সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
মহাত্মা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং বিশিষ্ট পণ্ডিত অধ্যাপক নির্মল কুমার বসু গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহাত্মা গান্ধী ভিজিটিং প্রফেসর হিসাবে দুটি পর্যায়ে মোট বারোটি বক্তৃতা করেন ১৬ ডিসেম্বর ১৯৬৯ থেকে ১১ জানুয়ারি ১৯৭০ এর মধ্যবর্তী সময়কালে। এই পর্যায়ে দশম বক্তৃতার শিরোনাম ছিল ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব ও দেশভাগ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে এই বক্তৃতামালার উদ্বোধন করেছিলেন ‘সীমান্ত গান্ধী’ খান আব্দুল গফ্ফার খান। বক্তৃতাগুলি Gandhism and Modern India শীর্ষক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়।
১৯৪২ সালের ৭ আগস্ট বোম্বেতে সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যে বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হলে কী কী করতে হবে সে সম্পর্কে খসড়া নির্দেশিকা প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু পরের দিন সকালের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের প্রায় সকলকেই গ্রেপ্তার করা হয়। এইভাবে তাদের আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জনসাধারণ অসংগঠিত বিদ্রোহে ফেটে পড়ে। বিভিন্ন জায়গাতে রেললাইন এবং টেলিগ্রাফ যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, নিরস্ত্র জনতা শান্তিপূর্ণভাবে, সুশৃঙ্খলভাবে বিভিন্ন স্থানে অবরোধ আন্দোলন শুরু করে বা থানা দখল করে। মেদিনীপুর জেলার মতো প্রত্যন্ত জায়গায় 'একটি জাতীয় সরকার' প্রতিষ্ঠিত হয়, যে সরকার ব্রিটিশ শাসকের নজরদারি এবং অকথ্য অত্যাচার ও দমন-পীড়ন সত্ত্বেও তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তার অস্তিত্ব বজায় রাখে।
এই আন্দোলনের সময় ভারতের বেশ কিছু অংশে সাধারণ মানুষ এক ধরণের অভূতপূর্ব সাহসিকতার নিদর্শন রেখেছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন, অনেকে আহত হয়েছিলেন তবুও কিছু সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত হয়ে থেমে গেলেও পরক্ষণেই মিছিলের পর মিছিল চলতেই থাকত। সেই বীরত্বের গাথা দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুখে মুখে প্রচার করা হত। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং অন্যান্য স্থানেও একই রকম ঘটনা ঘটেছিল।
তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের নিজস্ব প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই সময় ৬০,০০০-এরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, ১৮,০০০ জনকে কারাগারে বন্দী করা হয়েছিল এবং ৯৪০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। তাছাড়া ১,৬৩০ জন গুলিতে আহত হয়েছিলেন। কিন্তু এর উল্টোদিকে সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ শাসকদের প্রতিনিধি বা পুলিশ মিলিটারিকে আক্রমণ করেছেন বা তাদের কাউকে হত্যা করেছেন, এমন কোনও রেকর্ড নেই।
তবে একটি বিষয় এই ক্ষেত্রে ঘটনাক্রম থেকে স্পষ্ট করে বোঝা যায় যে ভারত-ছাড়ো আন্দোলন শুরু হওয়ার আগে নিজেদের অসহায়ত্ব বা জাপানিদের প্রতি গোপন প্রশংসার অনুভূতি, যা জনমনকে কলুষিত করেছিল, তা এখন সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এই আন্দোলনে হয়তো অনেক ক্ষেত্রেই পরাজিত হতে হয়েছে, কিন্তু উত্থিত জনগণের যূথবদ্ধ শক্তি ক্ষণিক পরাজয় সত্বেও তাদের নিজেদের মনোবল পুনরুদ্ধার এবং সংরক্ষণে সফল হয়েছিল। নিশ্চিতভাবে এই উজ্জ্বল উদ্ধার কোনও ছোটখাটো অর্জন ছিল না। (বসু ১৯৬২, ২৩৮-২৪০।)
সারা পৃথিবীব্যাপী জটিল ও সংকটময় সেই মুহূর্তে ব্রিটিশ সরকার ভারতের রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করে। এই উদ্দেশ্যে প্রথমে একটি সংসদীয় প্রতিনিধিদল এবং তারপরে পর্যাপ্ত ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সুগঠিত ‘ক্যাবিনেট মিশন’ পাঠানো হয়েছিল। এই দল ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে ভারতে আসে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কেন্দ্রে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে অংশগ্রহণ করতে ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলিকে সহায়তা করা এবং তারপরে একটি গণপরিষদ প্রতিষ্ঠা করা যে গণপরিষদ ভারতের ভবিষ্যত সংবিধান প্রণয়ন করবে। এরপর অবশেষে ব্রিটিশ সংসদ কর্তৃক ক্ষমতা ভারতীয়দের হাতে হস্তান্তর করা হবে এবং সবদিক থেকে সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে।
আবার গণপরিষদের ক্ষেত্রে অন্য আরো একটি প্রস্তাব ছিল। সে প্রস্তাবটি হলো ভারতের প্রদেশগুলিকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হবে। যথা প্রদেশগুলিকে এ, বি এবং সি, তিনটি প্রকারে বা তিন ধরণের প্রদেশে ভাগ করা হবে। যার মধ্যে একটি প্রকারের প্রদেশগুলি যেখানে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল এবং অন্য দুটি প্রকারের প্রদেশ যেখানে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ট ছিল। পরিষদের প্রথম অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল বা যৌথ বিষয়গুলি বিবেচনা করবার কথা ছিল। এই বিষয়গুলির মধ্যে ছিল প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র বিষয়ক সিদ্ধান্ত এবং যোগাযোগ। এই বিষয়গুলিতে সহমতের ভিত্তিতে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর পর পরিষদকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করার কথা ছিল এবং বেশ কয়েকটি প্রদেশ নিয়ে গঠিত সেই প্রতিটি অংশের প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র বিষয়ক সিদ্ধান্ত এবং যোগাযোগ বাদ দিয়ে সংবিধানের বাকি অংশ প্রণয়ন করার কথা ছিল। সংবিধানের বাকি অংশে যুক্ত করার কথা ছিল তাদের অভ্যন্তরীণ, স্থানীয় সমস্যাগুলি মোকাবিলা করার বিষয়গুলি। এক অর্থে, এই প্রস্তাবটি ছিল ১৯৩৫ সালের সংস্কারের একটি সম্প্রসারণ মাত্র।
‘ক্যাবিনেট মিশন’ এর প্রস্তাবগুলি প্রকাশিত হওয়ার পর, কংগ্রেস এই বিষয়ে গান্ধীর পরামর্শ চেয়েছিল। গান্ধীজি খুব মনোযোগ সহকারে দলিলটি পড়েন এবং ব্যক্তিগতভাবে ও সম্মিলিতভাবে ক্যাবিনেট মিশনের সদস্যদের সঙ্গে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। সে আলোচনার পর তিনি বিবৃতিতে যে বিষয়টির উপর যথেষ্ট বেশি জোর দেন তা হলো যে প্রস্তাবগুলির গ্রহণযোগ্যতা কারও উপর নির্ভর করবে না বা এই প্রস্তাবের কারণে কারও উপর কোন বাধ্যবাধকতা থাকবে না। তাঁর মনে আশঙ্কা ছিল যে বিভিন্ন দল থেকে প্রতিনিধি নিয়ে তৈরি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভবিষ্যতে দেশকে একটি বিস্ফোরক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। (দেখুন বসু ১৯৬২, ২৫৫-২৫৬)
কেন্দ্র এবং প্রদেশের মধ্যে ক্ষমতার বিভাজন আনার সময় একই জিনিস পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তাই তিনি সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে কিভাবে তা থেকে উদ্ধার পাওয়া যাবে তার উপায় খুঁজছিলেন এবং এই সম্ভাবনা তিনি স্পষ্টতই মিশনের প্রস্তাবগুলির বাধ্যবাধকতাহীন চরিত্রের মধ্যে আবিষ্কার করেছিলেন।
স্পষ্টত তাঁর পরামর্শেই কার্যনির্বাহী কমিটি প্রস্তাবগুলির প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়া একটি প্রস্তাবের আকারে প্রকাশ করেছিল, যেখানে বলা হয়েছিল যে 'বিবৃতির সুপারিশমূলক চরিত্র বজায় রাখার জন্য এবং ধারাগুলি (এখানে উদ্ধৃত করা হয়নি, বসু ১৯৬২, ২৫৬ দেখুন) একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য, অনুচ্ছেদ ১৫ অনুযায়ী বোঝাতে চায় যে, সংশ্লিষ্ট প্রদেশগুলিই সিদ্ধান্ত নেবে তাদের কোন অংশে রাখা হবে বা সেখানে তারা থাকবে কি না। সুতরাং সংবিধান প্রণয়ণ এবং তা কার্যকর করার উদ্দেশ্যে সংবিধান পরিষদকে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব সহ একটি সার্বভৌম সংস্থা হিসাবে বিবেচনা করা উচিত।' (বসু ১৯৬২, ২৫৭-৫৮।)
ক্যাবিনেট মিশন তৎক্ষণাৎ ব্যাখ্যা করতে শুরু করে যে, এটা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। এম.এ. জিন্নাহ এই ধরনের ব্যাখ্যার সম্ভাবনা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে পূর্বে আসাম এবং পশ্চিমে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশকে কংগ্রেস সংশ্লিষ্ট 'গোষ্ঠী' থেকে বেরিয়ে আসতে উৎসাহিত করতে পারে, অন্যদিকে পাঞ্জাব ও বাংলার শিখরা কেন্দ্রীয় হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীর সাথে একীভূত হতে পারে। তাই মুসলিম লীগ গণপরিষদে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
ইতিমধ্যে কংগ্রেসের সদস্যগণ এবং তাদের নির্বাচিত অন্যান্যদের সহায়তায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল। মুসলিম লীগ তাদের নিজস্ব কিছু শর্তাবলীর প্রস্তাব করেছিল, যদিও প্রাথমিক ভাবে সেই শর্তগুলি ছিল না। কিন্তু কিছু স্তরে আলোচনার পর তাদের কয়েকজন প্রতিনিধি সরকারে যোগ দেন এবং মন্ত্রিসভার দায়িত্ব-পদ পুনর্বণ্টন করা হয়। মুসলিম লীগের সদস্যদের জায়গা করে দেওয়ার জন্য কংগ্রেসের পছন্দের কয়েকজন সদস্যকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।
তবে খুব শীঘ্রই এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে মন্ত্রিসভা যৌথ দায়িত্বের নীতিমালার উপর কাজ করেনি। শুধুমাত্র তাদের মধ্যে কোনও সমন্বয়ই ছিল না তা নয় বরং বিভিন্ন বিষয়ে ক্রমাগত মতভেদ ঘটছিল এবং অন্যান্য টানাপোড়েনও ছিল। মুসলিম লীগের একজন বিশিষ্ট নেতা সেই সময়ে প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে লীগ শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে যাবার জন্য সরকারে যোগ দিয়েছে।
ব্রিটিশ ভাইসরয়ের মনোভাব ছিল খুবই অদ্ভুত। এটা স্পষ্ট ছিল যে সিভিল সার্ভিসের ব্রিটিশ সদস্যরাও বিভেদ সৃষ্টিকারী শক্তিগুলিকে উৎসাহিত করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন এবং যখন এই ধরনের ঘটনাগুলি বল্লভভাই প্যাটেলের অধীনে স্বরাষ্ট্র বিভাগের নজরে আনা হয়েছিল, তখনও তিনি দোষী অফিসারদের তাদের বর্তমান পদ থেকে বদলি করতে পারেননি অথবা তাদের ক্রমাগত করে যাওয়া ক্ষতি বন্ধ করতে কোন পদক্ষেপও নিতে পারেননি। এটা স্পষ্ট ছিল যে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ যখন নিজেরা শাসন করতে পারবে না তখন অন্যদেরও শাসন করতে দেবে না।
ইতিমধ্যে ব্রিটিশ সরকারের হাত মুচড়ে দাবী আদায় করার জন্য, মুসলিম লীগ 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন' নামক কর্মসূচি শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলা তখন মুসলিম লীগ সরকারের অধীনে ছিল এবং ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট কলকাতায় লুটপাট, দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ এবং হত্যালীলার এক ব্যাপক কর্মসূচি শুরু হয়। পুলিশ বাহিনী নিস্ক্রিয় হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল। লুটপাট, দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ এবং হত্যা প্রতিরোধ করতে তারা তখন সক্রিয় হয় নি। মূলত যে সব স্থানে 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন' শুরু হয়েছিল, কলকাতার সেই সব অঞ্চলের অমুসলিম বাসিন্দারা বিস্মিত হয়ে পুলিশের সেই ভূমিকা লক্ষ্য করে এবং যখন তৎকালীন বাংলা সরকার শান্তি পুনরুদ্ধারের জন্য কোনও পদক্ষেপ নেবে বলে কোনও লক্ষণ দেখা দেখা গেল না, তখন তারা নিজেদের আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নেয় এবং মহানগরের মুসলিম বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে অসংগঠিত সহিংসতার মাধ্যমে পাল্টা আক্রমণ করে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ৮,০০০ এরও বেশি মানুষ নিহত হয়, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক হিন্দু এবং অর্ধেক মুসলিম নাগরিক ছিল।
এই দাঙ্গা লুঠতরাজ কিছুটা কমে এলে দেখা গেল কলকাতা কার্যত দুটি পৃথক অঞ্চল অর্থাৎ হিন্দু ও মুসলিম অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। দুই মাস পরে পূর্ব বাংলার নোয়াখালী জেলায় মুসলিম লীগের 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন' এর পরবর্তী পর্ব শুরু হয়। নোয়াখালি মুসলিম প্রধান জেলা যেখানে ১৮ শতাংশ হিন্দু এবং ৮২ শতাংশ মুসলিমের বসবাস ছিল। জমিদারি সম্পত্তির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ হিন্দুদের এবং বাকি অংশ মুসলমানদের ছিল। নোয়াখালী ছিল মুসলিম গোঁড়ামির কেন্দ্র এবং মুসলিম ধর্মযাজক ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য এখানে ধর্ম শিক্ষার স্কুল চালু ছিল।
তখন স্বাভাবিক ভাবেই ধনী-দরিদ্র সকলের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ছিল। মুসলিমদের মধ্যেও কিছু ধনী মানুষ ছিল, অন্যদিকে দরিদ্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কৃষি শ্রমিক, জেলে এবং ধোপা ছিলেন হিন্দু বর্ণের। কিন্তু নোয়াখালীতে যখন দাঙ্গা শুরু হয় তখন শুধুমাত্র কেবল ধনীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হননি বরং সেই একতরফা সংঘর্ষকে সুকৌশলে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল যে তা সম্পূর্ণভাবে সাম্প্রদায়িক চরিত্রে রূপান্তরিত হয়েছিল। ধনী বা দরিদ্র কোনও হিন্দুকেই রেহাই দেওয়া হয়নি, অন্যদিকে ধনী মুসলিম, জমির মালিক বা সুপারি ও ধানের ব্যবসায়ী যারা, তারা কোনভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। প্রকৃতপক্ষে এই সংঘর্ষ হিন্দুদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে নিধন ও ধ্বংসের পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এই সংঘর্ষ ছিল একতরফা যুদ্ধ যেখানে কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি লুট বা ধ্বংস করা হয়েছিল, শত শত মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছিল এবং মহিলাদেরও চরমতম লজ্জার অত্যাচারে প্লাবিত করা হয়েছিল।
কলকাতা এবং পূর্ববঙ্গে যা ঘটেছিল তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিহারে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। সেখানে প্রায় আট বা নয় হাজার মানুষ নিহত হয়, যার মধ্যে প্রায় এক হাজার হিন্দু ছিলেন যারা সাম্প্রদায়িক হিংসার বলি হন অথবা পুলিশের গুলিতে মারা যান।
যাই হোক মুসলিম লীগের 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন' এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্তত ব্রিটিশ এবং মুসলিম লীগ উভয়ের পক্ষেই অনুকূল রাজনৈতিক লাভ বয়ে আনতে শুরু করে। হিন্দু জনগোষ্ঠী বলতে শুরু করে যে, একসঙ্গে বসবাস করার চেয়ে দুটি সম্প্রদায়ের আলাদাভাবে বসবাস করাই ভালো।
এই সাম্প্রদায়িক হিংসার পরিবেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে প্রশাসন পরিচালনা করতে হয়েছিল। অথচ সেই হিংসা প্রতিরোধ করার জন্য ভাইসরয় বা সিভিল সার্ভিসের ব্রিটিশ সদস্যদের কাছ থেকে খুব একটা সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। তারা তাদের অসহায়ত্বের যুক্তিতে নিজেরা নিস্ক্রিয় ছিলেন। আবার উল্টোদিকে তৎকালীন মন্ত্রীদের কার্যকরভাবে শাসন পরিচালনা করতে দেয়নি। এই রকম পরিবেশ থাকা সত্বেও কংগ্রেস ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বরে গণপরিষদের কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়, যদিও মুসলিম লীগ এই উদ্যোগ এর বাইরে ছিল।
যা কিছু ঘটছিল তার নীরব সাক্ষী ছিলেন গান্ধী। তিনি নেতৃস্থানীয় কংগ্রেস সদস্য এবং মুসলিম লীগের সদস্যদের মধ্যে যে আলোচনা চলছিল তা লক্ষ্য করছিলেন এবং কখনও কখনও তাদের যতদূর সম্ভব তাঁর পরামর্শ এবং সহযোগিতা দিয়ে তাদের সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর স্থান আর দিল্লিতে নয় বরং নোয়াখালী এবং বিহারের গ্রামীণ জেলাগুলিতে এবং তাই তিনি ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিকে বাংলার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
নোয়াখালীতে তিনি নিজের সামনে যে কাজের লক্ষ্য রেখেছিলেন তা ছিল অভূতপূর্ব চরিত্রের। গঠনমূলক কর্মসূচিতে নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে সেবা ও পরিষেবা সংগঠিত করার জন্য তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন। তাঁর কথা অনুযায়ী তিনি কৃষকদের মন জয় করার জন্য এই কাজ শুরু করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি এই কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন যতদূর সম্ভব মুসলিম লীগ সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়ে। কেননা মুসলিম লীগ ক্ষমতায় ছিল নির্বাচিত সরকার হিসাবে। অনেকে যেমন ব্রিটিশদের কাছে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য আবেদন করছিলেন কিন্তু গান্ধীজী তার পরিবর্তে বাংলায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারের জন্য লীগের মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। লীগের স্থানীয় বেসরকারী নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছিল এবং সাম্প্রদায়িক হিংসার ফলে যে ক্ষতি হয়েছিল তা মেরামত করার জন্য গান্ধীজী তাদের সঙ্গে দিনরাত কাজ করেছিলেন।
গান্ধীজী বেশ কয়েকবার তাঁর মন কীভাবে কাজ করছে তা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। দাঙ্গার সময় যাদের স্বামীদের হত্যা করা হয়েছিল সেই সব বিধবাদের একটি দল যখন তাঁর কাছ থেকে সান্ত্বনার জন্য প্রার্থনা করেছিলেন, তখন তিনি তাদের উত্তর দিয়েছিলেন যে তিনি সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য নয় বরং সাহস দেবার জন্য এসেছেন। নতুন ভারত কখনও সাহস ছাড়া জন্মগ্রহণ করবে না। শিক্ষক এবং চিকিৎসা কর্মীদের আরেকটি দলের কাছে তাঁর পরামর্শ আবার অন্য রকম ছিল। তিনি তাদের নিজস্ব সময় বা অর্থের কিছু অংশ দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতির জন্য ব্যয় করতে বলেছিলেন, কেননা এই দরিদ্রদের অর্থেই তাদের শিক্ষা লাভ হয়েছে এবং তাদের বর্তমান আরামের জীবন তারা পেয়েছেন। তিনি বলেছিলেন যে যদি তারা সেটা না করে, তাহলে মধ্যবিত্তদের এখানে থাকার কোনও নৈতিক অধিকার নেই। এক সন্ধ্যায় এক জনসভায় তিনি বলেছিলেন যে আমাদের ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাতে হবে যে, এই ধ্বংসযজ্ঞের পরেও ঈশ্বর আমাদের সকলকে নতুন করে জীবন গড়ে তোলার সুযোগ দিয়েছেন।
এইভাবেই গান্ধীজী একাকী তাঁর অভূতপূর্ব দুরূহ লক্ষ্যে পৌঁছাবার চেষ্টা করছিলেন। ১৯২১ সাল থেকে, বিশেষ করে ১৯৩৮-৩৯ সালে তাদের শাসনকালের সময়, কংগ্রেস তাঁর গঠনমূলক কর্মসূচির দিকে কটাক্ষ করেছিল। কিন্তু তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে কেবলমাত্র এর মাধ্যমেই জনসাধারণ অর্থনৈতিক শক্তি অর্জন করতে পারে এবং তাদের মধ্যে একটি সাম্যবাদী সমাজ গড়ে তোলার নতুন লক্ষ্য বিশেষভাবে প্রচার করা যেতে পারে। বিপ্লব শেষ হওয়ার পরে এবং ক্ষমতা দখলের পরে কী ঘটবে তা কেবল তাদের কাছে শুধু ব্যাখ্যা করাই যথেষ্ট নয় বরং তাদের অর্তনৈতিক শক্তি অর্জনের বন্দোবস্ত করতে হবে। সাধারণভাবে সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে জয়ী হলে ক্ষমতা একটি ছোট গোষ্ঠী বা শ্রেণীর হাতে চলে যাবার সম্ভাবনা। সে ক্ষেত্রেও জনগণ এখন যেখানে আছে সেখানেই থেকে যাবে।
তবে এই 'গঠনমূলক কাজে' জড়িত থাকার বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, 'দেশের সবচেয়ে সফল ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সহযোগিতা ছাড়াই' তিনি এই কাজ করছিলেন। কিন্তু তিনি শুধু সেই কাজই করছিলেন তা নয়। তাঁর শিক্ষামূলক কর্মসূচিতে একটি রাজনৈতিক দিকও ছিল। স্থানীয় সরকার প্রস্তাব করেছিল যে শান্তি বজায় রাখার জন্য, শান্তি কমিটি গঠন করা উচিত যেখানে হিন্দু এবং মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের গ্রামবাসীদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। তারা শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবে এবং যে কোন অস্থিরতার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগগুলি তুলে ধরবে। গান্ধীজী মন্তব্য করেছিলেন যে তিনি চান বরং একজন হিন্দু এবং একজন মুসলিম স্বেচ্ছাসেবক একসঙ্গে কাজ করুক, যাদেরকে স্থানীয় মুসলিম লীগ বেছে নেবে এবং যারা একসঙ্গে যে কোন গন্ডগোলের পরিস্থিতির মধ্যে জনগণকে শান্ত করতে ছুটে যাবে এবং প্রয়োজনে তাদের নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকবে। ইতিমধ্যে তিনি 'তাদের সেই প্রস্তাবিত' শান্তি কমিটির কাজে সরকারকে সাহায্য করতেও প্রস্তুত ছিলেন।
এই উপলক্ষে হিন্দু মহাসভার একজন নেতা তাঁর কাছে এসে বললেন যে, এই মুহূর্তে কোনও শিক্ষিত হিন্দুকে পাওয়া যাচ্ছে না কেননা দাঙ্গা ও অশান্তির সময় তারা ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। আর সরকার যাদের শান্তি কমিটির সদস্য হিসেবে নিয়োগ করছে তারা হলেন দরিদ্র, অশিক্ষিত, জেলে, ধোপা অথবা কৃষক যারা পালাতে পারেনি এবং এখনও গ্রামেই থেকে যেতে বাধ্য হয়েছে। গান্ধীজি এই ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলেন যে, যারা পালিয়ে যেতে পারেনি তাদের প্রতিনিধিত্ব কীভাবে যারা পালিয়ে গেছে তারা করতে পারে? দরিদ্ররাও তাদের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করতে সমানভাবে আগ্রহী এবং শান্তি কমিটিতে তাদের নিজেদেরই প্রতিনিধিত্ব করতে হবে। যদি তারা কী করতে হবে তা না জানে বা তাদের বুঝতে কোন অসুবিধা হয়, তবে তাদের অবশ্যই শিক্ষিত এবং সংগঠিত করতে হবে। তিনি আরো বলেছিলেন যে, গণতন্ত্রের এই বিকাশধারায় অনিবার্যভাবে এই ধরনের ঝুঁকি নিতে হবে।
বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নগুলির ক্ষেত্রেও গান্ধীজি চুপ করে থাকেননি। তিনি কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে সর্বদা যোগাযোগ রাখতেন। তাছাড়াও অন্যদিকে হিন্দু মহাসভার এন. সি. চ্যাটার্জি অথবা শরৎচন্দ্র বসু, চপলা কান্ত ভট্টাচার্য, মৌলবী ফজলুল হকের মতো অন্যান্যরা সময়ে সময়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন।
নোয়াখালীতে অবস্থানকালে, গান্ধীজি কংগ্রেসের কার্যকরী কমিটিকে দুটি নির্দেশনা পাঠিয়েছিলেন যেখানে তিনি স্পষ্টভাবে তার মতামত ব্যক্ত করেছিলেন যে সংবিধান সভা থেকে বেরিয়ে আসা এই মুহূর্তে কংগ্রেস সংগঠনের পক্ষে সর্বোত্তম হবে। তাঁর বক্তব্য ছিল:
“আমি স্পষ্টভাবে বলছি যে যদি সংবিধান সভা মুসলিম লীগ বয়কট করে, সেক্ষেত্রে ১৬ মে তারিখের ক্যাবিনেট মিশনের বিবৃতি অনুসারে সংবিধান সভা অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত নয়। ..... … … ব্রিটিশ সরকারের ইচ্ছুক সহযোগিতায় বয়কট সত্ত্বেও সংবিধান সভা অনুষ্ঠিত হলে তা প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় বা ইউরোপীয় ব্রিটিশ বাহিনীর দৃশ্যমান বা অদৃশ্য সুরক্ষার অধীনে হবে। আমার মতে এই ধরণের পরিস্থিতিতে আমরা কখনই একটি সন্তোষজনক সংবিধান প্রণয়ন করতে পারব না। আমরা সেই সংবিধানের প্রণেতা হিসাবে নিজেদের স্বীকার করি বা না করি, আমাদের দুর্বলতা সমগ্র বিশ্ব অনুভব করবে। .... ... ... যদি আমরা ব্রিটিশ সরকারের প্রতক্ষ্য বা অপ্রতক্ষ্য কোন রকম ছোঁয়াচ ছাড়া আমাদের নিজস্ব গণপরিষদ আহ্বান করার জন্য যথেষ্ট মাত্রার মর্যাদা এবং শক্তি অর্জন করি, তবে তা সবদিক থেকে সঠিক হবে”। (বসু ১৯৬২, ২৭৩।
কিন্তু এই পরামর্শ কংগ্রেসের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাছাড়া আরও কিছু বিষয়ও ছিল। ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায়, স্পষ্টতই গান্ধীজির পরামর্শে, কংগ্রেস রাজ্যগুলির নিজেদের ইচ্ছা মত ‘গ্রুপে’ যোগ দেবার পদ্ধতি বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা রেখেছিল। সেই সময়ে তারা ক্যাবিনেট মিশন এর বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু দুই দলের মধ্যে কিছু আলোচনার পর, যখন গান্ধীজি নোয়াখালীতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি উদ্ধারের কাজে দিল্লীর বাইরে ছিলেন, তখন কংগ্রেস তার অবস্থান সংশোধন করে এবং ব্রিটিশদের ব্যাখ্যা গ্রহণ করে।
১৯৪৬ সালের ৬ ডিসেম্বর এ.আই.সি.সি.-র এক সভায় ব্রিটিশ সরকারের সেই ব্যাখ্যা গ্রহণের জন্য একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে, পুরুষোত্তমদাস ট্যান্ডন সেই প্রস্তাবের একটি সংশোধনী পেশ করেন যেখানে বলা হয়, ‘কংগ্রেস ১৬ মে, ১৯৪৬ তারিখে ব্রিটিশ ক্যাবিনেট মিশনের বিবৃতিতে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত ঐ ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি’। তবে সংশোধনীটি ১০২-৫৪ ভোটে হেরে যায়। জয়প্রকাশ নারায়ণ ট্যান্ডনজির সংশোধনীকে সমর্থন করেছিলেন। বিতর্কের সমাপ্তি টেনে জওহরলাল নেহেরু বলেন,
‘তিনি জয়প্রকাশ নারায়ণের সাথে একমত যে কংগ্রেসের দেশে অভ্যুত্থান সৃষ্টি করার ক্ষমতা আছে এবং এর মাধ্যমে তার লক্ষ্য অর্জন করাও সম্ভব। তবে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা যা আছে প্রথমে সেগুলি সমাধান করা উচিত। তাদের সেই সংগ্রামে কর্তৃপক্ষের সাথে সংঘাতের রূপ দেওয়ার প্রয়োজন নেই বরং তা অন্য কোনও রূপ নিতে পারে। এই কারণেই কংগ্রেস তার অবস্থান সুসংহত করতে চেয়েছিল। (দেখুন বসু ১৯৬২, ২৬৮-২৭১।)
যখন গান্ধীজির কাছে খবর এলো যে কংগ্রেস ব্রিটিশ-ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছে এবং তাদের প্রথম প্রস্তাব থেকে সরে এসেছে, তখন তিনি চিৎকার করে বললেন, 'ইয়া তো মেরা খতমা হো গয়া', 'এ তো আমার সমাপ্তি'। গান্ধীজি যা চেয়েছিলেন এবং কংগ্রেস যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো, তার মধ্যে ব্যবধান আরও প্রশস্ত হয়ে গেল এবং তা মেরামত করা অসম্ভব হয়ে পড়ল। আর তাই নিরুপায় গান্ধীজী তাঁর একাকী পথেই এগিয়ে যেতে লাগলেন।
ইতিমধ্যে দিল্লি এবং সমগ্র ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠল। ভাইসরয়ের কাছ থেকে একটি পরামর্শ এলো যে, তিনি নিজে যতই অপছন্দ করুন না কেন, কংগ্রেস এবং লীগের ভারত-বিভাগ মেনে নেওয়া উচিত। তখন প্রায় ছয় শতাধিক দেশীয় রাজ্য ছিল, সাম্প্রদায়িকতার বিষে বিভিন্ন পরিষেবা আক্রান্ত হওয়ায় সেই পরিষেবাও অবিশ্বস্ত হয়ে পড়েছিল এবং সেনাবাহিনীর ভিতরে এই বিষের প্রতিফলন কী ভাবে হবে কে জানে? ব্রিটিশদের যখন চলে যেতেই হবে, তখন এমনটা হতে পারে যে চীনের মতো শত শত যুদ্ধবাজদের আক্রমণে ভারতও টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু স্পষ্টতই এই যুক্তিকে অস্বীকার করেন নি। বল্লভভাই প্যাটেল ছিলেন একজন বাস্তববাদী মানুষ এবং কংগ্রেস আর লীগ নিয়ে গঠিত মিশ্র মন্ত্রিসভাতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল সেই তিক্ততা তিনি ভুলতে পারেন নি। ইতিমধ্যে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল যে ইংরেজরা ভারতে বিভিন্ন অস্ত্র ব্যাপকভাবে পাচারের কাজে লিপ্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে কেউ কেউ বার্মায় ওয়াইঙ্গারের ‘ফ্যান্টম’ সেনাবাহিনীর তৈরি করেছিল। যখন চারদিক থেকে বিপদ ঘনিয়ে আসছে, তখন সেই পরিস্থিতির যদি আরও অবনতি হতে দেওয়া হয় তবে সবকিছু হাতের বাইরে চলে যেতে পারে। প্যাটেলও একমত হন যে সেই পরিস্থিতিতে দেশ-বিভাজনই সর্বোত্তম পন্থা। ওয়ার্কিং কমিটির অন্যান্য সদস্যরাও এতে রাজি হয়েছিলেন এবং এভাবেই কংগ্রেস অবশেষে দেশভাগ মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
গান্ধীজি অসন্তুষ্ট ও বিমর্ষ হয়ে ছিলেন। মরীয়া হয়ে শেষ চেষ্টা হিসাবে তিনি ভাইসরয়ের সঙ্গে দেখা করে তাকে বলেন যে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে ভারত ভাগ করার কোনও অধিকার তাঁর নেই। তিনি লিখেছিলেন ভাইসরয়ের সঙ্গে তাঁর যে কথোপকথন হয়েছিল তা লিখিতভাবে নিশ্চিত করতে। বিপরীত দিকে যাই বলা হোক না কেন, ভারত ভাগে যে কোনওভাবে অংশ নেওয়া ব্রিটিশদের পক্ষে বড় মাত্রার ভুল হবে। আর যদি দেশ বিভাগ করতেই হয়, তাহলে তা 'ব্রিটিশদের শাসন প্রত্যাহারের পরে হোক। তখন দেশভাগ বিবদমান পক্ষগুলির মধ্যে বোঝাপড়ার মধ্যে দিয়ে হতে পারে অথবা সশস্ত্র সংঘাতের মধ্যে দিয়ে হতে পারে যে সংগ্রাম কায়েদ-এ-আজম জিন্নাহর মতে পবিত্র।'
ভাইসরয়ের সঙ্গে কথোপকথনের সময় যখন গান্ধীজি দেশভাগের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন তখন ভাইসরয় তাকে বলেছিলেন, ‘কিন্তু, মিঃ গান্ধী, কংগ্রেস এখন আমার সঙ্গে আছে, তারা আর আপনার সঙ্গে নেই।’ গান্ধীজির উত্তর ছিল, ‘কিন্তু ভারত এখনও আমার সাথে আছে।’
গান্ধীজি যখন রেলযাত্রার সময় কামরাতে আমাদের সাথে এই কথোপকথনটি বর্ণনা করেছিলেন তখন আমরা তাকে বলেছিলাম, ‘কিন্তু বাপু, আপনি সেই দাবিটি প্রতিষ্ঠা করেননি!’
যখন আমাদের মধ্যে একজন তাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে তিনি কি ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য কোনও পদক্ষেপ নিতে পারতেন না তখন তিনি উত্তর দিলেন, ‘তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না যে পুরো দেশ সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠেছে?’ প্রতিটি দলই ভাবতে শুরু করেছিল যে হিন্দু এবং মুসলমানরা যদি কোনওভাবে একটি মীমাংসায় আসে তবেই স্বাধীনতা আসবে। এক বছরের রক্তপাতের কারণে তারা সবাই ক্লান্ত বলে মনে হচ্ছিল।
তিনি সময়ের দাবি মেনে চলতেন এবং ধরা যাক চার, পাঁচ বা ছয় মাস পরে, যখন আবারও জনগণ তাদের চেতনা ফিরে পেত এবং তারা যা লাভ করেছিল তাতে হতাশ হত ও 'স্বরাজ'-এর জন্য যদি সামান্যতমও তৃষ্ণার্ত হত, তখন তিনি একটি নতুন কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যেতেন। তাঁর সমগ্র জীবনে তিনি কখনও নিজে কোনও পরিস্থিতি 'তৈরি' করেননি। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে কী ঘটছে তা অনুধাবন করার স্বজ্ঞাত (স্ব-অনুমান লব্ধ) দক্ষতা তাঁর ছিল। সেই মুহূর্তে কোথাও কোনও সুস্থ লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না, তাই তাকে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছিল।
এমনকি ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সালে যে সময় ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছিল তখন গান্ধীজী কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। তখন তিনি নব-লব্ধ স্বাধীনতা সম্পর্কে বলেছিলেন, 'এটি একটি দুঃখজনক ঘটনা'। সম্ভবত এই অনুভূতি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল ২৬ জানুয়ারী ১৯৪৮ পর্যন্ত, যখন তিনি আবার নিজেকে আরো একবার কাজের মধ্যে সমর্পণ করে জাগিয়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে কংগ্রেস সংগঠনটি স্বেচ্ছায় ভেঙে দেওয়া হবে এবং তার সমস্ত কর্মীদের এক একটি গঠনমূলক কর্মসূচিতে পাঠানো হবে, তৃণমূল স্তর থেকে পরিষেবা এবং পঞ্চায়েত গড়ে তুলতে হবে, জনগণকে তাদের নতুন অধিকার এবং কর্তব্য কী তা শেখানো হবে এবং এইভাবে 'অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং নৈতিক স্বাধীনতার' ভিত্তি স্থাপিত হবে যা এখনও অর্জিত হয়নি।
তার নিজের সিদ্ধান্ত ছিল যে, এর পরে তিনি পাকিস্তানে কাজ করার জন্য যাবেন। সম্ভবত তিনি মনে করেছিলেন যে আবদুল গফ্ফর খান এবং তার সাহসী সহযোদ্ধারা দেশভাগ গৃহীত হবার ফলে সম্পূর্ণরূপে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন এবং তাদের প্রতি তাঁর যে কর্তব্য ছিল তা তিনি করে উঠতে পারেন নি।
একজন তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, ভবিষ্যতে ভারত ও পাকিস্তান কি কখনও ঐক্যবদ্ধ হবে? তাঁর উপদেশ ছিল যে আমাদের এই প্রশ্ন নিয়ে কখনও চিন্তা করা উচিত নয়। যদি কোনও একটি দেশের জনগণ দ্বারা প্রকৃত স্বরাজের ভিত্তি স্থাপিত হয়, তবে নিঃসন্দেহে অন্যান্য দেশের উপরও এর প্রভাব পড়বে। যদি কোন দিক থেকে কোন সাহায্য না পেয়েও জনগণ তাদের সম্মিলিত অহিংস শক্তির মাধ্যমে এই স্বাধীনতা অর্জন করে, তাহলে দেশগুলি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পৃথক থাকল কি না থাকলো সেটা তাদের বিষয়।
অবশেষে আবার নিজেকে তাঁর পরিকল্পিত কর্মসূচীতে নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের কয়েকজনকে তিনি এই শেষ কথাগুলি বলেছিলেন। কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং আমরা ১৯৪৮ সালের ৩০শ জানুয়ারী তাকে হারিয়ে ফেলি, যখন তিনি আমাদের সমগ্র জাতির জন্য একটি অসমাপ্ত কাজ, অর্থাৎ জনগণকে সংগঠিত, সম্মিলিত করে অহিংস শক্তির মাধ্যমে শ্রমজীবী মানবতার প্রকৃত মুক্তি অর্জনের কাজ শুরু করতে পা বাড়াবেন।