সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
জুবিন গর্গের ওপর বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয় মানুষটির দেহাবসানের পর। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ জুবিন গর্গের নিস্পন্দ দেহবাক্সটি সিঙ্গাপুর থেকে গুয়াহাটির মাটি ছুঁতেই নিরাপত্তার বেড়া তোয়াক্কা না করে প্রায় ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে মানুষ। সববয়সের সর্বস্তরের কান্নাকাতর মানুষ। এমনকি কর্তব্যরত পুলিশও। কনস্টেবল থেকে অফিসার। এবং অবিরাম কেঁদে যাওয়া স্ত্রী গরিমা।
মুখ্যমন্ত্রী, পদস্থ অফিসার, সরকারি মর্যাদায় শববাহী গাড়িতে জুবিনের দেহবাক্স তোলায় শশব্যস্ত। ফুলে ঢাকা শববাহী গাড়িটি। গাড়ি যত এগোয়, ক্রমবর্ধমান মানুষের ঢল, রাস্তায় প্রায় ১৫ লক্ষাধিক মানুষ গণবিষণ্ণতায় কাতর সজল চোখ, রাশ রাশ প্রশ্ন ঠাসামুখ, চলেছেন দাহস্থল সোনাপুরাত। এই দাহ-ক্ষেত্র এখন জুবিন ক্ষেত্র নামে পরিচিতি পাচ্ছে, প্রতিদিন জাতি ধর্ম নির্বিশেষে হাজারো মানুষ তাঁদের প্রাণের মানুষকে শ্রদ্ধা জানাতে বাতি প্রদীপ ধূপ জালাচ্ছেন, চড়াচ্ছেন উত্তরীয় ও গামছা ।
এমন সব শ’য়ে শ’য়ে অবাক-করা চিত্র দেখতে দেখতে বিস্ময়ে আবিষ্ট হতে থাকি, ক্রমেই বাড়তে থাকে সদ্য পরিচিতের ঘনিষ্ঠ হওয়ার বাসনা। 'ইউটিউবের' সুবাদে আসাম সহ জাতীয় সংবাদ মাধ্যম, বাংলা হিন্দি সমাজ মাধ্যম অকৃপণ সাহায্য করে চলেছে জুবিন গর্গের নানান কাজের হদিশ দিতে।
দেখছি শুনছি জানছি মানুষটিকে। বুঝতে চাইছি কেন একজন মানুষকে ঘিরে এমন এক আবেগ! এ তো মিডিয়া তাড়িত গণহিস্টিরিয়া নয়, শাসক-শোষক নির্মিত কোনো চরিত্র নয়, বরং জুবিন গর্গ ভোট সর্বস্ব, সব দলেরই নাম করে নেতা মন্ত্রীদের ভ্রষ্টাচারের কথা বলেন, একরাশ ঘৃণায় উচ্চারণে আনেন ‘পলিটিক্স ছ্ছু’। অনুষ্ঠান মঞ্চে গেয়ে ওঠেন, ‘পলিটিক্স না করিবা বন্ধু’। মঞ্চে তো বটেই, সাক্ষাৎকারেও দুই হাত আকাশে মেলে মানুষটি অকপট, সহজ উচ্চারণে ধ্বনিত করেন ‘আমার কোনো ধর্ম নাই, আমার কোনো ভেদাভেদ নাই, আমার কোনো জাতি নাই, আমি মুক্ত, আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা।
অপরিচিত এক উচ্চারণ! আমি মুক্ত, আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা। প্রকৃতির সঙ্গে কেমনভাবে যেন নিজেকে যুক্ত করে নিচ্ছেন নম্রতায় নয়, স্পর্ধায়। তাৎক্ষণিক নয়, এমনতরো স্পর্ধার প্রকাশ অন্যত্রও। বলতেন, ‘আসামের পরিচয়, চা নদী পাহাড় প্রাকৃতিক গ্যাস তেল কয়লা বনজ সম্পদ রায়নো আর জুবিন’।
বস্তুত সারা আসাম জুড়েই তিনি। সাংস্কৃতিক জগতে তো বটেই। নাটকে, বাদ্যযন্ত্রে, সুরে, গানের কথা ও সুর রচনায়, কবিতা লেখায়, পশুপালনে, আঁকতে বা রান্নাতে - সর্বত্রই জুবিন। সিনেমায় অভিনয়ে, প্রযোজনায়, পরিচালনায়, সঙ্গীত পরিচালনায়, এমনকি কাহিনী বা চিত্রনাট্যরচনায়ও জুবিন।
প্রযোজনা, অভিনয়, সঙ্গীত পরিচালনা, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায়, শেষ ছবি ‘রই রই বিনালে’ আসামের প্রায় সব ছোটো বড় সিনেমা হলে জুবিন-নির্ধারিত ৩১ অক্টোবরই (২০২৫) মুক্তি পায়, ভোর ৪ টেয় প্রথম শো, শেষ শো রাত ২ টোয়, সমস্ত হল হাউসফুল এবং আগামী ৩ মাস অন্তত এমনই চলবে বলে জানা যায়। এই ছবি চলাকালীন দর্শক শ্রোতাদের আকুল কান্না সচিত্র দেখা যায়, পরের শো তে ঢোকার লাইনেও সজল চোখের দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। রাজেশ ভুঁইয়ার সঙ্গে জুবিনের যৌথ পরিচালনায় নির্মিত এই ছবি।
আসাম তথা উত্তরপূর্বাঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষের আপনলোক জুবিন। জুবিন গায়ক নয় মহাগায়ক,নায়ক নয় মহানায়ক। নির্ভীক বেপরোয়া জাত-ধর্ম নির্বিশেষে সবারই ভালোবাসা, আদর আর শ্রদ্ধার জুবিন।
আসাম জুবিনের পিতৃমাতৃভূমি। জন্মেছেন মেঘালয়ের তুরা (টুরা) অঞ্চলে ১৮ নভেম্বর ১৯৭২। মা ইলি বোরঠাকুর, গায়িকা, নৃত্যশিল্পী, মায়ের কাছেই গানের অ আ ক খ তালিম, বাবা মোহিনীমোহন বোরঠাকুর পেশায় ম্যাজিষ্ট্রেট, গীতিকার ও কবি (কবিতা লেখেন কপিল ঠাকুর নামে), সঙ্গীত, সাহিত্যের অনুরাগী পরিবারের ছেলে জীবন বোরঠাকুরের ডাকনাম গোল্ডি। জীবন নামটি পরিবর্তন করে পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় বাদ্যযন্ত্রের ভারতীয় পরিচালক জুবিন মেহেতার নাম অনুকরণে নাম হল জুবিন গর্গ বা গার্গ, তাঁদের পারিবারিক গোত্র পরিচয়। অন্যদিকে আবার ‘জুবিন’ হচ্ছে একটি পার্শি শব্দ, অর্থ, 'সেরাদের সেরা'। ছোট থেকেই নামের যথার্থতা প্রকাশ পেতে থাকে।
বাবা মোহিনী মোহন বোরঠাকুরকে পেশার কারণে বারংবার স্থান পরিবর্তন করতে হ’ত বলে, প্রাথমিক শিক্ষাকাল থেকে মহাবিদ্যালয় পর্যন্ত জুবিনের শিক্ষার মাধ্যম কখনো অসমিয়া কখনো বাংলা কখনো ইংরাজি। স্নাতক স্তরে বিজ্ঞান পাঠক্রমে ভর্তি হলেও মহাবিদ্যালয়ের লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে দিয়েছিলেন প্রথম বর্ষেই। নিজের পরিচয় দিতেন ‘ড্রপ আউট’। বাঙালিদের সঙ্গে মেলামেশা লেখাপড়া, খেলা বা আড্ডার কারণে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জুবিন বুকের দুপাশে হাত দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলতেন, আমার অর্ধেকটা বাঙালি আর বাকি অর্ধেক, অসমিয়া।
গুরু রবীন ব্যানার্জির তত্ত্বাবধানে তবলায় হাতেখড়ি। টানা বারো বছর ধরে শিক্ষা চলে। বড় বোন জন্টি বোরঠাকুর সুগায়িকা, অভিনেত্রী ও জুবিন গর্গের সহগায়িকাও। একটি গানের অনুষ্ঠান সেরে ফেরার পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় ফেব্রুয়ারি ২০২২ সালে তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। একই গাড়িতে নাকি জুবিনেরও থাকার কথা ছিল। শোনা যায় সেই সময় থেকেই নাকি জুবিনের মদ্যপানের শুরু, যা পরবর্তী সময়ে রীতিমতো বেড়ে গিয়েছিল। দুর্ঘটনার পরে পরে বোনের স্মরণে ‘শিশু’ নামে একটি গানের এ্যালবাম প্রকাশ করেন জুবিন।
শিশুকাল থেকে রেডিওতে দেশ-বিদেশের গান আর ইংরেজি গানের ক্যাসেটে শুনে পাশ্চাত্যের অনেক গান, গানের ঢ়ং রপ্ত করেছিলেন। আসামের সঙ্গীত জগতের বিখ্যাত গুণীজনদের গান, লোকগান - প্রতিমা বড়ুয়া, ভূপেন হাজারিকা, খগেন বড়ুয়া প্রমুখ - শোনার ও রেওয়াজ করার সঙ্গে সঙ্গে যাঁদের গান শুনতে পছন্দ করতেন সে তালিকাটা যথেষ্ট লম্বা - ফতে আলি খান, শচীন দেব বর্মন, রাহুল দেব বর্মন, কিশোর কুমার ও আরো অনেক। প্রতিমা বড়ুয়ার সুরে শ্যামল মিত্রের গাওয়া একটি গান ‘সোনার বরণ পাখি রে তোর এমন বোরো আঁখি...’ জুবিনের অন্যতম একটি পছন্দের গান, গেয়েছিলেনও বহু অনুষ্ঠানে। ইংরেজি গানের ক্ষেত্রেও তাই, স্টিং ,পিঙ্ক্ ফ্লয়েড, পল্ রোবসন, পিট সিগার, বব ডিলানের নাম ভূপেন হাজারিকার নামের সঙ্গে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করতেন। জুবিন তাঁর বন্ধু দিল্লিবাসি কেরলের কৃষ্ণকুমার কুন্নাতকে (যিনি কে কে নামেই পরিচিত) এসময়ের শ্রেষ্ঠ গায়কের আসনে বসিয়েছেন, একসঙ্গে অনুষ্ঠান করেছেন বেশ কয়েকবার।
প্রায় ৩৮ হাজার গান রেকর্ড করেছেন জুবিন। অসমিয়া, বাংলা, হিন্দি, মনিপুরি, আদি, বোরো, দিমাসা, ইংরাজি, গোলপারিয়া, গুজরাটি, কন্নড়, কার্ভি, মালায়ালাম, মারাঠি, হিন্দি, তামিল, তেলেগু, তিওয়া, উর্দু, মাইসিং, নেপালি, ভোজপুরি, ওড়িশা, সান্দ্রি, সংস্কৃত ইত্যাদি ৪০টি ভাষায় গান গেয়েছেন।
জলহীন মাছ আর আসাম ছাড়া জুবিন প্রায় এক। দক্ষতার খোঁজে, দক্ষতা প্রমাণে দীর্ঘ কয়েক বছর মুম্বাই বাস করেছেন, কিন্তু কখনই একটানা নয়, কয়েক মাসের ব্যবধানেই আসামে ফিরে ফিরে আসতেন, তাঁর স্বদেশের মানুষজনের কাছে, স্বভূঁই সংস্কৃতির কাছে, প্রকৃতির কাছে। মুম্বাই বাস জুবিনের ভারত ব্যাপি খ্যাতি এনে দিয়েছে হিন্দি ‘গ্যাংস্টার’ ছবিতে গাওয়া ‘ইয়া আলি’ গানের জন্য। এই গানটি দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে জুবিন বিখ্যাত হয়ে ওঠেন ও ফিল্ম ফেয়ার এ্যাওয়ার্ডও পান। বলিউড ফিল্মের নামী নায়কদের ছবিতে গান গাওয়া বাড়তে লাগল কিন্তু কিন্তু মন সায় না দেওয়ায় পাকাপাকিভাবে মুম্বাই থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে নিজের রাজ্যে, রাজপাট সামলানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বিশেষ করে আসাম চলচ্চিত্র জগতকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেন, খোলনলচে বদলে গেল আসাম চলচ্চিত্রশিল্পের। তাঁর ইচ্ছা ছিল চলচ্চিত্র শিল্পে আরও সময় দেওয়ার, ১১ টি বন্ধ সিনেমা হল পুনরায় চালু করলেন। ঠিক করেই ফেলেছিলেন গানের অনুষ্ঠান কমিয়ে চলচ্চিত্রশিল্পে আরো বেশি সময় দেবেন।
জুবিন গর্গ যে সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক নিয়ে কাজ করতেন তার কারণ সামাজিক সেবামূলক কাজ ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে গেলে রোজগার বাড়াতেই হবে, ওই একই কারণে চলচ্চিত্র শিল্পে আরও সময় দেওয়ার কথা বলতেন।
জুবিন গর্গ যুবক যুবতীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও অতি প্রিয় আপনজন, জুবিন গর্গের অনুষ্ঠান মানেই ডালি ডালি খুশি, আনন্দধারা রাশি রাশি। মঞ্চে উঠেই নানান আচরণে, গল্পে কথায় দর্শক শ্রোতার মনের আত্মীয় হয়ে যেতেন, ফ্লায়িং কিসের সঙ্গেই কখনো সমাজের প্রচলিত ব্যাবস্থার বিরূদ্ধে প্রতিবাদী কথা, আবার কখনো কিছু উপদেশ - মদ সিগারেট খেও না, সবসময় ভাল কাজ করো, মানুষের জন্য কাজ করো,গাছ লাগাও।
গান পরিবেশনের সময় জুবিনের প্রিয় শিল্পী মাইকেল জ্যাকসনের মতো রঙচঙে পোশাক, নাচে গানে কথায় গভীর প্রেম পরশে মাতিয়ে রাখতেন দর্শক শ্রোতাদের। অনুষ্ঠান মঞ্চে একজনের সঙ্গে ক্যারাটে ভঙ্গি করছেন অবিকল কায়দায়, সঙ্গে নানান ছোটো বড় কাজের কথা, সামাজিক বাস্তব অবস্থার প্রতিবাদ প্রতিরোধের কথা। গাইতে গাইতেই শ্রোতাদর্শকের কাছে গিয়ে হাতে হাত মেলানোর আবদারে মুছে দিতেন সত্তার স্বাতন্ত্র্য। আর সেলফি তোলার আবদার রক্ষায় গ্রাম শহর শহরতলির বাজার দোকান রাস্তায় যাঁরাই কাছে আসতে চাইছেন তাঁদের কাউকেই নিরাশ করতেন না।
কোনো কোনো সামাজিক আনন্দ অনুষ্ঠানে, জুবিনের ভিন্ন ভিন্ন টুপি ও গামছামোড়াপাগড়ি, পোষাক পরিচ্ছদও কম আকর্ষণীয় নয়। আবার কখনো শিশুসুলভ সহজ হাসির সঙ্গে নানা হাল্কা কথায়,কখনো মাটিতে বসে, কখনো আধা শুয়ে নানা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান, আর বিহু উৎসবে তো বিশেষ নাচের সঙ্গে গান এসবই অনুষ্ঠানকে একেকভাবে পুষ্ট করে সম্পর্ক নিবিড় করেছেন। অনুষ্ঠান শেষে ‘লাভ ইউ’ বলতে ভোলেন না। জুবিন ছাত্র ছাত্রীদের নানা অভাব পূরণে দরাজ, কারের ছাত্রাবাসের ব্যবস্থা, কারোর চিকিৎসা বা পড়াশোনার খরচ সবেতেই তিনি, হ্যাঁ। তাঁর 'একের মধ্যে অনেক জীবন', বৈচিত্র্যময় জীবন, ভাঁড়ার উজাড় করে প্রথাভাঙা জীবন উদযাপন করে চলেছেন নিজ ভঙ্গিমায় নিজ বিশ্বাসে।
জুবিন গর্গ বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী ‘হোমান বরগোহাইন’, ‘বিষ্ণু প্রসাদ রাভা ’ এই পূর্বসূরিদের সন্মান জানাতে প্রতি বছর ৭ ডিসেম্বর গ্রন্থ দিবস ও অধ্যয়ন দিবস হিসেবে পালন করতেন, পালন করতে বলতেন। এই দিন থেকে বিনামূল্যে গ্রন্থমেলা হবে। আর এবছর (২০২৫) পড়ুয়ারা মিলে জুবিন গর্গের জন্মদিন (১৮ নভেম্বর) স্মরণে, চালু করেছে বই বিনিময় প্রথা, পুরোনো- নতুন বই দেবে আর দরকার মতো বই নেবে, যেমনটি ছিল জুবিনের পরামর্শ।
জুবিন গর্গ নিজের কাজের প্রতি কতটা আন্তরিক কতটা আত্মপ্রত্যয়ী বা মানুষজনের প্রতি বিশ্বাসের তার জোর খুঁজে পাওয়া যায় যখন সাংবাদিকদের বলেন, লতা মঙ্গেশকর বা রাজেশ খান্না গত হলে মুম্বাইয়ে কোনো হেলদোল দেখা যায় না কিন্তু আমি মারা গেলে আসাম এক সপ্তাহ বন্ধ থাকবে, বাস্তবে এর বেশিই হয়েছিল। পাশের রাজ্য অরুণাচল সরকারও ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করে।
নিজের সুর ও নিজের লেখা প্রেমাবেগের গান, ‘মায়াবিনী’ সম্পর্কে বলেন, আমার এই গান আমি মারা যাওয়ার পরও মানুষজন এই গানটি গেয়ে যাবেন। এই কথার সাক্ষ্য দিয়ে চলেছে সারা উত্তরপূর্বাঞ্চলের তাঁর প্রিয় মানুষজনেরা প্রতি নিয়ত। ‘মায়াবিনী’ গানটি ছিল ২০০১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দাগ’ ছবির। এই গান, এখন আসামের ভক্তির গান, স্তবগান বা স্তোত্র গানের মতো হয়ে উঠেছে।
জুবিন গর্গের স্বীকৃতির কয়েক টুকরো এই রকম - গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণপদক ১৯৯২। বেষ্ট মিউজিক এ্যাওয়ার্ড বাংলা ছবি ‘শুধু তুমি’ র জন্য ২০০৫ সালে । ২০০৭ সালে ‘জি সিনে এ্যাওয়ার্ড’। সঙ্গীত পরিচালনা নন্ ফিচার ফিল্ম ‘ইকোস অফ সাইলেন্স’ ছবির জন্য জাতীয় পুরষ্কার ২০০৭ সালে । ‘গুগল’ এর কাছ থেকে এল ‘ওয়ার্ল্ড বেষ্ট হামিং আর্টিষ্ট’ পুরষ্কার। গুগল জানাচ্ছে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে পৃথিবীর ১৯৫টি দেশের মধ্যে ১২৪ টি দেশ জুবিন গর্গ সম্পর্কে সার্চ করছে । ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি মেঘালয় (USTM ) জুবিন গর্গ কে ডিলিট দেয় ২০২৫ সালের আগষ্টে। এই ইউনিভার্সিটি জুবিন গর্গ বিষয়ে পি এইচ ডি-র জন্য আগ্রহী ছাত্রছাত্রীদের আবেদন জমা দেওয়ার কথা বলছেন।
চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশের আগে থেকেই নাট্য কর্মী জুবিন গর্গের অনুপ্রেরণা ছিলেন মহান অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন। শারীরিক কৌশল ও রসিকতা মেশানো অভিনয়রীতির মাধ্যমে সামাজিক অব্যবস্থা ও রীতিনীতির বিরুদ্ধতার প্রকাশ।
জুবিন জীবনের কিছু সামাজিক দায়িত্ব পালন যেমন কোভিডের সময়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল একে অপরকে ছুঁতো না, কথা বিনিময় পর্যন্ত ভয়ের ছিল, সেই সময়ে নিজের দোতলা আবাসে জায়গা ছেড়ে দিয়ে চিকিৎসা, ওষুধ, খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। এছাড়া ১৪ টি শিশু ও এক পরিত্যক্তা মেয়ে 'কাজলি 'কে দত্তক নেওয়া, সুনু গুরুংকে কিডনির চিকিৎসার জন্য শোনা মাত্রই আর্থিক সহায়তা (প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা), অন্ধ মেয়ে 'কিরণবালার'র ও পথ দুর্ঘটনায় আহত 'পাপুর' লম্বা সময়ের চিকিৎসা, 'মামুনির' ক্যান্সারের চিকিৎসা, প্রতিদিন নানান মানুষের নানা অসুবিধার সুরাহা করা, অনুষ্ঠান ফেরৎ রাস্তায় ঘুমিয়ে থাকা মানুষজনের মাথার নিচে সেদিনের রোজগারের কিছু টাকা গুঁজে রেখে যাওয়া, চলমান চিত্রে দেখা যায় গ্রামের চায়ের দোকানে চা খাওয়া পাশে বয়স্ক কোনো বাসিন্দার কাঁধে হাত রেখে একান্ত বন্ধুর মতো চা খাওয়া ,গাড়ি থামিয়ে রাস্তায় এক সাপকে কৌশলী হাতে সযত্নে রাস্তা পার করে দেওয়া, এরকম আরও অনেক সামাজিক কাজ নিজের কর্তব্য বলে মনে করে গেছেন।
এর মধ্যে নিয়ম করে গাছ পোঁতা, গাছের সেবা করা, গাছকে পরম আদরে জড়িয়ে কান পেতে তার সুর শোনো ,বাড়িতে কুকুর খরগোশ হনুমান রাজহাঁস পাখীদের পরিচর্যা ও তাদের সঙ্গে খেলা জুবিনের নিত্যকার তৃপ্তির উপাদান।
জুবিন গর্গের আর একটি কাজ আলোড়ন তোলে সেটা হল ‘বৃন্দাবন সুপার মার্ট’ নামে আধুনিক মলের ঢঙে শাকসবজি, বিভিন্ন রকমের দানা শস্য, আলু পটল ডাল চাল তেল ফলমূল ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সাধারণ দোকান- বাজারের থেকে কম দামে বিক্রি। এই সংস্থায় নাট্যদলের আরও কয়েকজনের রোজগারের ব্যবস্থা হয়। গ্রামে গ্রামে ঘুরে চাষীদের সঙ্গে কথা বিনিময় করে জৈব সারের আয়োজন ও দেশি বীজ দিয়ে উৎপাদনের আগ্রহ তৈরি করেন ও উৎপাদিত আনাজ কেনার নিশ্চয়তা দেন। ‘বৃন্দাবন সুপার মার্ট’ আসামের অনেক শহরে খোলার ইচ্ছা ছিল জুবিন ও তাঁর স্ত্রীর । ঘোষণা অনুযায়ী জানা যায় ক্রেতারাই পরে এই বৃন্দাবনের নথিভুক্ত সদস্য ও অংশীদার হবেন,তাঁদের পরিচয় পত্র থাকবে ও বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পাবেন ।
জুবিন গর্গ নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রতিরোধ প্রতিবাদের আন্দোলনে দীঘালপুখুরীতে ‘নো এন-আর-সি, নো সি-এ-এ’ আন্দোলনে সোচ্চার হন ২০১৪ সালে, পরে ওই একই জায়গায় ২০১৯-এ গাছ কাটার বিরূদ্ধে সোচ্চারে বলেছেন ‘গাছ কাটার আগে আমাকে কাটো’। বলিউডের নায়ক 'গোবিন্দা' কামাখ্যার মন্দিরে পূজার্চনায় মানত হিসেবে মোষ বলি দেওয়ার কথা বললে, জুবিন বলেন ‘জীব বলি দিয়ে কখনো পূজা হয় না, তার আগে উচিৎ ছিল নিজেকে বলি দেওয়া’ তবে এ ঘটনার পর কিনা জানা নেই,এখন কিন্তু কামাখ্যা মন্দিরে পশু বলিতে নিষেধাজ্ঞা আছে।
জুবিন গর্গ কি ছকহত্যার শিকার? আসামবাসী দেখেছে জুবিনের নিরাপত্তা বা চিকিৎসা; মৃত্যুতদন্ত বা অভিযুক্তদের দোষী প্রমাণ তো দূরের কথা গ্রেপ্তারিতেও ঢিলেমি। সিঙ্গাপুরের আদালত প্রথমে জানিয়েছে, এটি সাধারণ মৃত্যুই, কোনো রহস্য নেই। তবে সাক্ষ্য প্রমাণাদি নিয়ে আইনী বিচার পর্ব এখনো চলছে। ফাইন্যাল জাজমেন্ট ২০২৬’র ফেব্রুয়ারি। অন্যদিকে ন্যায় বিচারের দাবিতে ২০২৫’র ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ অব্দি স্বাক্ষর দিয়েছেন ৭০ লক্ষেরও বেশি মানুষ। আসামবাসীকে বিশেষত যুবক- যুবতী ও প্রান্তিক মানুষজনকে বন সংরক্ষণে এগিয়ে আসার জন্য এবং ‘নো এন-আর-সি, নো সি-এ-এ’ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে যুক্ত থাকার আহ্বান জানানোর জন্য জুবিন ছিলেন শাসক দল বিজেপি’র চক্ষুশূল। তবুও প্রধানমন্ত্রী তাঁর সেপ্টেম্বরের রেডিও অনুষ্ঠান ‘মন কি বাত’ একেবারে ‘জুবিনময়’ করে তোলেন। ছুটে আসেন আদানি, আম্বানিরা। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা জুবিনের প্রতি প্রথম দিকে উগড়ে দেওয়া তাচ্ছিল্য গিলে ফেলে উল্টো মেরুতে গিয়ে জানান জুবিনকে হয়’ত মেরে ফেলাই হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, আদানি আম্বানিদের এবম্বিধ আচরণ আর অন্যদিকে হাজার মানুষের তোলা অভিযোগে আমারও নানান সন্দেহ আকারে ওজনে বাড়ছে। কিন্তু ‘নো ওয়ান কিলড জেসিকা।’