সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
ভারতের উচ্চশিক্ষাসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান মূলত দু’ধরনের– হয় ইউনিয়ন সরকার বা রাজ্যসরকার প্রতিষ্ঠিত কিংবা কয়েকজন প্রতিভাবান ব্যক্তি-মানুষের দূরদর্শিতার ফসল। দ্বিতীয় ধরনের মধ্যে পড়ে হোমি জাহাঙ্গির ভাবা প্রতিষ্ঠিত টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (TIFR); জে. এন টাটার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স; পণ্ডিত মদন মোহন মালবীয় স্থাপিত বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি বা স্যার সৈয়দ আহমদ খানের আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি। পরবর্তী সময়ে আসা সরকার এইসব দূরদর্শী মানুষের স্বপ্নকে তুলে ধরতে সদর্থক ভূমিকা নিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গেও এমন দুটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান – ১৯২১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৩১ সালে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ (পিসিএম নামে পরিচিত) প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট (ISI)। পিসিএম ছিলেন ভারতের পরিসংখ্যান ব্যবস্থার স্থপতি। তাঁর জন্মতারিখ ২৯ জুন জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস হিসেবে পালিত হয়। আইএসআই ছাড়াও পিসিএম, ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভে অর্গানাইজেশন (NSSO) প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিলেন।
বর্তমানে আইএসআই–এর সদর দপ্তর কলকাতা। শাখা-কেন্দ্রসমূহ দিল্লি, ব্যাঙ্গালোর, চেন্নাই, তেজপুর এবং বহিস্থ শাখাগুলি হায়দ্রাবাদ, গিরিডি, মুম্বাই ও পুণেতে রয়েছে। বর্তমানে আইএসআই কেন্দ্রীয় সরকারের পরিসংখ্যান ও প্রকল্প বাস্তবায়ন মন্ত্রকের (MoSPI) অধীন।
প্রথম পর্যায়ে পি.সি মহলানবীশ ১৯৩১ সালে আইএসআইকে একটি বিদগ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকাভুক্ত করেন। ১৯৪৭ পরবর্তী পর্যায়ে জাতি গঠনে আইএসআই-এর অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে ভারতীয় সংসদ ১৯৫৯ সালের আইএসআই আইনের মাধ্যমে আইএসআইকে সমাজের জাতীয় গুরুত্বের প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
আজ আমরা যাকে আইএসআই বলে জানি, তা আসলে পশ্চিমবঙ্গ সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের অধীনে নিবন্ধিত একটি সোসাইটি। খুব কম ভারতীয় প্রতিষ্ঠানই আইএসআই-এর মতো করে দেশের বৌদ্ধিক পরিচিতিকে এত গভীরভাবে রূপ দিতে পেরেছে। আজ, আইএসআই একটি গুরুত্বপুর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৫৯ সালের আইএসআই আইনের স্থলাভিষিক্ত করার জন্য আনা আইএসআই খসড়া বিল, ২০২৫, প্রতিষ্ঠানটিকে তার পরবর্তী শতকের জন্য আধুনিকীকরণের উদ্দেশ্যে ব্যাপক প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে। তবুও অনেক পণ্ডিত, প্রাক্তন ছাত্র এবং পর্যবেক্ষকের কাছে এই বিলটিকে নবায়ন না মনে হয়ে বরং একটি শোকগাথা বা বিদায়-স্মারক বলে মনে হচ্ছে – মনে হচ্ছে একটি অনন্য বৌদ্ধিক ধাঁচার উপর লেখা সমাধি লিপি। এটি যেন একটি জাতির তার নিজের বৌদ্ধিক উত্তরাধিকারের বিস্মৃতি-গাথা।
আইএসআই বাংলার নবজাগরণের (১৮ শতকের শেষ থেকে ২০ শতকের প্রথম দিক পর্যন্ত বিস্তৃত উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও শৈল্পিক আন্দোলনের) মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছিল। সেই সময় বাংলার উদ্দীপিত শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মানুষজন প্রথাগত মতবাদকে নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারতেন, এবং বিশ্ব বিজ্ঞানে অবদান রাখার ক্ষেত্রে ভারতের নিজস্ব ক্ষমতায় ওপর আস্থাশীল ছিলেন। পি সি মহলানবীশ এমনই এক চেতনাকে মূর্ত করেছিলেন। একজন স্বপ্নদর্শী বহুজ্ঞানী হিসেবে তিনি বিশ্বাস করতেন যে পরিসংখ্যান আধুনিক জাতি গঠনের একটি অন্যতম হাতিয়ার। বাংলার নবজাগরণের অন্যান্য দিকপাল যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, সত্যেন্দ্রনাথ বসুদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে তিনি আমলাতান্ত্রিক বা রাজনৈতিক শৃঙ্খলমুক্ত এবং মানবতাবাদী মূল্যবোধের দৃষ্টিকোণ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ফলস্বরূপ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই মূলত পিসিএমকে নেহেরুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং এভাবেই একটি সম্পর্ক শুরু হয় যা আধুনিক ভারতকে রূপ দিয়েছিল। আইএসআই–এর শুরুর বছরগুলিতে এক অসাধারণ আন্তর্জাতিকতা লক্ষ্য করা যায়। জে.বি.এস. হ্যালভেন-এর মতো পণ্ডিত, যিনি আধুনিক বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের অন্যতম জনক, এবং আন্দ্রে কলমোগোরভ, যাঁর প্রভাব সম্ভাব্যতা তত্ত্বের গবেষণাকে রূপ দিয়েছিল, তাঁরা আইএসআই-এর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন – যা এর বৌদ্ধিক আকর্ষণের এক অসাধারণ প্রমাণ। আইএসআই কখনই নিছক একটি প্রতিষ্ঠান ছিল না। এ ছিল তারই ঘোষণা যে একটি সদ্য স্বাধীন জাতি তার ঔপনিবেশিক পরাধীনতা থেকে বেরিয়ে এসেও, বিশ্বমানের পাণ্ডিত্য তৈরি করতে করতে পারে। এখন এর স্বায়ত্তশাসন আহত করা মানে সেই নবজাগরণের চেতনাকেই প্রত্যাখ্যান করা, যা এর জন্ম দিয়েছে।
১৯৫৯ সালের আইএসআই আইন, আইএসআই সোসাইটির মেমোরেন্ডাম অফ অ্যাসোসিয়েশন (MoA), বাই-লজ (Bye-laws) এবং নিয়মাবলীকে (regulations) যথাযথ স্বীকৃতি দেয়, যা কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক দায় নিলেও এর প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করে। তবে এই স্বায়ত্তশাসন নিরঙ্কুশ নয়, কারণ আইএসআই কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন ছাড়া নিজস্ব নিয়ম পরিবর্তন করতে পারে না। এছাড়াও, আইএসআই ১৯৫৯ সালের আইন দ্বারা বাধ্যতামূলকভাবে একটি পর্যালোচনা কমিটি (Review Committee) দ্বারা পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনার অধীন। এর মধ্যে সবচেয়ে সাম্প্রতিকটি ছিল ৪র্থ আরসি, যার সভাপতিত্ব করেছিলেন আর এ মাশেলকার।
পি সি মহলানবীশ ১৯৭২ সালে প্রয়াত হন। সাধারণত, কোনো ব্যক্তিত্বের দূরদর্শিতার মাধ্যমে সৃষ্ট বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই প্রতিষ্ঠাতা- সংগঠকের মৃত্যুর পর এক পরিচয় সংকটের (identity crisis) সম্মুখীন হয়। আইএসআই ভাগ্যক্রমে অধ্যাপক সি আর রাও-কে, যিনি পদ্মবিভূষণ পুরস্কার প্রাপক এবং ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ইন স্ট্যাটিস্টিক্স (২০২৩) এর বিজয়ী (যা পরিসংখ্যানের নোবেল পুরস্কার হিসেবে গণ্য হয়), পরিচালক হিসেবে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত পেয়েছিল। অধ্যাপক সি আর রাও-এর পরে, ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৮ পর্যন্ত অধ্যাপক গোপীনাথ কল্লিয়ানপুর আইএসআই-এর পরিচালক ছিলেন। যে প্রশাসনিক কাঠামোটি আমলাতান্ত্রিক নির্দেশের পরিবর্তে সহকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক (collegiality), সমকক্ষ পর্যালোচনা (peer review), এবং পন্ডিতদের ওপর আস্থার মাধ্যমে আইএসআই কে স্থিতিশীল করেছিল, তা সি আর রাও এবং গোপীনাথ কল্লিয়ানপুরের পরিচালনাকালে পরিপক্কতা লাভ করে।
আইএসআই সোসাইটি প্রতিষ্ঠানটির আঁতুড়ঘর, এটিই প্রতিষ্ঠানটির ধারণকারী সংস্থা (holding body) হিসেবে বিদ্যমান। সোসাইটির নিয়ম অনুযায়ী প্রধানত একটি কাউন্সিল এবং ডিরেক্টর দ্বারা পরিচালিত হয়। আইএসআই সোসাইটির একজন সভাপতি থাকেন, যাঁর কার্যকাল দুই বছরের এবং এটি কাউন্সিলের কার্যকালের সাথে সাথেই শেষ হয়। এই সভাপতিকে সরকার কর্তৃক নিযুক্ত না করে সাধারণ পরিষদ (general body) দ্বারা বাইরে থেকে নিযুক্ত করা হয়। প্রসঙ্গত, বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন আইএসআই-এর অন্যতম সভাপতি।
কাউন্সিলের চেয়ারম্যান প্রথম সভায় সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হন, যে সভা সভাপতির সভাপতিত্বে পরিচালিত হয়। কাউন্সিলের ৩৩ জন সদস্যের একটি সুষম কাঠামো রয়েছে, যা নির্বাচিত এবং মনোনীত সদস্য, সরকারি আমলা এবং বিজ্ঞানীদের নিয়ে গঠিত – যা নিশ্চিত করে যে, সরকারসহ কেউই কাউন্সিলের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। ডিরেক্টরকে সরকার একতরফা ভাবে নিয়োগ করে না, কাউন্সিলের সুপারিশক্রমে ৫ বছরের মেয়াদের জন্য নিয়োগ করা হয়। ডিরেক্টর কাউন্সিলের কাছে রিপোর্ট করেন, সরকারের কাছে নয়, যা পরিচালনামূলক স্বাধীনতা (operational independence) প্রদান করে। ডিন অফ স্টাডিজ-এর সকল অধ্যাপকদের নিয়ে গঠিত অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল দ্বারা নির্বাচিত হন।
আইএসআই তার দীর্ঘস্থায়ী কোর্সগুলির জন্য কোনো টিউশন ফি নেয় না, বরং বৃত্তি (stipend) প্রদান করে। শিক্ষাগত স্বায়ত্ত্বশাসন এই ফি-বিহীন কাঠামোটিকে বজায় রাখতে সাহায্য করে। এইভাবে আর্থিকভাবে দুর্বল, মেধাবী শিক্ষার্থীরা ব্যাঙ্ক ঋণ বা অত্যধিক ফি নিয়ে চিন্তা না করে গণিত বিষয়টির গভীরে পড়াশোনা করতে পারে। আধুনিক সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, আইএসআই ব্যতিক্রম হিসেবে নতুন চালু হওয়া বাজার চালিত কোর্সগুলির (যেমন ব্যাবসায়িক বিশ্লেষণ, ডেটা সায়েন্স ইত্যাদি) জন্য কোর্স ফি চালু করেছে।
নতুন বিলটি যখন আইনে পরিণত হবে, তখন এটি আইএসআই আইন, ১৯৫৯-কে বাতিল করবে, যা ইতিমধ্যেই আইএসআই-কে 'জাতীয় গুরুত্বের প্রতিষ্ঠান' (INI) হিসেবে ঘোষণা করেছে। আইএসআই-কে একটি রেজিস্ট্রিকৃত সোসাইটি (registered society) থেকে পুনর্গঠন করে একটি বিধিবদ্ধ কর্পোরেট সংস্থা (statutory body corporate) হিসাবে তৈরি করা হবে। বিলটিতে সোসাইটির (Society) ভাগ্য নিয়ে কোনো কিছু উল্লেখ করা হয়নি। বর্তমানে থাকা ৩৩ সদস্যের প্রতিনিধি কাউন্সিলকে প্রতিস্থাপন করে একটি ১১ সদস্যের বোর্ড অফ গভর্নেন্স গঠন করা হবে।
বর্তমানে থাকা ৩৩ সদস্যের প্রতিনিধি কাউন্সিলকে প্রতিস্থাপন করে একটি ১১ সদস্যের বোর্ড অফ গভর্নেন্স (BoG) গঠন করা হবে, যা সম্পূর্ণরূপে সরকার মনোনীত হবে। নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে ভারতের রাষ্ট্রপতি 'ভিজিটর' (Visitor) হিসেবে থাকবেন।
নতুন BoG-তে থাকবেন একজন চেয়ারপার্সন, বিভিন্ন মন্ত্রকের ৪ জন আমলা, কেন্দ্র সরকার কর্তৃক মনোনীত ৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি, পরিচালক (Director) এবং ডিন অফ স্টাডিজ (Dean of Studies)।
আগের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে সকল অধ্যাপক সদস্য ছিলেন এবং নির্বাচিত ডিন ছিলেন আহ্বায়ক (Convener), আর ডিরেক্টর ছিলেন চেয়ারপার্সন। এখন, অধ্যাপকদের বাদ দেওয়া হয়েছে। ডিরেক্টরকে একটি অনুসন্ধান-ও-বাছাই কমিটির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচন করবে। আর ডিনকে এখন BoG দ্বারা নির্বাচন করা হবে। (পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চাপের কাছে নতিস্বীকার করে সকল অধ্যাপককে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে)।
এইভাবে, কেন্দ্রীয় সরকার BoG এবং পরিচালককে নির্বাচন করবে। BoG আবার ডিন, রেজিস্ট্রার, ডেপুটি রেজিস্ট্রার ইত্যাদি নির্বাচন করবে। এর ফলে, যে নিয়ন্ত্রণ পূর্বে স্বাধীন কাউন্সিলের হাতে ছিল, তা এখন পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে চলে আসছে।
১৯৫৯ সালের আইএসআই আইনে স্পষ্টভাবে কলকাতা-কে সদর দপ্তর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। খসড়া আইএসআই বিল, ২০২৫-এ সদর দপ্তর সম্পর্কে কোনো কিছু উল্লেখ করা হয়নি। যে প্রতিষ্ঠানটি কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত এবং ঐতিহাসিক ও বাংলার নবজাগরণের সঙ্গে যুক্ত, তার বিধিবদ্ধ সদর দপ্তরকে লঘু করার এই বিষয়টি শুধু ঐতিহ্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারসাম্যের (federal balance) দিক থেকেও উদ্বেগের জন্ম দেয়।
কেন্দ্রীয় সরকারের যে মন্ত্রকের অধীনে আইএসআই আসে, সেই MoSPI (Ministry of Statistics and Programme Implementation) আইন পরিবর্তনের জন্য কোনো যুক্তি দেখায়নি। এর একমাত্র উল্লেখ পাওয়া যায় প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর (PIB) একটি বিজ্ঞপ্তিতে, যেখানে তিনটি কারণের কথা বলা হয়েছে— (i) ৪র্থ আরসি (Review Committee) রিপোর্ট, (ii) আইএসআই-এর আসন্ন শতবর্ষ এবং (iii) শিক্ষাগত উৎকর্ষ, স্বায়ত্তশাসন, কার্যকর প্রশাসন ও জবাবদিহিতার ৪টি নির্দেশক নীতি।
৪র্থ আরসি-এর কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর পদ্ধতিগত এবং নৈতিক উদ্বেগ রয়েছে। কমিটি গঠনের গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে আইএসআই-এর সম্পদগুলির শারীরিক যাচাইকরণ (physical verification) বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল—যা একটি বাধ্যতামূলক বিশ্বস্ত দায়িত্ব (fiduciary duty), কিন্তু তা করা হয়নি। তৎকালীন আইএসআই-এর পরিচালককে ৪র্থ আরসি-এর সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যা স্বার্থের অন্তর্নিহিত সংঘাত (inherent conflict of interest) তৈরি করেছিল। ৪র্থ আরসি রিপোর্টে একাধিক সুপারিশ করা হলেও, আইএসআই ১৯৫৯ আইনকে নতুন আইন দিয়ে প্রতিস্থাপন করার কোনো সুপারিশ ছিল না।
প্রস্তাবিত বিলটি আইএসআই সোসাইটির বিধিবদ্ধ অবস্থান এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাকে ছিনিয়ে নিচ্ছে। খসড়া বিলটি সংসদে নিয়ে আসার জন্য সরকারি আমলাতন্ত্রের এই দ্রুততা সম্পূর্ণভাবে এই সত্যটিকে উপেক্ষা করেছে যে, শতবর্ষপূর্তি হলো আইএসআই সোসাইটির, আইএসআই-এর দেওয়া কোর্স ও ডিগ্রির নয়। আইএসআই ১৯৫৯ সালের আইনের পরেই, ১৯৬১ সালে কোর্স ও ডিগ্রি চালু করেছিল। সোসাইটিকে দুর্বল করার পরিবর্তে, শতবর্ষপূর্তিকে এর মৌলিক ভূমিকা পুনঃনিশ্চিত করা এবং অংশগ্রহণমূলক, শিক্ষাবিদ-নেতৃত্বাধীন প্রশাসনকে শক্তিশালী করার একটি উপলক্ষ হিসেবে দেখা উচিত ছিল।
বিস্ময়ের কথা, সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়ে এই খসড়া চারটি মূল দিকদর্শী নীতিকে দাবিয়ে রাখতে চেয়েছে। স্বায়ত্তশাসন (Autonomy) দুর্বল হচ্ছে BoG এবং পরিচালক ও ডিন নিয়োগের উপর সরকারের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। সরকারি আমলাদের প্রশাসনিক আধিপত্যের কারণে শিক্ষাগত স্বাধীনতার আপোশ ঘটলে উৎকর্ষতা (Excellence) ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিদ্যমান বিধিবদ্ধ সংস্থাগুলিকে, যেমন আইএসআই কাউন্সিল এবং অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলকে (যাদের শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি রয়েছে), ক্ষমতাহীন করে কার্যকর প্রশাসন (Effective governance) অর্জন করা যায় না। শিক্ষাবিদদের নিয়ন্ত্রণ এবং সমাজের তত্ত্বাবধানকে (community oversight - যা বর্তমানে ১৯৫৯ সালের আইনের অধীনে বিদ্যমান), সরিয়ে দিয়ে জবাবদিহিতা (Accountability) উন্নত করা যায় না।
সুতরাং, এটি বোঝাই যায় যে এই পরিবর্তনগুলি একটি বিশ্বমানের অনন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে, তার পূর্বনির্ধারিত পথের বিপ্রতীপে, একটি সাধারণ সরকার-পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করতে পারে।
অধ্যাপক, ছাত্র, কর্মী, প্রাক্তন ছাত্র, গবেষক এবং নাগরিক সমাজের কণ্ঠস্বর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে এই বিলটি আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আইএসআই-এর আত্মাকে (soul) বিপন্ন করছে। খসড়া বিলটি অসঙ্গতিপূর্ণভাবে এবং অত্যন্ত দুর্বলভাবে তৈরি করা হয়েছে। বিলটি কিছু জায়গায় অতিরিক্ত বিস্তারিত বিবরণ দিলেও, অন্য জায়গায় খুব কম কথা বলেছে, যার ফলে এতে সম্ভাব্য অস্পষ্টতা এবং জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। আইএসআই সোসাইটি, আইএসআই কাউন্সিল, আইএসআই-এর শিক্ষক ও কর্মীদের সাথে খসড়া বিলটি নিয়ে কার্যত কোনো আলোচনা করা হয়নি।
BoG এবং অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের উপর আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের কারণে, শিক্ষাগত ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন হারানোর একটি বাস্তব উদ্বেগ রয়েছে। আইএসআই-এর সদর দপ্তর হিসেবে কলকাতার মর্যাদা এবং প্রতিষ্ঠানটি গঠনে এর কেন্দ্রীয় ভূমিকা ও ঐতিহ্য ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইএসআই-কে অপরিবর্তিত রাখার দাবি করা অবাস্তব। তবে সংস্কার হতে হবে নিরাময়মূলক, ধ্বংসাত্মক নয়। ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে ভালো পথ হলো ১৯৫৯ সালের আইএসআই আইনটি সঠিকভাবে পাঠ করা এবং বোঝা। এই আইনটি কেন্দ্রীয় সরকারকে এর MoA, বাই-লজ এবং নিয়মাবলী পরিবর্তন করে আইএসআই-কে আধুনিকীকরণ এবং সংস্কার করার যথেষ্ট সুযোগ দেয়।
ভবিষ্যতের পথ এমন হওয়া উচিত যেখানে আইএসআই-এর সোসাইটির কাঠামো বজায় থাকবে এবং কাউন্সিল ও অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলকে শক্তিশালী করা হবে। এই বিষয়ে আইএসআই-এর শিক্ষক, কর্মী, প্রাক্তন ছাত্র এবং শিক্ষার্থীদের সাথে একটি স্বচ্ছ আলোচনার সূচনা করতে হবে।
যে জাতি তার বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যতে আত্মবিশ্বাসী, সে স্বশাসিত পাণ্ডিত্যকে লালন করে। আইএসআই একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠান যা ভারতের বৌদ্ধিক আধুনিকতা এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। ভারত যদি জ্ঞানের নেতৃত্বে আসতে চায়, তবে তাকে সেই পাণ্ডিত্যপূর্ণ স্বাধীনতাকে সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করতে হবে যা আইএসআই-কে সম্ভাবিত করেছিল। যে প্রতিষ্ঠানগুলি তৈরি হতে এক শতাব্দী লেগেছিল, তা একটি সংসদীয় অধিবেশনে নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং সেগুলিকে পুনর্নির্মাণ করতে কয়েক প্রজন্ম লেগে যেতে পারে। প্রশ্নটি এই নয় যে আইএসআই-এর পরিবর্তন হওয়া উচিত কি না। প্রশ্নটি হলো, এই পরিবর্তন এটিকে সমাহিত করবে নাকি তার নবায়ন করবে।
(1) Derek O’Brien, “Stifling autonomy, one institute at a time”, Column, Indian Express, December 6, 2025. Accessed on Dec 7, 2025.
https://indianexpress.com/article/opinion/columns/stifling-autonomy-one-institute-at-a-time-10404984/
(2) ISI website
(3) https://sites.google.com/view/isibill2025