সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
হন্তদন্তপ্রায় দ্বিজপদ ঘরে ঢুকেই হাত বাড়িয়ে সুইচ বাজালেন, টিপ বোতামি ইলেকট্রনিক রেগুলেটরের কান মুচড়ে তুললেন শেষ গিয়ারে, মান্ধাতাকেলে সিলিং ফ্যানটা জান লড়িয়ে কাঁচক্যাঁচাচ্ছে, বসে পড়লেন ধপাস হাতলওলা হেলান চেয়ারটায় নোটিস ছাড়াই যেটা তারই জন্য সংরক্ষিত, হাঁপাচ্ছেন, শান্ত হতে সময় খাবে।
একটু ধাতে ফিরছিলেন, তখনই, হঠাৎই তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, কেমন আঁধার মনে হয়, ঘরের চার দেয়াল এক পা এক পা গুঁড়িসুড়ি মেরে এগুচ্ছে, ইচ্ছে তাকে চেপে ধরবে। বেদম অনুভূতি জাগে গলার নলীতে, ঘোরের ধাক্কা, ঠিক ভয় নয়, অদমনীয় অসোয়াস্তি।
কেন যে এমনটা মাঝে মাঝে হয়!
চোখ ঠিক আছে- দু চোখের ছানিই কেটে পরিষ্কার, চশমার পাওয়ার গেল মাসে চেকআপ করেছেন, ফি মাস মিউনিসিপ্যালিটির ক্লিনিকে গিয়ে রক্তের চাপ মেপে আসেন - ডাক্তারটি মহিলা। হাসেন, একেবারে নর্মাল, কাকাবাবু। এ বয়সে এরকম পারফেক্ট দেখতেই পাই না। যাপন মিত, চিনির হানা নেই, ইসিজি রেখা সরল।
তবু কখনো কখনো ঘরে ঢুকলে, কী চেয়ার হেলালে টুপ করে আঁধার নেমে আসে, হাঁপ বেস্টনী দেয়। আর ওই চার দেয়াল হামলা চালাবে বলে এগোতে থাকে। ভাবেন ওটাকে ঠেলে দূরে সরানো দরকার, ঠেলবেন ভাবেন, কিন্তু.......
একক্ষণে চোখ সাদা হলো, দেয়াল ফিরে গেছে চেনা ভিতে। নিরাপত্তা বোধ করলেন দ্বিজপদ। জোরে রেচনক্রিয়ার মতো নিঃশ্বাস ফেললে দেহভার মনোভার দুইই হালকা লাগে। এবং সঙ্গে সঙ্গে কর্তব্যকর্মটি তার মনে পড়ে যায়।
প্রোটোকল। এমনি কলঘরে গিয়ে পাঁচ মিনিট জলজল পা ধুতে হবে, আ-কনুই হাত সাবানফেনায় কচলাতে হবে-অন্তত কুড়ি সেকেন্ড, নাক মুখ ঢেকে নিজেকে গোপন করার কৌশল মুখোশটি সাবানে ধুয়ে মেলতে হবে রোদ্দুরে - অন্তত চার ঘণ্টা সেখানে। বিড়বিড় করলেন দ্বিজপদ- তুমি মরো ক্ষতি নেই, কিন্তু অপরকে মারী ছড়িয়ে নিজে বেঁচে থাকবে এ কেমন রীত সভ্যজনের! হ্যাঁ বাবা, প্রোটকল! এ বিশ্বের সকল মানুষের কল্যাণার্থে মেনে চলো। নইলে তুমি অমানবিক।
আবার দেওয়ালে নজর পড়ল। ক্ষেত্রফল জুড়ে কিলবিল করছে অতিমারীর বীজ। আহা, কী সুন্দর! যেন ভগবান ব্র্যান্ডের কোনো বাচ্ছা বসে আঁকো কম্পিটিশনে বসেছিল, খেয়ালিতন্ত্রে এই বর্ণসুষম শিল্পটি সৃজন করে বসেছে করে বসেছে। দেয়ালগুলো কোটি বিষ নিয়ে হাঁ-মুখ এগুচ্ছে তার দিকে। বীভৎস। ছুট লাগালেন বাথরুমে।
চন্দন এসে বসেছিলো ঘরে। চেনা সবকিছুই, তবু আরেকবার জমিনে নিরীক্ষণ করে নিতে চায়।
আসবাব বলতে দেড়া মাপের একখানা চৌকি, বিছানা পাতা, চাদরঢাকা। দরকারে দুজন বাধ্য শুলে একজন পড়ে যাবে ভয়ে নিশ্চিত ঘুমোতে পারে না। দুটি অতিরিক্ত না-হাতলি পলিমার চেয়ার, লোকজন বসে, দুইয়ের বেশি হলে চৌকি ভরসা, প্রায়ই এমন জমায়েত ঘরে হয়ে থাকে। একটা টেবিল, পুরনো খবরের কাগজের কভার, তার উপরে দুতিন দিনের বিশেষ দৈনিক ভাঁজ করা, কয়েকটা পুস্তিকা, একটা আদ্যিকালের টাইমপিস, চাবির দম ও তেল সাপলাইয়ে দ্বিজপদ সচল রেখেছেন, একটা ছোটো র্যাক, সাজানো গোটাচারেক উপন্যাস, সংস্কৃতির রূপান্তর, লোকায়ত দর্শন, সঞ্চয়িতা ও রাশিয়ায় ছাপানো বাংলা তর্জমায় পুঁজি। দেয়ালে দুলছে ছবি ছাড়া তারিখপঞ্জি একাধারে, অন্যধারে ফ্রেমে বাঁধানো ভোলার সোনার হাঁতের আঁচড়ে নৈবেদ্যর চারছত্র- চিত্ত যেথা ভয়শূন্য.....।
দ্বিজপদ ফিরে চন্দনকে দেখে খুশি হলেন, ভাবটা বাইরে ছড়ালেন না। ভাবলেন, ওর মতো জ্যান্ত জোয়ানের শ্বাসের কামরাটাকে উজ্জীবিত করবে, -- কখন এলি? - বললেন তিনি।
চন্দন জবাব দিলো না, বরং দ্বিজপদের দিকে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। ভিতরে যে উসখুসানিটা খোঁচা মারছে, কিছুতেই খোলসা হতে দেয়া যাবে না। দ্বিজপদের মতো মানুষগুলো তার বিস্ময় ও সংকটের গ্রন্থি, এমনকী ছোটোখাটো অপছন্দও কখনো সখনো। রীতিমতো আঁটসাট কৌশলী জারিজুরিতে নিজের যেন গা-মাপ আলখাল্লায় মুড়ে ফেলেছে চন্দন।
দ্বিজপদ গোপনে মুচকি হাসির টুকরোটি ব্যয় করলেন, মনকে বললেন, বেচারি। ওর মতো কতো যুবকযুবতীর বুকের ভাষা আমার সিন্দুকে লালশালুতে মুড়ে রেখেছি, ও কোথাথেকে জানবে?- চৌকির উপরে রেখেছিলেন ঠোঙাটি। চন্দনের হাতে ধরিয়ে বললনে,- বাবার জন্যও একটা রেখে দিতে বলিস। জানি না সায়েব ফিরে এমন ছোটোলোকী খাবার চাখবেন কিনা!
চন্দন ঠোঁটকানা হাসলো। যাক, ব্যাপারটা তেমন গুরুতর নয়। ঠোঙা খুলে দেখে ভিতরে শোনপাপড়ি, ফেরিওলারা গলায় টিনের বাকাসো ঢুলিয়ে সেগুলো বেচে। ছুরি কেটে দুধসাদা চিনকাগজে জড়িয়ে দেয়। দিশি হালুইকরের দিশি ভিয়েনে তৈরি, ঝাঁটার কাঠির মতো শল্ আর গুড় জ্বেলে সেই স্বর্গলোকের গন্ধ, প্যাকেট প্রোডাক্টে যার খোঁজ মেলে না। চন্দন ভিতরের টুকরোগুলো গুণতে থাকে।
- কী হলো? কী ভাবছিস? এতগুলো টাকা খচ্চা করলাম। আরে আমার টাকা ব্যয় হচ্ছে কোথায়? সবই যে জমছে তোর মায়ের ঘটে। মরলে বেঁধে চিতায় তুলে দিবি। ডিউটিটা তোকে দিয়ে রাখলাম।
সত্যিই দ্বিজপদের টাকাটা সঞ্চিত হচ্ছে। পরিমাণ এখন কতটা হিসেব করা হয়নি। করণীক্রিয়া তার ধাতেও নেই। এবং অবশ্যই হিসেব করবেন না কোনোদিনই, তিনি নিজের কাছে শপথবদ্ধ। শপথ শব্দে তিনি কেমন এতটা জোর পান, মনে পড়লেই হাত মুঠো হয়ে ওঠে, আপনা আপনি কাঁধের উপরে উঠে বাতাসে ধাক্কা মারে, ছুঁড়ে মারতে ইচ্ছা করে।
তবু মাঝে মাঝে যে টাকাটা আসে তা সামান্যই। দলের হোলটাইমার বলে কথা। হঠাৎ ঘিঁচ ধরলো দ্বিজপদর। সত্যি তো। আছেন, নাকি ছিলেন। শেষে দুটাই মনে হয় ঠিক। ষাট বছর হয়ে গেলো। দল পাঠালো তাকে এখানে। স্বপ্নের পালতোলা দলের নৌকোটি তখন ভেঙে দু টুকরো। তিনি নতুন দলে। খেত আর মজুর মিস্ত্রি বাড়ি থেকে দলে ভেসেছিলেন। তখন বছর পঁচিশের তাজা জোয়ান, কলেজ ছেড়েছেন টাটকা। দলের নিজস্ব পাঠকোষে শানানো। দ্বিজপদ টুসুক হাসছেন। দেখতে দেখতে পঁচাশি বছরের তরুণ এখন। সেদিন দলের মাথারা সনাতনী ছাতার ছায়া ছেড়ে বেরোতে রাজি নন। নতুন দল যেন মাঝিপালানো ভাঙা নৌকো। আঙুলের ফাঁক খসে গলে যাবে এমন টালমাটাল উদ্বেগ দলের। দল বলেছিলো, এই এলাকাটায় দলের গাঁট তেজানো ছিলো। সেটাকে দখলে রেখেছে সনাতনীরা। একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। শপথ। মুঠোহাঁকা শপথ। সেটুকু মূলধন বুকে ভরে দ্বিজপদ আবির্ভূত হলেন। নয়া ভেলায় পাল খাটানো পরে হবে। ভেবেছিলেন আগে তো ভাসুক। পেয়েছিলেন ওঁরই মতো আনকোরা দুই সঙ্গী-ভোলা আর সমরেন্দ্রকে। ভোলা কলকাতা আর্ট কলেজের নাবিক, শেষ পরীক্ষাটা দেওয়ার আগেই সব ছেড়ে দলে আসে। ছবি আঁকতো অপূর্ব, পোস্টার লিখলে চোখ সেঁটে থাকে। সেকালের হোমিওপ্যাথি পাশ সমরেন্দ্র এখানে নিজের জমা টাকায় এক বাড়ির বারান্দা ভাড়া করে চেষ্টা করেছিলো। পশার জমেনি, সেটা ওর ইচ্ছেও ছিলো না তেমন। পার্টি অফিসটাই তিনজনের সংসার, এক কোনে দমস্টোভে রান্না, খাওয়া বড়ো একটি চৌকিতে বিছানা, ঘুম, মাদুর পেতে অন্যদের সাথে সভাটভা, কত যে টুকিটাকি কাজ, রাস্তায় ঝঞ্ঝাট , জুলুম, পুলিশ, লাঠির বাড়ি, হাজত, জেল কত যে শেষ আছে নাকি! তিন জনের যেন এক যুদ্ধ। দ্বিজপদ বারবার সেই স্মৃতি ফিরিয়ে এনে সুখ চিবোন।
সেই ভোলা একদিন দল ছেড়ে দিলো। চলে গেলো ক্র্যাচভর পা-কাটা বৃন্দা মুখার্জির কাছে। যে ভিন পার্টির লোক বলে এলাকায় খ্যাত। পুলিশের গুলি খেয়ে গ্যাংগ্রিন, পা বাদ দিয়ে জীবন রক্ষা। বৃন্দাবনের পানের দোকান, পিছনে শোওয়ার ঘর, একা মানুষ। ভোলাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। আশ্রয়! ভাগ্যিস! নইলে ওকে না খেয়ে মরতে হতো। আচ্ছা, ভোলা দল ছাড়লো, নাকি দল তাকে তাড়ালো? কতগুলো শোনা কথা, গুজব, ছিল অভিযোগ। সরগরম সভায় মুখে মুখে আগুনের বিস্ফোরণ ছিলো। ভোলা কেঁদে ফেলেছিলো সে মিটিংয়ে, অসহায় চোখে দ্বিজপদের মুখে আশ্রয়ই খুঁজছিল সে। হোলটাইমার দ্বিজপদ, ম্যাজাইনো-লাইনের সৈনিক, কিছু বলতে পারেননি। দলীয় আগুনের তেজাল ভাপে কষ্টকে পুড়িয়ে দিচ্ছিলেন তখন। সমরেন্দ্র দল ছাড়লো এক স্কুল দিদিমণির প্রেমে ডুবে, শেষে বিয়ে করে। ওদের ছেলে এখন বিদেশে থাকে, দুনিয়া জুড়ে নামডাক। সমরেন্দ্ররা থাকে কাছেই অন্য এক শহরে। ওদের জীবন বদলে গেছে। দ্বিজপদর সঙ্গে কোনো যোগ নেই। অথচ ও তো শত্রুশিবিরে যায়নি। তবে? দলে সমরেন্দ্রের নাম আনলে যেন গঙ্গাজল তুলসিপাতা মুখে ছুঁইয়ে শুদ্ধ করতে হয়। কেন? খোঁচা মারলেও দ্বিজপদ ও প্রশ্ন উসকে তোলেননি। পারেননি। ম্যাজাইনো লাইনের পদাতিক সেনার এইই হাল। জানকবুল মরা ছাড়া পালাবার পথ নেই। দেয়ালের দিকে নজর গেলো দ্বিজপদর। চোখে আবার ধাঁধা লাগে। দেয়াল এগুচ্ছে, চেপে ধরবে। তারপরই বুঝলেন চন্দন আছে ঘরে, কেউ থাকলে এসব হয় না।
দ্বিজপদ ভাবতে থাকেন, সেদিন দল শিশুই। আনকোরা একপাল যুবক যুবতী, লাগোয়া আধাগাঁয়ের চাষবাড়ির। আর এই শহরের একমাত্র ফ্যাকটারিটার মজুর, অসংস্ক্ৃত বোধ আর টলটলে আবেগ ভরা বুক তাদের সম্পত্তি। সুবিধাভোগী জেন্টুদের কয়েকজনও ভিড়েছিলো। দ্বিজপদর টিঁকে থাকার জন্য ছিলো ্ ওই মাসোহারা। নাম কা ওয়াস্তে। তারপর দল বড়ো, বিশাল হলো, ক্ষমতা আর আধিপত্যের বারান্দায় পা পড়লো। শহরের প্রত্যেকটা ল্যাম্পপোষ্ট দ্বিজপদের প্রিয় রঙের বসন পড়েছে। তাল মিলিয়ে তাঁর মাসিক পাওনাটিও বেড়েছে।
তাঁর সেই দল যেন অবশেষে লাটে উঠলো, মাইক্রোসকোপের স্নাইডেও ছাপ মিলছে না। দলের ভাঁড়ারে টান, কমেছে মাসের দেয়। দলের দেয়ালে ফিসফিস কথা, দ্বিজপদর মাসোহারার যুক্তি নেই। আজীবন কর্মী, তাই একটা পেনসনের মতো ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। তা ছাড়া তাঁর তো তেমন প্রয়োজনও নেই। তিনি তো আত্মীয়স্বজনের মাঝেই আছেন। কাজেই...
জেঠু, তুমি বেরোবে না কিন্তু, আমি মাকে এটা দিয়ে আসছি।
- উ! - এতক্ষণে চমক ভাঙলো যেন দ্বিজপদর ছেলেটার অস্তিত্বই যেন ভুলে বসেছিলেন।
-আর, শোনো, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে, অনেক কথা।
এখন ফাঁকা ঘরে দ্বিজপদর ভয় ভয় লাগছে, ছেলেটার আদবটা কেমন রহস্যজনক। কথা বলে কম, অকারণ উচ্ছ্বাস নেই, আবেগ নেই, কাঠ কাঠ কিন্তু যুক্তির পর যুক্তি ঠেসে রাখে অন্যদিকে এড়িয়ে যাওয়াক চেষ্টা করলে রুখে দাঁড়ায়, একরোখা,তাক কষা গণ্ডারের মতো-'পালাবে না, জেঠু, জবাবটা দাও' বলে তখন। একবার হোমওয়ার্ক করে নিতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু ভিতরে ভিতরে তৈরি হওয়ার জন্য বিষয়টা যে আগে জানা দরকার। এরকম ইমপ্রম্পচু! কাতর চোখে দেয়াল দেখলেন দ্বিজপদ। এর চেয়ে বুড়ি ভালো, মিষ্টি মেয়ে, মায়ের মতো আশ্রয় দেয়, লড়াইয়ে ডাকে না।
মায়ের কথায় দলের অন্দরের মন্তব্য দুধের সরের মতো জাগলো, তিনি আত্মীয়স্বজনের মধ্যে আছেন। তাঁর বিশ্বাসে স্বজন যে সব ্মানুষই, কিন্তু আত্মীয় কথাটায় যে বিশেষ আছে। যৌবনে চাকর হবেন না স্থির করে, দেশ-কাল-সমাজ-ব্যক্তি বদলে দেবেন এই অটলতায় আত্মীয়ের ঘেরাটোপ ছিঁড়েছিলেন। মিথ্যে নয় তখন বুক ভরী নিঃশ্বাস জ্বালা দিয়েছিলো, দমিত কষ্ট গিঁটে গিঁটে ক্লেশ দিয়েছিলো। তারপর সেই আত্মীয়জনের অদেখ রশি দূর অতিদূর হয়ে বিলীন হয়ে গেছে।
উকিল সায়েব, চন্দনের বাবা, তখন পার্টিদরদী, মামলা মোকদ্দমায় সাহায্য করতো কম খরচে। দরদী কথাটা দ্বিজপদের ভালো লাগে, অন্যরা ভারী করে সিমপ্যাথাইজার বললে কেমন উষ্মা জাগে। মনে হয় হৃদয়হীন অক্ষর খোঁদানো, যদিও খেদ কী উষ্ণতা, তিনি প্রকাশ করতে শেখেননি। সেই উকিলসায়েব পার্টি অফিসের তক্তপোশের বিশ্ব থেকে তাঁকে টেনে হিচড়েই নিয়ে এসেছিলেন এই খাস কামরায়। তখন শরীরটা খারাপ যাচ্ছিলো দ্বিজপদর।
-দ্বিজুদা, এখানে পড়ে পড়ে মরবেন? কোনো মানে হয়? সন্নিসি হওয়াটাও একটা ভড়ং। আপনাকে দলের দরকার। চলুন।
কোথায়?
আমার বাড়ি।
- কিন্তু
কিন্তু নয়। আশ্রয় দিচ্ছি না। রীতিমতো পেয়িং গেষ্ট। সবার সঙ্গে কথা বলে নিয়েছি। আমি উকিল, দ্বিজুদা। ফেলো কড়ি, মাখো তেল। উঠুন। আপনাকে দলের দরকার।
সেই থেকে। এই বাড়ি এই ঘর। সেদিন আশ্রয়দাতা একা জোয়ান। তারপর বউমা এলো। চানু বুড়ি এলো। চন্দনের বয়সই তিরিশ ছুঁই ছুঁই। বুড়ি কলেজে যায়। দ্বিজপদ কর গোনেন, সময় হিসেব করেন।
তবু কি তিনি ওদের আত্মীয় হয়ে উঠতে পেরেছেন? কোথাও আড়ালের পর্দা টেনে বসে নেই তো? নিজেকে খুঁড়ে খুঁড়ে হঠাৎ বিবাদ জাগলো। এটুকু বন্ধনই গড়তে পারেননি। অথচ জগতের সকলের সঙ্গে নিজেকে বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
তাহলে এটাই বুঝি সত্যি দ্বিজপদ একা। ভীষণ একা। একদিন রাস্তাজোড়া মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে পাশের পায়ে জুতোর ফুলকি ছড়াচ্ছিলো সদা কৈশোরের বেড়া ডিঙিয়েছিলো যে মেয়েটি, তাকে বড়ো মন চেয়েছিলো। দল সম্মতি দেয়নি। আর এক নেতাকে বাহুবন্দী করেছিল সে, তারপর দুজনেই দলের সুতো ছিঁড়ে চলে গেছে। এখন কেন যে সেই হারানো রূপের রেখাটি মনে ভাসলো। চন্দন কি সেটা জেনে ফেলেছে নাকি! কচি বয়স, বুড়োর রোমান্টিক গাথার টান থাকা আশ্চর্যের নয়। দ্বিজপদ জীবনের হেলে পরা বেলায় এক চরম একার মুখে এসে এমনিভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন।
চন্দন ঢুকলো, হাতে দুটি প্লেট, ধরো তোমারটায় একটা, আমার দুটো। ভেদনীতির জন্য মা দায়ী, আমি না।
হাসলেন দ্বিজপদ, ভেদনীতি যদি ব্যবস্থাটাকে ঠিক রাখে, তবে সেটা হিতকর। নে বস, বসে বল কী বলতে চাইছিল।
-আগে খাও।
শোনপাপড়ির শেষটুকু জিভের তরলে গলা বেয়ে নামার সময় অমৃত ক্ষরণ করে, চিরকালই। আড়চোখে চেয়ে বুঝলেন, ছেলেটা লাইন অব ম্যাজাইনের ঘুঁটি গুছোছে। দ্বিজপদও লাইন অফ ডিফেন্স সাজিয়ে নিলেন।
চন্দন হঠাৎ খেই হারায়। সাজানো কথাগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
-কী রে, বল।
-আচ্ছা, জেঠু, তুমি ওরকম ছুটছিলে কেন? রাস্তা দিয়ে?
প্রথম আক্রমণটা এইদিক দিয়ে এলো। দিজপদ পাশ কাটালেন, ছুটছিলাম কোথায় রে। একটু জোরে হাঁটছিলাম।
-উঁহু। আমি তোমায় পেছন পেছন ডেকে ধরতে পারিনি। তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?
দ্বিতীয় গোলাটাও প্রায় নিরামিষ। বললেন, না রে ঠি-ই-ক আছে। একটু হাঁপ ধরেছিলো, তাই ঘরে ফ্যানটা জোরে ঘুরিয়েছিলাম। এই তো।
-ওই ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্পের সামনে ছোকরাগুলো বসেছিলো। তোমাকে কিছু বলেছে ওরা? এতদিন ওদের কথা বলতে দাওনি, এখন মোরগা অন্যটানে তেরচা। সুযোগ। অপমান করেনি তো, তোমায়?
কে তাঁকে অপমান করবে! দ্বিজপদ এলাকায় সম্মানীয় মানুষ। রাস্তায় গলিতে দেখা হলে হয় নমস্কার নয় সম্ভ্রম তিনি অযাচিতই পেয়ে থাকেন। বুজুর্গ নাগরিক। ট্রেনে উঠলে কেউ না কেউ বসার আসন ছেড়ে দেয়। এমনকী উল্টোজনের চেলাগুলো যখন তাঁকে দেখে বেশিরভাগ উগ্রতা উদকে তোলে। তিনি বোঝেন বাস্তবে তাঁর অস্তিত্বটাকে উড়িয়ে দিতে পারে না বলেই এই বাড়াবাড়ি।
-তুমি কিছু চাপছো। খুলে বলো, নইলে বাবাকে বলবো। মাও বলছিলো তেমার শরীরটা আজকাল....।
কারণটা ওই রক্তদান, মণ্ডপ কী ছেলেপুলের দল নয়। ম্যাপাপের পাশে বস্ত্রালয়, সামনে কয়েকটা টুল, বসে ছিলো কয়েকজন, দ্বিজপদ মুখ চেনা দীর্ঘদিনের, হাতে সকালের কাগজ, হেডলাইনে গরমখবর-দ্বিজপদের দলের তিন তরুণ নেতা উলটো দলে ভিড়ে গেছে। দল ওদের বলেছিলো আগামি সুর্যোদয়ের মুখ, স্বপ্ন দেখছিলো শিগগিরই, হয়তো একটু পরে ......। টুলে বসা লোকগুলো জিগ্যেস করেছিলো-
কেন এরকমটা হলো দ্বিজুদা এসব অন্য দলে হয় জানতাম। জবাব ছিলো না দ্বিজপদর। হেরে যাওয়ার ভয়ে মুখ লুকাতে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছিলেন। চন্দন দেখে ফেলবে ভাবেননি।
চন্দন উঠে দাঁড়িয়েছে, জানালায় পিঠটাকে যেন হেলানে বিশ্রাম দিলো, তারপর যেন সে ইন্দ্র, বজ্র তাক করেছে বৃত্রের দিকে এমন ভঙ্গি- শোনো, জেঠু তুমি কখনো কারো মুখে খাড়া দাঁড়াওনি, বুক চিতিয়ে কী চোখ সোজা রেখে, পালিয়েছো, তোমার দলের কথা পাখিপড়া অজুহাতের ঢাল বানিয়েছো, নিজেকে ঠকিয়েছো, ঠকাচ্ছো, জানতে, কিন্তু বুঝতে চাইতে না। তাই তুমি তোমার আজ ফেরারি পালাবে যে আজ গুহা কোথায়?
কী কঠিন। দ্বিজপদ চোখ বন্ধ করে গাঢ় শুনছিলেন। অবশেষে বিলাপের মতো বলতে পারলেন, কতবার বলেছি, এ কঠিন সময়ে আবার বলছি তোরা পার্টির কাজে আয় নিজেদের কাজে প্রাণের উত্তাপে ঠিক করে নে, তোরা এলে....।
চন্দন দ্বিজপদের পায়ে আসে। হাঁটু গেড়ে বসলো, তার উরুতে দুহাত রাখলো, এতদিন অপরাজেয় মানুষটাকে মাটিতে ফেলে কী কষ্ট হচ্ছে ওর?- জেঠু তোমার, তোমাদের ভুল ছিলো, পাড় ভাঙা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো অগুন্তি। ক্ষমা করা যায় ?তোমাদের বিশ্বাসও ছিলো, তোমরা বুক ফুলিয়ে অটল বলতে, পাহাড় চুড়োর মাপে গর্ব করতে। আমাদের কোনো ভুল নেই । সব ঠিক। আমাদের বিশ্বাসও নেই। আমরা ফাঁপা, বিলকুল।
-চানু- ভিতর থেকে ডাক, জেঠুর চা-টা নিয়ে যা, বাবা।
দ্বিজপদ দেখলেন চার দেয়াল, এগোচ্ছে সামনে। তিনি কি কলেজে পড়া গল্পের হিংস্র দুঃখী রাজা যে পাহাড় থেকে বিষজঙ্গল ধেয়ে আসছে তার দিকে। দু হাতে ঠেলে সরানো দরকার। এখনি কিন্তু তিনি যে পঁচাশি শরীরে পুরনো তাকত নেই। কে ঠেলবে! প্রচণ্ড হাঁপাতে লাগলেন দ্বিজপদ।