সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
আমি প্রাথমিক শুশ্রূষায় নিয়োজিত একজন চিকিৎসক। গ্রীষ্মমণ্ডলে যেসব রোগ হয় সেই সব রোগ নিয়ে আমার বিশেষ আগ্রহ। আর গত আট মাস ধরে ‘স্বাস্থ্য স্বরাজ’ নামের একটি অলাভজনক সংস্থায় এই নিয়ে কাজ করছি। কালাহান্ডি জেলার দক্ষিণে কারলাপাট বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের গভীরে ছোট ছোট কুঁড়েতে ‘কুটিয়া কোন্ধ’ নামের একটি আদি জনপদবাসী সম্প্রদায়ের সার্বিক উত্তরণের লক্ষ্যে আমাদের কাজ। এই ফোরামে আমি সাম্প্রতিক দেখা এক রুগী সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করছি। চিকিৎসা সংক্রান্ত লেখালেখি ও সাহিত্যে আগ্রহী ডাক্তারদের সঙ্গে এই সূত্রে সম্পর্ক হলে আমার ভালো লাগবে।
অমিত, পোলাদুমার গ্রামের পাঁচ বছরের একটা বাচ্চা ছেলে। বিস্তীর্ণ উপত্যকায়, চারিদিক ঘন জঙ্গলে ঢাকা খাড়া পাহাড়, আদিবাসী-মূলবাসীদের চল্লিশটা বাড়ি নিয়ে একটি বসতি হল পোলাদুমার। আমি অমিতকে প্রথম দেখি গত ফেব্রুয়ারির (২০২৫) শেষ সপ্তাহে, যখন তাকে ক্লিনিকে আনা হয়েছিল। সন্ধে তখন সবে ছ’টা পেরিয়েছে। হাসপাতালের চারপাশের গাছগাছালির মধ্যে একটু ঘুরতে বেরিয়েছি, এমন সময় অন-ডিউটি নার্স ফোনে জানাল যে এমারজেন্সিতে একটা বাচ্চাকে নিয়ে আসা হয়েছে যার গলার সামনের দিক, বুক এবং পেট পুড়ে গেছে। তাড়াতাড়ি ফিরে গেলাম, ফিরে গিয়ে তাকে পরীক্ষা করলাম। দাদার সঙ্গে খেলা করার সময় দুর্ঘটনাবশত সে রান্নার আগুনে পড়ে গিয়েছিল, পড়ে গিয়ে তার সিন্থেটিক কাপড়ের জামায় আগুন ধরে যায়। তার বাবা-মা কেউই তখন বাড়ি ছিল না, জঙ্গলে গিয়েছিল শিয়ালি পাতা সংগ্রহে, দেখাশোনার জন্যে বাড়িতে একমাত্র ঠাকুমা। চিৎকার শুনে ঠাকুমা ছুটে কুঁড়ের বাইরে বেরিয়ে দেখেন দুই ভাই মিলে জামায় ধরে যাওয়া আগুন নেভানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী তিনি সঙ্গে সঙ্গে অমিতকে কাদায় গড়িয়ে দেন এবং এইভাবে আগুন নিভে যাবার পর সন্তর্পণে জামাটা ছাড়িয়ে নেন, নিয়ে তাকে কাঁধে করে নিভু নিভু দিনের আলোয় জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে ঘটনার সময় থেকে দুঘণ্টা পরে হাসপাতালে পৌঁছন।
বাচ্চাটার তখন খুবই খারাপ অবস্থা। একেই সে অপুষ্টির শিকার, শরীরে জলের অভাব, রক্তে শর্করার অভাব (হাইপোগ্লাইসেমিক), তার ওপর হৃদস্পন্দন এবং শ্বাসপ্রশ্বাস দুইই খুব দ্রুত। মনে হল তার পোড়া অংশটা ত্বকের গভীরে যায় নি, কিন্তু পুড়েছে প্রায় দশ শতাংশ এবং বেশ কষ্টদায়ক। প্রথম দফায় ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইড দেওয়া হল, করা হল রক্তে শর্করা এবং ইলেক্ট্রোলাইট পুনরুদ্ধারের বন্দোবস্ত। একই সঙ্গে পোড়া জায়গাটাকে খুব যত্ন করে পরিষ্কার করে সেখানে টপিকাল অ্যান্টিসেপ্টিক লাগিয়ে গজ প্যাড দিয়ে ড্রেসিং করে দেওয়া হল। এটা সবাই জানে যে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের গায়ে আগুন ধরে গেলে তাদের আরোগ্যসম্ভাবনা কমে যায়, কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয় এবং বাইরের চামড়া তৈরি হতে গেলে যে পুষ্টি লাগে সেই পুষ্টি তারা পায় না। অমিতকে যখন হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তখন তার উচ্চতা অনুযায়ী ওজন ছিল গড়ের নিচে তিনটে যে মাপ আছে তার থেকেও কম, সোজা কথায় মানে হচ্ছে, অমিতের সমান উচ্চতা এমন সারা বিশ্বের হাজারটা শিশুকে যদি এলোমেলোভাবে ধরা যায়, তার ওজন হবে ৯৯৭-এরও কম। আঘাতে প্রচুর ফ্লুইড ক্ষয় হবার কারণে তার শরীরে রক্ত বা তরলের পরিমাণও কমে গিয়েছিল (হাইপোভোলেমিক)। যদি আর কয়েক ঘণ্টা পরে তাকে আমাদের কাছে আনা হত, তাহলে তার বাঁচার সম্ভাবনা আরো কমে যেত।
সে রাত্রে তাকে প্রচুর পরিমাণ ফ্লুইড অর্থাৎ তরল পদার্থ দেওয়া হল, নার্সেরা ঘণ্টায় ঘণ্টায় তাকে পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ মিশ্রণ খাওয়াতে লাগল, ভাত, দুধ, ডিম, তেল, ঘি, ডালগুঁড়ো আর বাদামগুঁড়ো দিয়ে যেটা তারা নিজেরাই বানিয়েছিল। পরের দিন সকালে আমি যখন তাকে দেখলাম, তার অবস্থা স্থিতিশীল, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক, নাড়ি সবল, পেচ্ছাপ ভালোই হচ্ছে। সেদিন সকালে আমি যখন তার ড্রেসিং পাল্টাচ্ছিলাম, তখন তার তীক্ষ্ণ আর্তনাদ বহুদিন পর্যন্ত আমার কানে বেজেছে। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছিল খুবই সীমিত, থাকার মধ্যে শুধুমাত্র এক ঐ স্টেরাইল গজ, এবং গজগুলোর কয়েকটা নিচের পুড়ে যাওয়া টিস্যুতে জড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে আমি যখন তার ময়লা গজের টুকরোগুলো পালটে নতুনগুলো লাগাতে যাচ্ছিলাম, আকস্মিকভাবে ক্ষত নিরাময়ের সময় যেসব লালচে ও দানাদার টিস্যু তৈরি হয় সেরকম কিছু টিস্যু ছিঁড়ে ফেলেছিলাম। বাচ্চাটার পক্ষে যে সেটা কি পরিমাণ মর্মান্তিক হয়েছিল যে কেউ কল্পনা করতে পারে। অবস্থার মোকাবিলা করতে অতএব আমাকে নার্সদের নির্দেশ দিতে হল দু’ ঘণ্টা অন্তর অন্তর গজগুলোকে গ্লিসারিন দিয়ে ভিজিয়ে রাখতে যাতে গজের নিচে যে বাইরের চামড়াটা তৈরি হচ্ছে তাতে গজটা জড়িয়ে না থাকে। সেদিন সন্ধ্যেবেলা যখন তার ড্রেসিং পালটানো হল তখন সে আরো খানিকটা ভালো। জেনে ভালো লাগল যে সে বেশ ভালোভাবেই সেরে উঠছে।
পরের দিন ছিল আমার ছুটি, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছিল কোত্থেকে সে এসেছে। তার বাবা-মা সেদিন সকালেও এল না দেখে আশ্চর্য লাগল এবং আমি যখন ঠাকুমাকে তাঁদের দেরি হওয়ার কারণ জিগ্যেস করলাম, তিনি বললেন হতে পারে তারা অমিতের ব্যাপারটা এখনো জানেই না, কারণ গত দু’রাত্তির ধরে তারা জঙ্গলেই আছেন।
জিগ্যেস করলাম যদি আমি তাদের বাড়িতে গিয়ে কি ঘটেছে জানাই তিনি কি মনে করেন সেটা ভালো হবে? “অবশ্যই”, তিনি বললেন, “কিন্তু আপনার গাড়ি সেখানে যাবে না। পোলাদুমারে গাড়ি যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই।” আমি তাঁর কাছে পথ জেনে নিলাম এবং শিগগিরি রওনা গিলাম। বনের ভেতর দিয়ে, চাষাবাদের জন্যে পাহাড়ের ঢালে সিঁড়ির মত ধাপে ধাপে যে সমতলভূমিগুলো তৈরি হয় সেগুলো পেরিয়ে, তারপর ছোট বড় নানারকম গাছে ঢাকা একটা চড়াইয়ের শেষপ্রান্তে পৌঁছে দম নেবার জন্যে একটা বড় পাথরের ওপর বসে পড়লাম। নিচের উপত্যকায় একটা অদ্ভুত সুন্দর গ্রামের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য আমাকে স্বাগত জানাল। কাঁচা রাস্তার দুপাশে পরিষ্কার সারিবদ্ধভাবে ঢালু মাটির তৈরি ঘরবাড়ি।
উৎরাই ধরে রওনা দিলাম, এবং একেওকে জিগ্যেস করে জানতে পারলাম যে অমিতের বাড়ি গ্রামের একদম শেষপ্রান্তে, যার কাছেই একটা ঝর্ণা আছে। মাঝখানের রাস্তাটা ধরে দুপাশের কাঠ আর মাটি দিয়ে তৈরি বাড়িগুলো পেরিয়ে আমি যখন তাদের বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছলাম, তখন একটা সাত বছরের বাচ্চা ছেলে ঝর্ণার ধার থেকে হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বিভ্রান্তভাবে আমার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আর যখন আমি ভাঙা প্রায় হাস্যকর ওড়িশা ভাষায় আমার আসার কারণ বললাম, সে হাসিতে ভেঙে পড়ল এবং তার বাবা-মাকে ডাকতে কাছের একটা মাঠে ছুটে গেল।
অমিত ভালো আছে জেনে তার বাবা-মা দারুণ খুশি। তারা আমাকে বলল, কাজে ব্যস্ত বলে তারা যেতে পারেনি, কিন্তু আজকেই যাবে বলে ভেবেছিল।
যতটা ভেবেছিলাম তার থেকে কম সময়েই আমাদের সাক্ষাৎকার শেষ হয়ে গেল। আপন মনে ভাবতে ভাবতে হাসপাতালে ফিরে চললাম। তো এই হল অমিতের পরিবার— ভূমিহীন আদিবাসী, জঙ্গলের গাছপালা কেটে ফেলে তারপর সে জায়গাটা পুড়িয়ে দিয়ে চাষাবাদের যে আদিম জীবিকা তাতে নিয়োজিত, সম্পদ বলতে প্রায় কিছুই নেই, বেঁচে থাকাটা এত অনিশ্চিত যে অসুস্থ ছেলেকে দেখতে যাওয়াটাও দুদিন পিছিয়ে দিতে হয়েছে, নইলে তারা খেতে পাবে না। ওয়ার্ডে যখন ফিরে গেলাম, অমিতের ফ্যাকাসে, স্বাভাবিক রঙের থেকে হাল্কা হয়ে যাওয়া চুল, হাড়পাঁজরা বেরিয়ে যাওয়া বুকটার দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি এবং পরিষ্কার বুঝলাম খাদ্য অনিশ্চয়তার মানে কি।
হাসপাতালে পাঁচ দিনের দিন তার জ্বর এল, এবং যখন সাধারণ কারণগুলো সবই খতিয়ে দেখে বাদ দিতে হল, তখন আমার সন্দেহ হল তার কোনো একটা ক্ষতস্থানে ইনফেকশন হয়ে গেছে। এরকম একটা অনুমান করে আমি তাকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াতে শুরু করলাম, যদিও জানি যে সেপ্সিস হয়ে যেতে পারে। যাই হোক জেনে ভালো লাগল যে পরের দিন তার জ্বরটা কমেছে। দশ দিনের মত সে আমাদের সঙ্গে ছিল, যদিও এই সময়ের মধ্যে তার কোনো ওজন বাড়ে নি (কারণ প্রাথমিকভাবে পুড়ে যাওয়া থেকে সেরে উঠতে গেলে যথেষ্ট পুষ্টিকর খাওয়াদাওয়া লাগে), কিন্তু তার ক্ষতস্থানগুলো সেরে উঠেছে এবং পুষ্টিকর খাওয়া-দাওয়া করার কথা বলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হল।
ওয়ার্ডে থাকার সময় আমি তার ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম কারণ প্রাথমিকভাবে আমিই তার দেখাশোনা করতাম এবং প্রথম কয়েকদিন আমিই দুবেলা তার ড্রেসিং করতাম। খুবই হাসিখুশি বাচ্চা সে, যেদিন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল সেই প্রথম দিনটা বাদে, একদিনও ছিল না যেদিন সে আমাকে দেখে একমুখ হাসি হাসে নি। আমি তাকে আমার জীবনের নানারকম গল্পগাছা করতাম এবং সে মন দিয়ে শুনত। ড্রেসিং পাল্টানোর সময় তার মনোযোগ অন্য দিকে ঘুরিয়ে রাখার ব্যাপারে গল্পগাছাগুলো খুব কাজে দিত। খুব বুদ্ধিমান ছিল অমিত, নানারকম প্রশ্ন করত। যদি আমি তাকে বলতাম যে জঙ্গলে একপাল ভেড়া দেখেছি, তো সে প্রশ্ন করত কতগুলো ভেড়া ছিল এবং তাদের প্রত্যেকের রং কি ছিল। তার বাবা-মা ফিরে আসার পর ঠাকুমা বাড়ি ফিরে গেল, এবং তার পরের সপ্তাহের শেষে ঠাকুমাকে জানাতে যে সে ভালো আছে আমি আবার তাদের গ্রামে গেলাম। ঠাকুমা তো খুব খুশি, আমাকে জিগ্যেস করলেন কোনোভাবে তাঁর কথা অমিত পর্যন্ত পৌঁছোনোর কোনো উপায় আছে কিনা। আমি তাঁকে আমার ফোনটা দিলাম বটে, কিন্তু খেয়াল হল অমিতের বাবা-মায়ের কাছে তো কোনো ফোন নেই। তখন আমি ঠাকুমার একটা ভিডিও মেসেজ তৈরি করলাম সেদিন সন্ধ্যেয় যেটা আমি অমিতকে শুনিয়েছিলাম। অমিত তো খুব খুশি এবং তার বাবা-মাও।
যেদিন সে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে গেছে, সেদিন থেকে প্রতি সপ্তাহে আমি তার গ্রামে যাই। চোখের সামনে সে বেড়ে উঠছে দেখতে ভালোই লাগে। সামান্য ওজন বেড়েছে তার, কিন্তু এখনো ভীষণ অপুষ্ট। এখন সে তার বাইরের কাজে কখনো কখনো বাবা-মাকে সাহায্য করে, পাহাড়ের গায়ে যে চাষবাস তাতে হাত লাগায়, অথবা ঝর্ণা থেকে জল নিয়ে আসে। দেখা হলে আমরা দুজনেই খুব খুশি হই, বিশেষ করে অমিত আমার ফোনে তার ঠাকুমার ভিডিও মেসেজটা দেখতে ভালোবাসে। ঠাকুমার ব্যাপারে সে কখনো ক্লান্তি বোধ করে না।
আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করাটা রীতিমত পুরস্কারস্বরূপ। পরিবারের মধ্যে তাদের পারস্পরিক বোঝাপড়াগুলো লক্ষ্য করতে চমৎকার লাগে। আগাগোড়া একটা পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন করে তারা, কিন্তু তাদের সে জীবনযাপনের সমস্ত চেষ্টা আমরা ব্যর্থ করে দিয়েছি। আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা হয় নামমাত্র আছে অথবা একেবারে নেই, নেই যথাযথ স্বাস্থ্য পরিষেবা, নেই পুষ্টি, নেই স্বাস্থ্যবিধি, নেই জঞ্জাল সাফাই, নেই নিরাপদ পানীয় জল, নেই গ্রামীন কর্মসংস্থানের অধিকার, নেই নির্বাচনী অধিকার। পরিবর্তে তাদের সামান্য যে এক টুকরো জমি তাও তারা হারিয়েছে, খনি আর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি মিলে করেছে তাদের বাস্তুচ্যুত। যারা প্রতিবাদ করেছে তাদের নকশাল আখ্যা দেওয়া হয়েছে, যার ফলে রাতারাতি তাদের অদৃশ্য হবার প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
এখানে কোনো মানচিত্র নেই। শুধু ঘুরপথ।
নিচু নিচু ঘর, লালমাটির দেওয়াল।
ঢালু ছাদ, পোড়া টালি।
জ্বালানি কাঠের স্তুপ।
বাইরে শুকোচ্ছে রঙচঙে কাপড়গুলো।
প্রচণ্ড অপুষ্টিতে ভোগা বড় বড় চোখ নাকে শিকনি বাচ্চাগুলো খেলে বেড়াচ্ছে মাঠে।
ঘেয়ো কুকুরগুলো আঁচড়ে আঁচড়ে গায়ের মাছি তাড়াচ্ছে।
চারপাশে ঢালু পাহাড়, ঘন বনভূমি।
নাকে তিনটি নথ, কুঞ্চিত মুখ সবুজ শাড়ি পরা মহিলা পাকদণ্ডী ধরে ধীরে ধীরে হাঁটছে মাথায় সদ্য কাটা কাঠের টুকরোর বোঝা নিয়ে।
কাঠের ধোঁয়া আর সবুজ বনের গন্ধ।
তৃণভূমিতে চরে বেড়ানো গরুগুলো।
বৃদ্ধ মহিলারা, গায়ের রঙ কালো, মুখে বলিরেখা, শীতের রোদে উবু হয়ে বসে ধূমপান করছে।
গাছগুলো, কিছু যেমন বিশাল, তেমনি বিশাল শক্তপোক্ত গুঁড়িগুলো, মৃদু বাতাসে ফিসফিসিয়ে কথা বলছে তাদের পাতাগুলি।
বনের মধ্যে দিয়ে নিচের দিকে নেমে আসা পথ, পাশ দিয়ে কিচিরমিচির করে ওড়াউড়ি করছে পাখিরা।
ঝর্ণায় চান করছে ক্ষিপ্র, প্রাণচঞ্চল মেয়ের দল, দ্রুত বয়ে যাওয়া ঝর্ণার জলে কাপড়জামা কাচছে।
চান করাচ্ছে তাদের বাচ্চাদের আর বাচ্চারা ঠাণ্ডাজলে চানের আনন্দে উল্লসিত, কলবল করছে যখন তাদের মায়েরা সাবান মাখিয়ে তাদের গা ঘসে দিচ্ছে।
নদীর ঠিক ওপারে খাড়াভাবে উঠে আসা পাহাড়, চাষাবাদের জন্যে পাহাড়ের ঢালে কোণাকুণি সিঁড়ির মত ধাপে ধাপে সমতলভূমি বনের ওপর ঘনিয়ে তুলেছে অন্ধকার ছায়া।
বাড়ি ফেরার পথে, দুই যুবকের কাঁধে তুলে নেওয়া বিশাল ঢোলের তালে তালে গ্রামবাসীরা নাচছে।
তারপর রাত্রি এবং আকাশ।
অগণন তারা।
অমাবস্যার পাতলা ফ্যাকাশে ছায়াচিত্র।
একাকী প্যাঁচার ডাক, ঝিঁঝির ডাক, এবং আরো পরে নিবিড় রজনীতে একান্ত স্তব্ধতা, যতক্ষণ পর্যন্ত ভোর না হয়।
পাহাড়ের পেছনে সূর্য উঠছে।
রঙ বদলাচ্ছে আকাশ—রক্তিম থেকে জাফরান হয়ে সোনালী।
রাতের শীতলতা দূর করে জাগ্রত পৃথিবীকে উষ্ণতা দিচ্ছে সূর্য।
উপত্যকার আরো নিচে তৃণভূমিতে ছাগলদের চরাতে নিয়ে যাওয়ার সময় তাদের গলার ঘণ্টার ধাতব আওয়াজ।
মাটির উনুনে প্রাতঃরাশ তৈরি করার সময় মেয়েদের মৃদু কথাবার্তার শব্দ।
বিছানা থেকে জেগে ওঠার সাথে সাথে ক্ষীণকায় বৃদ্ধের ঘঙ্ঘঙে কাশি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সারা ঘরে, নদীতীরের মাটির মতোই লাল তার কফ।
প্রার্থনা এবং গতকালের ভাত দিয়ে দ্রুত সেরে নেওয়া প্রাতঃরাশ এবং তারপর কাজে চলে যাওয়া।
বাইরে রোদ্দুরে শুকোয় কর্মশালার খড়ের ছাদের তলায় বসে তৈরি কারুকাজ করা তার পাত্র।
দু’ হাত দিয়ে মাটির একটা তাল তুলে সর্বশক্তি দিয়ে চাপড়ে গোলাকার ঢিবি তৈরি করে সে।
কুমোরের চাকের মাঝখানে সেই ঢিবিকে বসিয়ে দমাদ্দম পেটায়।
দু’ হাতের সাহায্যে চাকটাকে কুশলতার সঙ্গে দ্রুত ঘোরাতে শুরু করে, এত দ্রুত যে চাকের স্পোকগুলোকে আর দেখা যায় না, চাকটাকে দেখায় যেন কাঠের একটা বর্তুলাকার চাকতি, আর দ্রুত ঘোরা তার হাতদুটোর কোনটা যে বাঁহাত আর কোনটা ডান বোঝা দুষ্কর হয়ে পড়ে।
তারপর জলের জায়গায় হাত চুবিয়ে নিয়ে হাত দিয়ে গড়িয়ে আসা জলের ফোঁটায় ততক্ষণ মাটিটাকে ভেজা ভেজা করে যতক্ষণ না সে ঢিবিটাকে তার দু’ হাতের তালু দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরতে পারছে; জড়িয়ে থাকা তার আঙুলগুলো মাটিটাকে যেন বা ঐশ্বরিক আদেশেই ওপরের দিকে ঠেলে তোলে।
প্রায় নিঁখুতভাবে তৈরি চোঙটার শীর্ষভাগকে তর্জনী দিয়ে ঠেলা দেওয়ার সময় নিবিষ্টমনা হয়ে ওঠে সে, যার ফলে চারপাশে উঁচু বেড় আছে এমন একটা ফোকর তৈরি হয় যাকে সে তার কড়া পরা আঙুল দিয়ে শৈল্পিকভাবে ঠেলা দিয়ে একটি সরু ফুলদানিতে পরিণত করে এবং যার কাঁচা ভেজা গায়ে দক্ষ হাতে একটা সরু লাঠি দিয়ে সূক্ষ্মভাবে খাঁজ কেটে কেটে কানার চারপাশে পাহাড়ের ঢালের অনুরূপ সরল একটা প্যাটার্ন তৈরি করে তাকে সাজিয়ে তোলে।
স্পোক ঘুরিয়ে আবার সে দ্রুতগতি করে দেয় চাকটাকে যাতে করে ছোটোখাটো ত্রুটিগুলিকে [কিনারা কেটে ঢালু করে দেওয়ার যে যন্ত্র সেই] মাটাম দিয়ে ঠিক করে নিতে পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে এই কাজ চালিয়ে যায় যতক্ষণ তার মন সন্তুষ্ট না হয়, তারপর একটা দড়ি দিয়ে সৃষ্ট বস্তুটিকে ঢিবি থেকে আলাদা করে, করার সময় খেয়াল রাখে যাতে সমতল হয়।
তারপর আর একটা লম্ফ, তারপর আরো একটা, যতক্ষণ না সে রোদ্দুরের তাতে এবং তারপর ভাটিতে পোড়ানোর মত যথেষ্ট মৃৎপাত্র তৈরি করতে পারে।
ভাটির জন্যে ব্যবস্থা— রোদ্দুরে শুকোতে দেওয়া সমস্ত মৃৎপাত্রগুলিকে এক জায়গায় করে সে, ভেতরে এনে ১০ ফুট প্রস্থ এবং সমান দৈর্ঘ্যের স্তূপাকারে সাজায়, যার মধ্যে বড় মৃৎপাত্রগুলো ছোট মৃৎপাত্রগুলোর ঠেকনো হিসেবে কাজ করে; ততক্ষণ পর্যন্ত এইভাবে সাজাতে থাকে যতক্ষণ না স্তূপটা শঙ্কু আকৃতির উঁচু ইমারতের মত হয়ে তার নিজের সমান উচ্চতায় পৌঁছয়, তারপর তলার চারপাশে আটকোণা করে শুকনো জ্বালানি কাঠ
সাজিয়ে দেয়।
বড় পাত্রের কোনো কোনোটার মধ্যে আলাদা করে রাখা পোড়া কাঠগুলো রেখে, শুকনো খড় দিয়ে স্তূপটাকে ঢেকে দেয় সে যতক্ষণ না নিচের বাদামী মৃৎপাত্রগুলোকে সম্পূর্ণ ঢেকে দিচ্ছে [খড়ের] হলুদ, তারপর কর্মশালার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা পাত্র থেকে ভেজা মাটি নিয়ে খড়ের ওপর ততক্ষণ ছিটিয়ে দেয় যতক্ষণ না স্তূপের পুরোটা ঢাকা পড়ছে।
খড় আর মাটি দিয়ে আরো এক প্রস্থ ঢাকে সে, তারপর নিচের চারপাশের জ্বালানি কাঠে আগুন ধরাতে থাকে যতক্ষণ না ধোঁয়া বের হয়।
তারপর ভাটির খোলা আগুনে সে বিড়িটি জ্বালিয়ে নেয়, শুকনো তেন্দু পাতাসমেত ভেতরের তামাক পুড়ে ধোঁয়া বেরোতে থাকলে শান্তমনে বিড়িতে সুখটান মেরে ধোঁয়া ছাড়ে।
কর্মশালার কোণ থেকে চাকের ওপর ঝুঁকে পড়া একটা লোকের কাশির শব্দ।
বাইরে গ্রীষ্মের প্রখর রোদের তাপ, খালি পায়ে চাপকলের দিকে হেঁটে যাচ্ছে সে, মাটির তাপ পুড়িয়ে দিচ্ছে তার পায়ের তলা।
হাতলের ওপর জোরালো ধাক্কা আর টান আর ফাঁপা পাইপের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীর গভীর থেকে উঠে আসা জলের ঝিরঝির শব্দ যেন বা কোনো দৈত্যের তীব্র নিঃশ্বাসের মধ্যে দিয়ে ভেসে আসছে।
কলের ভেতর থেকে ঠাণ্ডা জল বেরিয়ে ধুলোমাটির ওপর পড়ে আর পড়ন্ত জলে সে ধুয়ে নেয় হাতপায়ের শুকনো কাদামাটি।
দূরে, গভীর জঙ্গলের ভেতর থেকে, গাছের গুঁড়িতে কুড়ুলের কোপের মৃদু আওয়াজ।
মাথার ওপরে কুড়ুল উঁচু করে তোলার সময় তার স্থূলকায় দেহের রূপ।
সমস্ত শক্তি দিয়ে গাছটাকে কেটে নামানোর আগে ক্ষণিকের বিরতি।
মারাত্মক আঘাত, এবং গাছটা নিচে লুটিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড ধাক্কা এবং বন থেকে বনে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফেরে তার শব্দ এবং তারপরই শুরু হয় বাঁদরদের উত্তেজিত চিৎকার।
চারদিকে ঢালু খাড়া পাহাড়ের মাঝখানে উপত্যকার মধ্যে তার গ্রামে ফিরে যাওয়ার পথ, মাথার ওপর কাঠের স্তূপ, ঘাড়ের ওপর চেপে বসা ওজন কোনো অস্বস্তিতে ফেলছে না তাকে, ধীরে ধীরে সে হেঁটে যাচ্ছে অরণ্যপথ ধরে আপনমনে গুনগুন করতে করতে।
গ্রামের ইস্কুলের ঠিক বাইরে গাছ থেকে তুঁতফল তুলছে বাচ্চারা—সবচেয়ে পাকা ফলগুলো দেখতে সবথেকে কালো, তাদের রঙ অনেকটা একসপ্তাহের পুরোনো কালশিটে দাগের মতো, কালো রঙের ওপর নীল দাগ।
হলুদ আর লালগুলো পাকা নয়, তবুও তারা বেশ শক্ত এবং টোকো।
সবচেয়ে পাকাগুলো অবিশ্বাস্যরকমের সুস্বাদু, তাদের টক-ঝাল-মিষ্টি স্বাদ মনে করিয়ে দেয় ঘুমন্ত গ্রীষ্মের দুপুরগুলোকে, তাদের নরম শাঁস মুখে দিলে গলে যায়, যদিও তাদের মোটা খোসাগুলো গলার পেছনে হালকা একটা ক্ষত তৈরি করে।
কিন্তু গাছটা আর নেই।
কুমোররা তাদের কাজ ছেড়ে দিয়েছে।
অরণ্য অদৃশ্য, আর তার সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য আদিবাসী-মূলবাসীদের জীবনধারা।
আগে যেখানে একটা গ্রাম ছিল, সেখানে এখন একটা খাদান।
ঝর্ণা শুকিয়ে গেছে বহুদিন আগে।
এখন এমনকি মাটির নিচের জলেও দুর্গন্ধ।
ধুলোর রঙ কালো এবং আপন মাতৃগর্ভ খুঁড়তে খুঁড়তে তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিও কালো।
অন্ধকার রাত আর মাতৃগর্ভকে ফিরে পাবার আশায় আন্তরিক তাদের প্রার্থনা।
খনির কাছে, দুটো কুকুর দেখলাম, দুবলা পাতলা, জন্মগত ত্রুটির কারণে কোমরের কাছ থেকে জোড়া—রঙ একটার কালো, কানের কাছে সাদা রঙের একটা চুলের গোছা, আর একটা পুরো বাদামি।
ভাবি কোমরের কাছে যেখানটায় তারা জোড়া সেখানকার রঙটা কি—অবশ্যই কোনো এক নিষ্ঠুর স্রষ্টার কাজ হবে আর নাহলে এরকম কোনো স্রষ্টাই নেই।
বড়ই মর্মান্তিক তাদের দুর্দশা, দুজনেই চায় দুজনের থেকে আলাদা হতে, দুজনেই চায় দ্রুতগামী ইঁদুরের দিকে ছুটে যেতে অথবা কোনো অদ্ভুত গন্ধের দিকে, কিন্তু শেষমুহূর্তে আটকা পড়ে একজন আর একজনের অচ্ছেদ্য বন্ধনে, যা জীবনের শেষ পর্যন্ত বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে।
ভাবি যখন একজন আর একজনের আগে মারা যাবে তখন কি হতে পারে—জীবিত জন কি বয়ে বেড়াবে ভাইয়ের মৃতদেহ যতক্ষণ না সে নিজেও মারা যায়, নাকি জন্ম থেকে যে তার জীবনের সঙ্গী ছিল সেই ভাইয়ের মৃত্যুর শোকে সে এতটাই অভিভূত হবে যে যে বিচ্ছিন্নতা সে সারা জীবন চেয়েছে কিন্তু প্রকৃতি তাদের অন্তরে দিলেও বাস্তবে দেয় নি সেই ভাইয়ের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেয়ে মৃত্যুকেই বরণ করা শ্রেয় মনে করবে।
যদি কোনো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এরকম হয় যে তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন জীবন যাপন করতে সক্ষম হল, ভাবি তারা কি তখন শুধুমাত্র অভ্যাসের বশে একসঙ্গে থাকবে; আরো ভাবি বিচ্ছিন্ন হবার পর তারা কি একে অপরের মুখে আপন আপন দুঃখের ছায়া দেখে সেই জঘন্য কিন্তু অবিচ্ছেদ্য সাহচর্যের চিহ্ন না রাখার জন্যে সেই মুহূর্তে পরস্পর পরস্পরের থেকে পালিয়ে যাবে; হতে পারে তারা হয়ত পরস্পরের চোখে সেই নিষ্ঠুর প্রতিফলন অনুভব করবে এবং নিজেদের এবং পৃথিবীর প্রতি তাদের ঘৃণা এতটাই তীব্র হবে যে একে অন্যের দিকে আর কখনো ফিরে তাকাতে চাইবে না তারা, চলে যাবে পরম নির্জনে।
এইভাবে বন্ধনের শেকল থেকে মুক্ত হবার পর তারা কি তাদের সেই পরম নির্জনতাকে পাবে নাকি ভালোয় মন্দয় মেশানো সেইসব দিনগুলির জন্যে আকুল হবে যখন কাঁধে কাঁধ মেলানো সৈনিকের মত একজনের পাশে আর একজন ছিল ভয়ার্ত এই বাইরের জগতের সঙ্গে একসঙ্গে লড়াই করার জন্যে?
যখন বৃষ্টি পড়ে আর গভীর রাতে তারা একসাথে শুয়ে থাকে, উষ্ণ আরামদায়ক সে শোয়া—মনে হয় না তখন পরস্পরকে মনে রাখে তারা আর তাদের ঐ অবস্থায় দেখে কেউ ভাবতে পারে যে তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় পবিত্র ভালোবাসা; একমাত্র যখন ভোর হয়, এবং ভোরের রোদে বৃষ্টি সামান্য কমে আসে তখন তারা ঘুম থেকে গা ঝাড়া দিয়ে জেগে উঠে নিজেদেরকে তখনো অপরের সঙ্গে আবদ্ধ দেখতে পায়—তাতে তারা যে স্বস্তি পায় না তা নয়, পায় সান্ত্বনাও, কিন্তু খুব শিগগিরি তারা আবিষ্কার করে সেই অনিবার্যকে এবং হাল ছেড়ে দেওয়ার অনুভূতি তাদের ভর করে, তাদের ক্লান্ত চোখে আর ভারী শরীরে ফুটে ওঠে তাদের হতোদ্যম মন।
তারা বুঝে গেছে ঘুমই তাদের একমাত্র পরিত্রাতা, এক সার্বিক মুক্তি, স্বাধীনতার যে মায়া তাদের দুজনের মনের মধ্যে গেঁথে গেছে, সেই মায়াগুলো এত বাস্তব যে তারা সর্বশক্তি দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে চায় জেগে ওঠার মুহূর্তগুলোকে, কারণ জেগে ওঠা মানেই হচ্ছে স্বাধীনতার সেই মায়াবী আকর্ষণ মুছে যাওয়ার আশঙ্কা।
যদিও তাদের সব স্বপ্ন মনোরম নয়, ঠাণ্ডা আর ক্ষুধা কখনো কখনো এমন স্পষ্ট আতঙ্ক তৈরি করে যা ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদের ভয়ে কাঁপতে বাধ্য করে।
রহস্যজনকভাবে একটা দুঃস্বপ্ন তারা প্রায়ই দেখে বলে মনে হয়, কখনো কখনো এমনকি দুজনে একই রাতে, যখন তারা পরস্পরের দিকে ফিরে দেখে তারা যেন বহুমাথাওলা দানবে পরিণত হয়েছে, যার মাথা ক্রমশ বেড়েই চলেছে; তাদের শরীর জুড়ে যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ে যখন তারা দুজনে দুদিকে যেতে চায়, যখন নিচের দিকে তাকিয়ে তারা আবিষ্কার করে যে তারা আর মাত্র দুজন নেই, হয়ে গেছে অসংখ্য তখন তাদের যন্ত্রণার আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে বাতাস।
অলোক মেহেতা একজন ব্যাতিক্রমী তরুণ চিকিৎসক। বড় হয়েছেন মুম্বাইয়ের এক সম্পন্ন জৈন ব্যবসায়ী পরিবারে। মুম্বাইয়ের সিওন হাসপাতাল থেকে এম-বি-বি-এস ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশ করে তিনি যান মহারাষ্ট্রের সিন্ধুদুর্গের এক গ্রামীণ হাসপাতালে, এরপর তিনি সারজিকাল রেসিডেন্সি হিসাবে যোগ দেন তার নিজের শহর মুম্বাইয়ের হিন্দুজা হাসপাতালে। শহরের সম্পন্ন মানুষের সঙ্কীর্ণতা ও মেকি জীবনযাত্রার চেয়ে সিন্ধুদুর্গের অতি সাধারণ গ্রামবাসীদের জীবন তার কাছে অনেক বেশী অর্থপূর্ণ মনে হয়। চিকিৎসক হিসাবে তার মনে হয় গ্রামের গরীব মানুষদের কাছে তার প্রয়োজন অনেক বেশি, শহরের ধনী মানুষদের থেকে।
মুম্বাইয়ের বিলাসবহুল স্বচ্ছল জীবনযাত্রা ছেড়ে ওড়িশার কালাহান্ডির ‘স্বাস্থ্য স্বরাজ’ নামে একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। বর্তমানে কালাহান্ডির দক্ষিণে ভবানী পাটনা থেকে ৫৫ কিমি দুরের পাহাড় জঙ্গল ঘেরা কোন্ড আদিবাসী অঞ্চলের কানিগুমা গ্রামের নতুন চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসক হিসাবে আছেন। তিনি যুক্ত হন আর এক জন ব্যাতিক্রমী চিকিৎসক, চেন্নাইয়ের ডক্টর শ্রীনাথের সঙ্গে। ইনি বহুদিন সহজ সরল কোন্ড আদিবাসী মানুষদের নিরলস সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। এই প্রাণবন্ত উজ্জ্বল মানুষটি কানিগুমা ও আশেপাশের গ্রামের মানুষের সঙ্গে মিশে গেছেন শুধু চিকিৎসক হিসাবে নয় তাদের ভালবাসার মানুষ হিসাবে, আত্মার আত্মীয় হিসাবে। অলোক সেই পথেরই ষাত্রী আজ।