ছাড়ো, চাঁদু দা! দীপনের গলায় এখন অভিভাবকের সুর। তোমার এই প্রথম প্রেমিকার কথা তুমি হাটের মাঝে না-ই বলতে পারো, সে অধিকার তোমার আছে। তাকে নিয়ে কবিতার খাতা ভরিয়ে ফেলার মধ্যেও নতুনত্ব কিচ্ছু নেই, এ আর আমি তোমাকে কী বোঝাবো! কিন্তু তোমার সোহিনীকে মদের বোতলের মধ্যে খোঁজা, আর পাড়ার লোকেদের গসিপের মধ্যে, বাজারের আলোচনার মধ্যে ফেলে রাখা, এ শুধু নিজের প্রতি অত্যাচার নয়, সেই ভদ্রমহিলার প্রতিও টর্চার! এসব কথা নিয়ে এখন বাচ্চা ছেলেরাও রঙ চড়িয়ে আলোচনা করে। আর তুমি চিরটাকাল ভেবে এলে, তুমি তোমার সোহিনীকে তুমি খুব আড়াল করে, সিন্দুকে তুলে রেখেছ! এই প্রথম এতগুলো কথা এক নাগাড়ে বলে ফেলতে পেরে দীপন বেশ হাল্কা বোধ করে।
থামলি কেন, বলে যা। আমার কী করা উচিত ছিল না, সে তো শুনলাম। কী উচিত ছিল, এবারে শুনি। চাঁদু দার স্বরে যেন হাল্কা হাসির আভাস।
উচিত ? এক, সেই মহিলাকে বিয়ে করা।
মহিলা নয়, ভদ্রমহিলা বল। দুই?
সরি। দুইয়ের কথা ছাড়ো। প্রথমে একের ফয়সালা করো।
কী ফয়সালা?
বিয়ে করলে না কেন, সোহিনী দেবীকে? দীপন এবার ভদ্রতা রক্ষা করেই কথা বলে।
চাঁদু দা চুপ করে থাকে। তারপর আওড়ায় –
“কী নাম ছিল? সঠিক এখন মনে তো নেই;
আয়ুর শেষে স্মৃতি খানিক খর্ব হবেই।
গোলাপী? না তরঙ্গিনী? কুসুমবালা?
যাক গে, খোঁপায় বাঁধা ছিল বকুল মালা;
ছিল বুঝি দুচোখে তার কাজলটানা;
চোদ্দ সিকেয় ছুঁয়ে ছিলাম পরীর ডানা।
এখন আমি ডানার গন্ধে কৌটো ভরি;
কৃষ্ণ-কৃষ্ণ হরি-হরি”।
এই কবিতাটা পুরোটাই আমি জানি, চাঁদু দা। তোমার কাছেই শোনা। কথাটা বলেই দীপন শুরু করে ----
“ভালোবেসেছিলাম এক স্বৈরিণীকে
খরচ ক’রে চোদ্দ সিকে।
স্বৈরিণীও ভালোবাসা দিতে পারে
হিসেবমতো উষ্ণ নিপুণ অন্ধকারে। …”
থেমে যায় দীপন। শুধোয়, তুমি এখন সব হিসেবের বাইরে চলে গেছ বলেই তাঁকে স্বৈরিণী বলে দিতে পারছ, চাঁদু দা?
কথাটাতে তুই কী বুঝিস, আমি জানি না, দীপন। আজ আর আমার মাস্টারি করতে ইচ্ছেও নেই। তবে একটা শব্দ অভিধানে একরকম ভাবে থাকে, আর বুকের ভেতরে এসে আরেকরকম, আর এক কেন, আরো অনেকরকম হয়ে বেঁচে থাকে। সে সব কথা থাক। ওই ডানার গন্ধ আমি বুকের কৌটোতে ভরে রেখেছি এখনো। দেখিস,ওটা পুড়বে না আজ!
আবার কাব্যকথা শুরু করলে, চাঁদু দা।
না রে, দীপন। এটা আমার সত্যিকারের কথা। সোহিনী সেকথা বুঝেছিল কি না, জানি না!
তুমিই কিন্তু আমাদের, মানে অন্তত আমাকে বলেছ, ভালোবাসার মানুষের প্রত্যাখ্যানকেও ভালোবাসতে হয়!
বেসেছি তো! চাঁদু দা আবার ছেড়ে আসা কবিতার পংক্তি শুরু করে,
“অন্ধ কিছু দেখে না তার কণ্ঠ পারে
ফুল ফোটাতে অন্ধকারে।
অন্ধকারে যে গান বানাই একলা হাতে
সুদূর সরল একতারাতে,
সে গান ভাষা পেল স্বচ্ছ ভাষা?
মূলে আমার চোদ্দ সিকের ভালোবাসা।
জলের তলায় মস্ত একটা আকাশ ধরি
কৃষ্ণ-কৃষ্ণ হরি-হরি”।।
কথাগুলো তুলে তুই আমায় বাঁচিয়ে দিলি, দীপন। আজ সম্পূর্ণ পুড়ে যাবার আগে তোকে বলে যাই, সোহিনী সরে যাওয়াতে আমি হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসিনি দীপন। কেন না, তখন ওই ‘জলের তলায় মস্ত একটা আকাশে’র সন্ধান তো আমি পেয়েই গেছি। সেই নিয়েই দিব্যি ছিলাম। আমার সমস্ত কবিতা পড়াই বল, বা একটু আধটু লেখা, সেখানে শুধু সোহিনী ছিল। শুধু সোহিনী। “ তুমি তো জান না কিছু, না জানিলে -- / আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য ক’রে!” সে কথা তোর বৌদিও জানত হয়ত। হয়ত কেন, জানতই! হতে পারে, সোহিনী নামটা জানত না। আমিও কি সোহিনীকে নাম দিয়ে মনে রেখেছিলাম। ওকে তো আমি বলতাম, সই!
সেজন্যই তুমি কোনো বই প্রেজেন্ট করে নিজের নাম সই করে নিচে লিখে দিতে, সইটুকু যেন মুছে না যায়! দীপনের একথার উত্তর না দিয়ে চাঁদু দা বলে, তোর বৌদি কোনোদিন এইসব নিয়ে সে একটা কথাও বলেনি। এরপর চুপ করে যায় চাঁদু দা। দীপনও কিছু বলে না। চাঁদু দার পরের কথার জন্য অপেক্ষা করে।
খানিকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর চাঁদু দা আবার শুরু করে, আমি তো সবই খোঁজ পেয়েছিলাম, সোহিনী এখন কোথায় থাকে, কোন কলেজে পড়ায়, কার সঙ্গে সংসার করছে, সব। তুই বিশ্বাস কর দীপন, তবু কোনোদিন আমি ওর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করিনি! ভয় পেয়েছি, যদি আমার আকাশটা ভেঙে পড়ে! এরই মধ্যে…
এরই মধ্যে কী? দীপন কৌতূহল দেখিয়ে ফেলে!
সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে খুঁজে পেলাম আজকের সোহিনীকে। এক কাঙালপনা জেগে উঠল আমার মধ্যে! আমি স্বীকার করছি দীপন, আমি হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়লাম। আমি সোহিনীর ফোন নম্বর চেয়ে বসলাম ওর কাছে।
সে তো তুমি ইচ্ছে করলে অনেক আগেই পেতে পারতে!
পারতাম তো! কিন্তু ইচ্ছে করেনি। কিংবা ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রাখতে পেরেছিলাম। কিন্তু কেন জানি না, এবার পারলাম না। না আমি সোহিনীকে একটি বারের জন্যও দেখতে চাইনি! এমনকি ফোন নম্বর পাওয়ার পরেও একবারের জন্য ফোনও করিনি! ভয় পেয়েছি, যা শুনতে চাই, তা যদি না শুনতে পাই! যার কথা শুনব বলে বসে থাকলাম এতগুলো দিন, তাকেও যদি না পাই, ফোনের স্বরে! তুই বিশ্বাস কর, দীপন! আমি শুধু চেয়েছিলাম, যে কবিতাগুলো ওকে লিখেছি, ওর জন্য লিখেছি, সেগুলো ওর হাতে পৌঁছোক!
তাও অনেক সহজে পাঠানো যেত চাঁদু দা!
জানি। জানি। তবু ঠিক ঐ সময়েই কেন আমি ওরকম ভিখারি হয়ে পড়েছিলাম, আমি তোকে বোঝাবো কী করে, নিজেই তো জানি না!
তারপর?
তারপরেই তো শুরু হল, চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপধ্যায়ের এখানে এসে পৌঁছোনোর আসল গল্প। সিনেমার মতো থ্রিলিং!
এখানে মানে?
এখানে মানে, এই শ্মশানে। ঐ অগ্নিকূণ্ডের সামনে। যেখানে মিথ্যে কথা বলা যায় না। প্রবঞ্চতা করা যায় না!
দীপনের মনে হয়, চাঁদু দা যেন একট দম নিয়ে নেয়। বা, ভেবে নেয় পরের কথাগুলো। দীপনের মধ্যেও এখন থ্রিলার শোনার আগ্রহ! ও চুপ করে অপেক্ষা করে। চাঁদু দা আবার শুরু করে, প্রত্যেকটা হোয়াটস্যাপ মেসেজ সিন দেখাত, কিন্তু কোনোদিন কোনো উত্তর আসত না! আমি ওই দুটো নীল দাগ দেখার জন্য চাতকের অপেক্ষায় থাকতাম!
সোজা কথায়, জমিয়ে পরকীয়া করতে!
পরকীয়া? শব্দটা যদি কিছু ধরতে পারে, তা হলে তাই! আসল কথা কী জানিস দীপন, মাস্টার, স্বামী, বাবা, এমনকি প্রেমিক চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপধ্যায়ের বাইরেও আরো কেউ থাকে , অন্তত ছিল!
আর তুমি তাই অতগুলো সত্তাকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে এতগুলো বছর পরে মদের বোতলে ওই আরেকটা চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের খোঁজ পেতে চাইলে! দীপন কথাগুলো মাস্টারিরি ঢঙেই বলে চলে, এটুকু বুঝলে না, ওই অতগুলো পরিচয়কে ইচ্ছে করলেই ছুঁড়ে ফেলা যায় না!
ছুঁড়ে ফেলতে তো চাইনি দীপন! ওই যে বললাম, চিতার আগুনের সামনে মিথ্যে বলা যায় না! আমি শুধু একটা নিজের, একান্ত আমারই ছোট্ট পৃথিবীকে সঙ্গে রাখতে চেয়েছিলাম!
দীপন চুপ করে যায়। চাঁদু দা’ই আবার শুরু করে, সেদিন আমার মেয়ের বিয়ে ছিল। বাড়ি ভর্তি লোকজন। হইহল্লা চলছে খুব। আমি সকাল থেকে নতুন ধুতি, গেঞ্জি পরে তৈরী হয়ে আছি পুজোয় বসব বলে। আমার মন জুড়ে শুধু এই কথাই ঘুরছে, আমার আদরের মুন্নিটা পরের বাড়ি চলে যাবে রাত পোহালেই। বিসমিল্লার সানাইয়ের সুরে আমার চেপে রাখা কান্না ফুটে বেরোচ্ছে। এমন সময় একতাড়া কাগজের একটা প্যাকেট, যার মুখটা ছেঁড়া, তোর বৌদি আমার হাতে দিয়ে গেল!
সোহিনীকে পাঠানো আমার কবিতাগুলো! সোহিনী ফেরৎ পাঠিয়েছে। ডাকে নয়, কেউ হাতে করে এসে দিয়ে গেছে। ছেঁড়া প্যাকেটের ওপরে লেখা ‘তোমার সুখের দিনে আমার উপহার!’
এটা প্রত্যাখান নয়, দীপন। এটা প্রতিশোধ! নির্মম প্রতিশোধ! একটা প্যাকেট-বোমা ছুঁড়ে দেবার উদ্দেশ্য হয়ত ছিল, আমার ‘সাজানো’ সংসার তছনছ করে দেওয়া, কিন্তু আসলে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল সেই বিশ্বাসের পৃথিবীটা! সানাইএর সুর ছাপিয়ে তখন আমার কানে আসছিল, আমার বউ, ছেলে মেয়ে আত্মীয়স্বজনের অনুচ্চারিত ‘ছিঃ’ শব্দটা! এরপর আমি মদের বোতল ছাড়া কোথায় লুকোবো বল! আজ ওরা আমার দেহ কেউ নিতে চায়নি, এ আমি আমার ওপর ওদের দয়া বলে মানি, তুই বিশ্বাস কর, দীপন! আমি তোর বন্ধু! আমি তোকে শ্মশানদুয়ারে শেষ সত্যি কথাটা বলে গেলাম!
অর্ক এসে দীপনকে হাত ধরে টেনে তোলে। বলে, সব মিটে গেছে, দীপন। ওঠ। বাড়ি চল। ওরা অস্থি নেওয়ার কথা বলছিল। কী হবে নিয়ে?
দীপন অর্কর ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে বলল, কোনো কৌটো পাওয়া গেছে রে? কৌটো?