সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
প্রতিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলনের একটি প্রাচীন ও মান্য ধারা আছে। এটা আমার কথা না, গান্ধির কথা। সেটা হলো — সমুচিত জবাব। ইঁটের বদলে পাটকেল। চড় মারতে এলে তুমিও চড় মারবে। গান্ধি (নোয়াখালী পর্বে) জানিয়েছিলেন, তাঁর পথটি তুলনায় নতুন, সে নিয়ে তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যাচ্ছেন, শেষ কথার তো প্রশ্নই নেই। তাঁর পথ হলো অহিংস।
কেন অহিংস? কারণ ব্যাপারটা তো চড় খেয়ে চড় দেয়াতে সীমাবদ্ধ থাকে না, চোখের বদলে চোখ পর্ব আসে, আসবে — তাতে দুনিয়াটা দৃষ্টিহীন হয়ে যায়। কারণ আরো অনেককিছু। সবচেয়ে যেটা গভীরে আছে বলে (যতটুকু গান্ধিচর্চা করেছি তাতে এই আমার মনে হয়েছে, আমি ভুল হতেই পারি) প্রতীয়মান হয় সেটি হচ্ছে, আমার ‘শত্রু’ আর আমি প্রকৃতে এক। এক আত্মা। এক ইলেকট্রন এক প্রোটন ইত্যাদি। ও আমিই, আমার ‘বিকারগ্রস্ত’ ইগো হয়তো বা। অতএব ও বলবে কাগজ দেখাও, কাগজ যা আছে দেখালাম (এটা আমার কথা। গান্ধি হয়ত বলবেন, দেখাব না। সে নিয়েই এই লেখা), এবার তুমি তোমার কাজ করো, আমি আমার। যদি কাগজে তুমি খুশি না হও, আমাকে বে-ভোটার ইত্যাদি প্রক্রিয়া পার করে বে-নাগরিক দাগাও, জেলে ঢোকাও — ঢুকব। জেলকে আমি শ্রীঘর বানিয়ে সুখেশান্তিতে থাকব (অবিকল এই পরীক্ষাটি করার আদেশ পেয়েছিলেন তাঁর শিষ্য, বিনোবা, এবং করেওছিলেন তাই)। তবু তোমার প্রতি আমি কোনো বিদ্বেষ রাখব না। না মনে, না মুখে। বরং তোমার সঙ্গে আত্মীয়তা রাখার জন্য আমি নিজেকে সীমাহীন দুঃখ দিতেও দ্বিধা করব না।
এই গোলমেলে অদ্ভুত শিরদাঁড়াহীন ব্যাপারটা নিয়ে ভাবা যাক।
গোড়াতেই যা বলেছি, মারের বদলে মার — শ্রদ্ধেয় সুভাষচন্দ্র এই পথে দীক্ষিত পুরুষ। এটা একটা পথ। সোজাসুজি পথ। কোনো মারপ্যাঁচ নেই। যারা মানবেন তারা মানবেন। কিন্তু এদিকসেদিক করে এই পথকে ঘুলিয়ে দেবেন না। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ যথেষ্ট। এটা ঘটেছিল খান আব্দুল গফফর খান, সীমান্ত গান্ধির আমলে, বর্তমান আফগানিস্তানে। কোনো একটি ব্রিজ, যা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর চলাচলের জন্য অপরিহার্য ছিল, সেটিকে উড়িয়ে দেবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন সীমান্ত গান্ধির অনুগামী কোনো এক সৈনিক। সীমান্ত গান্ধি বলেছিলেন, দিতে পারো, কিন্তু দেবার পরে পুলিশের কাছে তোমাকে আত্মসমর্পণ করতে হবে, বলতে হবে তুমিই এই কাজটা করেছ। নাহলে কি হবে, পুলিশ আসবে, ঘটনার কাছেপিঠে থাকা মানুষজনকে সন্দেহ করবে, ধরবে, নির্যাতন করবে — সেটা যথার্থ হবে না।
ব্রিজ ওড়ানো হয়নি।
পড়ে রইল অন্য পথ, অপেক্ষাকৃত নবীন পথ, সুভাষচন্দ্রের বাপুর পথ।
এই পথে তিনটে দিক দেখতে পাই। এখন আর এটি শুধু গান্ধিতে থাকে না, রবীন্দ্রনাথ চলে আসেন, অবিকল স্পেস টাইম কন্টিন্যুয়ামের মতো। গান্ধির সেবাগ্রাম। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন শ্রীনিকেতন। আত্মশক্তির জাগরণ। এই প্রবন্ধকার একটি গ্রামে মুখ গুঁজে পড়ে আছেন এই কাজে।
কাজটা কি? সব অশান্তির মূলে তো জমি আর যোনি, রামকৃষ্ণের ভাষায় কামিনী কাঞ্চন — এদের আবার মূর্ত রূপ টাকা। কাজেই টাকা যা আছে সেটিকে সামাজিক করে নিয়ে ধরিত্রীর সেবা, মনুষ্যত্বের পথে। টাকা মানে শুধু ক্রয়ক্ষমতা নয়, শোষণক্ষমতা (প্রকৃত আয় এক ডলার বাড়াতে গেলে চোদ্দোটা পৃথিবী লাগবে)। সুতরাং আমার টাকা বাড়া মানে কারো পেটে লাথি (লকডাউনে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি তা)। এই বিষচক্র থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার পথ — যতটা আছে শেয়ার করার চেষ্টা। আর সেই শেয়ার পর্ব চলতে চলতেই ধারিত্রিক নির্ভরতা। তার মধ্যে হাতে হাত ধরা। ধরিত্রীর আশ্রয়ে থাকা মানে যা যা আমার দরকার — থাকা-খাওয়া-পরা — সবটা চলে আসা এবং হাতে হাত মানে আরো মজবুতি। ওদিকে টাকার কামড় থেকে সরে আসা। ক্রয়ক্ষমতা শোষণক্ষমতার গুড়ে বালি। টাকা যা রইল সবটা চলে এল পল্লী সৃজনে। এখানেও রবীন্দ্রনাথ। বলেছিলেন, দেশে টাকার অভাব নেই, অভাব ভরসার। ভরসা এবং বিশ্বাস নিয়ে আত্মনির্ভরতা, আরেক কথায়।
অপেক্ষাকৃত সহজ সরল পথ। প্রতিবাদ বলতে যা সব ঝংকার তা নেই। উত্তাল আন্দোলনের যুগে রবীন্দ্রনাথ কচুরিপানা নিয়ে, উটের দুধ নিয়ে কি যেন সব করতেন! এটা তাই। কাগজ নেই? চলো জেলে যাই। সেখানে গিয়ে ডাল রাঁধি আর মহাভারত পড়ি। বিনোবা ডাল রেঁধে আর গীতা পড়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন পথটির সহজ সরল চরিত্র। দুঃখ যে কিসে যায়, সত্যি সত্যি সেদিন শাসককে মাঠে নেমে হাওয়া খাইয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
পথ দুই, পরঞ্জয় গুহঠাকুরতার পথ। সত্যেন্দ্র দুবের পথ। রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি এবং রাষ্ট্র এখন দু চারজনের দেখভাল করছে। ‘অসীম ক্ষুধায় শেষে কি নিজেকে খাবে’র দল! বাকি আমরা ইঁদুর বাঁদর চুনোপুঁটি। হাঁকডাকের নিরিখে বড়জোর বাঘ সিংহী! যখনতখন দ্বেষদ্রোহী। ঘুসপেটিয়া। উইপোকা। আরো কত কি। তো, পরঞ্জয়রা লেগে রয়েছেন এইটি বোঝাতে এবং লাগু করতে যে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি দু চারজনের তাঁবেদারিতে থাকা উচিত নয়। ফলে ঐ দু চারজন, যাঁরা প্রভাবশালীও, তাঁরা মানহানির মামলা করছেন। এ আদালত সে আদালত ছুটতে হচ্ছে পরঞ্জয়দের, তথাপি ওঁরা না থেমে, আবার বলছি, না থেমে লাগাতার সত্যের প্রতিষ্ঠায় ছুটে চলেছেন। স্যালুট।
সত্যেন্দ্র দুবে। অজিত সরকার। স্যালুট।
অতি সম্প্রতি ডক্টর শিবরঞ্জনী সন্তোষ। আট বছর ধরে লড়ছেন। অবশেষে ওআরএস সত্য-মহিমায় সকলের কাছে পৌঁছবে ধরে নেয়া যায়। এমনই একজন অধ্যাপক শান্তিলাল কোঠারি। গরিবের সহজলভ্য প্রোটিন-সোর্স, খেসারির ডাল, যা সয়াবিন-লবির চাপে বাজেয়াপ্ত ঘোষিত হয়েছিল, তাকে স্বমহিমায় ফিরিয়ে এনেছেন অবিশ্বাস্য লড়াই করে। একদিকে বিজ্ঞান যা বলছে, অন্যদিকে ধর্না অনশন করে (ভাবা যায় চল্লিশ দিনের বেশি তিনি অনশন করেছেন খেসারির ডাল চাষ করতে দিতে হবে এই দাবিতে!)। স্যালুট।
অহিংস এই পথে লড়বার হিম্মত যার আছে, যাদের আছে তাদের স্যালুট। লেগে থাকতে হবে। থামলে চলবে না। আজ এ রাজ্য কাল সে রাজ্যে আপনার নামে মানহানির মামলা আসবে। আলো-আঁধারীর ধোঁয়াশা দিয়ে কিন্তু পার পাওয়া যাবে না। লড়তে হবে। এই দ্বিতীয় পথে বাপু হেটেছেন বহুবার। নানা ধরনের মানুষ দেখেছেন। ‘বেশ্যা’ও বলেছেন নানাজনকে! এই সতর্কতা নিয়ে আপনাকে চলতে হবে। খুব একটা সহজ কাজ নয়।
তৃতীয় পথ ধরে হাঁটা শুরু হলো দক্ষিণ আফ্রিকায়। ১৮৯৪। তখন তিনি মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি। আইনজীবী। জানতেন না তাঁর মধ্যে আমাদের বাপু বিরাজ করছেন। সেই জানার শুরুটা নিয়েই এবারের অগ্রসর।
সংক্ষেপে বিষয়টা এই। গান্ধি একটা মামলার কাজে গিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। সেটি মিটেছে। এবার দেশে (ভারতবর্ষে) ফিরতে চাইছেন। তাঁকে সম্মান জানাতে একটা বিদায় সভা বসেছে। সেখানে কথা উঠল আর একটি বিষয়ের, যার মোদ্দা কথা হচ্ছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী ভারতীয়ের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া। এটাই। ডি-ভোটার — এখনকার ভাষায় বলতে গেলে।
এটা প্রবাসী ভারতীয়দের সম্মানে লাগছে। কিন্তু করার কি আছে? কে বলবে, কোথায় বলবে, কে সামলাবে এসব হ্যাঁপা — প্রশ্নগুলো উঠেছিল। ব্যারিস্টার গান্ধিকে তারা বললেন, আপনি নাহয় একমাস থাকলেন, থেকে এ নিয়ে যা যা করার করলেন, আপনার জীবিকা যাতে চলতে পারে তার দায়িত্ব আমরা নিচ্ছি।
শুরু হলো তৃতীয় পথের অন্বেষণ। এই ভারতীয়ের মধ্যে শ্রমজীবী থেকে ব্যবসায়ী, ধনী থেকে দরিদ্র, সবাই ছিলেন। আজ বছরে বছরে ব্যাংক থেকে লক্ষ কোটি টাকার বেশি ঋণ রাইট অফ, ওভাররাইট হয়ে যাচ্ছে। তারা কারা জানার অধিকার আমাদের নেই, কারণ তারা মানী ব্যক্তি। এরা কি এখনকার ডি-ভোটারদের সঙ্গে থাকবে? অর্থাৎ এখন আগের দুটি পথ সমানভাবে প্রযুক্ত থাকবে। দক্ষিণ আফ্রিকাতেও তা হয়েছিল তবে কিছু পরে। টাকার কামড় উপেক্ষা করে হাতে হাত ধরে ধরিত্রী-মনুষ্যত্ব সৃজন — পল্লীসভ্যতা, আদর করে যদি বলি। অন্যটি, লাগাতার, লেগে থাকা। কে নিল, কোথায় গেল টাকাগুলো জানার জন্য লেগে থাকা। ও টাকাগুলো কিন্তু দেনা হয়ে আপনার আমার ঘাড়ে চেপে বসে আছে। জিনিসপত্রের দাম বাড়া থেকে শুরু করে মজুরি কমিয়ে রাখা সবকিছুতে ওই টাকার পাইপয়সা জড়িয়ে রয়েছে।
ফিরি তিনে। দক্ষিণ আফ্রিকা। শুরু হলো এক শুদ্ধ জনগণ-আন্দোলন। শুদ্ধ — এই শব্দটা আমরা বারে বারে ব্যবহার করব। কোনো রকম ঘৃণা হিংসা বিদ্বেষ নয়। নিজেকে শুদ্ধ করা। শুদ্ধ পথে থাকা। সেই পথের প্রভাবে অশুদ্ধ উবে যাবে এমন বিশ্বাসে ভর করে বাঁচা। প্রথম কাজ, নির্বিচারে সেবা। আর্ত-দরিদ্রের সেবা। শুরু হলো। ফলে নিচতলায় জাগছে বিশ্বাস, আসছে ঐক্য। অন্যদিকে সততার অভ্যাস। পরিচ্ছন্নতার। অত্যুক্তি না করা, সত্য কথা বলা। ইউরোপীয়রা ভারতীয়দের মধ্যে যা যা বদ্ অভ্যাস দেখে তা থেকে শুদ্ধ হওয়া। অন্যদিকে চলছে সই সংগ্রহ, অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে। চলছে বোঝানো। না বুঝে কেউ যেন সই না দেন — সেটাও বলা হচ্ছে। এবং যা যা বলা হচ্ছে সবটা যথাযথভাবে লিখে প্রেসে জানানো হচ্ছে। খবরের কাগজে তা ছাপা হচ্ছে। আজকের ঘৃণাভাষণের যুগে ভাবা যায়? অথচ আমাদের শুরু করতে হবে এখান থেকেই। ভারতীয়ের ভাষা প্রকাশ পাচ্ছে ভারতীয়ের কলমে।
এর মধ্যে গান্ধি দেশে এলেন। পরিবার নিয়ে ফিরবেন। দেশে কংগ্রেসের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপিত হলো। বৃহত্তর প্ল্যাটফর্ম তৈরি হলো। ফিরলেন। ফিরে বিপদের মধ্যে পড়লেন। প্রাণ সংশয়ের অবস্থা তৈরি হলো। কারণ তিনি ভারতবর্ষে এসে ওখানকার সরকার, ওখানকার মানুষদের (সাদাদের) সম্বন্ধে যা বলেছেন সেসব এদিক-সেদিক করে অপপ্রচার করা হয়েছে। আর তাতে সাদারা ক্রুদ্ধ হয়েছে। জীবন্ত অবস্থায় এ ঘাটে নামতে পারবে না — এমন জিহাদ। নামলেন তবুও। আক্রান্ত হলেন। তিনি ও তাঁর বন্ধুরা (যার মধ্যে সাদা মানুষ তো রয়েছেনই) দেখালেন, যা বলেছেন তার লেখ্যরূপসব। প্রথমেই যা বলা হয়েছিল, যা বলব সেটাই লিখব, কোনরকম অতিশয়োক্তি করব না, সেটাই এবার কাজে লাগছে। যারা তাঁকে মেরেছে তারা যে ভুল বুঝে মেরেছে, সেটাই জানালেন বিচারসভায়। যারা মেরেছে তাদের ভুল বোঝানো হয়েছে বলে তারা তাঁকে নির্যাতন করেছে, তাই তাদের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো অভিযোগ নেই, জানালেন তাও। এবার সাদাদের লজ্জা পাবার পালা। তারা ক্ষমা চেয়েছে। পরিণামে আরো আরো সাদারা তাঁদের সঙ্গে ভিড়েছে।
প্রথম পর্বের আন্দোলন শেষ। এখন ভারতীয়রা ঐক্যবদ্ধ। আর যেই মুহূর্তে তাদের নিজেদের মধ্যেকার কোঁদল সরে গিয়ে তারা এক হলো, সাদারা প্রমাদ গুনল। যদি ঐক্যবদ্ধ এই জাতটা রাষ্ট্রক্ষমতার বৃত্তে ঢুকে যায়! ১৯০৬। এল নতুন আঘাত। সব ভারতীয়ের থাকবে একটা করে পাস। যার পাস নেই সে ঘুসপেটিয়া। ‘পৃথিবীর অন্য কোথাও স্বাধীন মানুষের জন্য এই প্রকার আইন আছে বলে আমার জানা নেই’ — লিখছেন গান্ধি। স্বাধীন ভারতে যে এই আইন আছে — বাপু? আমার সোনার বাংলা গাওয়াটাও যে দেশদ্রোহিতা — কবি?
১৯০৬। আর এক ধাপে পৌঁছলাম। সরকারি গেজেটে এই বিল প্রকাশিত হয়ে গেছে। গান্ধি বক্তব্য রাখলেন —
১. এটা অন্যায় অথচ আমরা কোনো অন্যায় করিনি,
২. একটা জাতির একটা নির্দোষ মানুষও যদি অপমানিত হন সেটা জাতিরই অপমান,
৩. অধীর হলে কি ক্রুদ্ধ হলে চলবে না, তাতে অত্যাচারের থেকে বাঁচব তাও নয়,
৪. শান্তভাবে প্রতিকারের পথ বার করে প্রতিরোধ করতে হবে (প্রতিকার এবং প্রতিরোধ — একত্রে উচ্চারিত হচ্ছে),
৫. সবাইকে এক হতে হবে,
৬. দুঃখ আসবে ও তা সহ্য করতে হবে,
৭. তবু যদি বিল পাস হয় ভারতীয়েরা তা মেনে নেবে না,
৮. ফলে যা দুঃখ তার ওপর চাপবে সেটা সে মেনে নেবে।
আজকের সংকটে শুরুটা তাহলে পরিষ্কার। কাগজ যা আছে দেখালাম। গ্রাহ্য হলো না। ঘুসপেটিয়া চিহ্নিত হলাম। শ্রীঘরে ঢুকলাম (আসামের দৃষ্টান্ত ধরে বলছি)। লক্ষ্মীশ্রী সেখানেই আনব। সবাই যদি এক হয়। খুব যে একটা সবাই এক হবেন তা কিন্তু নয়! এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, দক্ষিণ আফ্রিকার আন্দোলন যখন তুঙ্গে, যখন সারা বিশ্বে এই আন্দোলন নিয়ে নিত্য আলোচনা চলছে, তখন গোখেল গান্ধির থেকে জানতে চেয়েছিলেন কজন সক্রিয়ভাবে এই আন্দোলনে যুক্ত। গান্ধি বলেছিলেন, ষোলো থেকে ষাট। ডান্ডি পর্বে সংখ্যাটা সত্তরের একটু বেশি। নোয়াখালী পর্বে সংখ্যাটা সাত থেকে দশ। সংখ্যা কোনো বিষয়ই নয়, বিষয় দু চার জনও যদি থাকেন, সবকটি অগ্নিপরীক্ষা থেকে তাদের সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে আসতে হবে। পরিচ্ছন্নতা। শুদ্ধতা। আত্মসম্মান। সত্যবাদিতা। নির্যাতনে সহনশীল। সব। তখন এই তুচ্ছ সংখ্যাটাই হিমালয়-সমান।
অতঃপর? ‘দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্যাগ্রহ’ থেকে পাচ্ছি যা যা তত্ত্ব ও তথ্য সেগুলি যথাক্রমে —
১. সরকার সভ্যতার সীমা পার হয়ে গেছেন, আমাদের ত্যাগের ব্রত নিতে হবে।
২. লোক দেখানোর জন্য এই প্রকার প্রতিজ্ঞা করতে নেই, এর প্রভাব কি হবে সেটাও আমরা ভাবতে পারছি না, কিন্তু পবিত্র শপথ নিতে হবে।
৩. যারা শপথ নেবেন তাদের কর্তব্য হবে একদিকে আশা রাখা, অপরদিকে কোনো আশা না থাকলেও শপথ বজায় রাখা।
কি হতে পারে এরপর? —
১. প্রথমেই আমরা উপহাসের পাত্র হবো, কয়েকজন এতেই বসে যাবে।
২. এরপর আমাদের জেলে যেতে হবে, জেলে অপমান নির্যাতন সহ্য করতে হবে, অর্থদণ্ড হয়ে সম্পত্তি ক্রোক হয়ে যেতে পারে, কাঙাল হয়ে যেতে পারি।
৩. নির্বাসন হতে পারে, পীড়িত হতে পারি, কেউ মারাও যেতে পারে।
৪. এই যুদ্ধের অবসান কবে হবে, কেমন করে হবে, অজানা।
৫. ‘কিন্তু আমি সাহস করে ও নিশ্চয়তার সঙ্গে একথা বলতে পারি যে, যে পর্যন্ত মুষ্টিমেয় মানুষের সমষ্টি প্রতিজ্ঞায় স্থির হয়ে থাকবেন সে পর্যন্ত এই লড়াইয়ের একটিমাত্র ফলই হতে পারে আর তা হচ্ছে জয়’। শপথ কতটা পবিত্র? — ‘আমি মরবো তবু আইন মানব না …. সম্ভাবনা নেই, তবু ধরে নিন যে, সবাই ছেড়ে গেলেন, আমি একা রইলাম, তাহলেও আমার শপথ ভঙ্গ হবে না’।
শুরু হলো পথ চলা। প্রতিটি পদক্ষেপের বিবরণ যথাযথভাবে, সামান্য অতিরঞ্জিত না করে, ব্রিটেন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতে প্রেরণ করা, কখনো গিয়ে বলা। ‘গোপনীয়তা বর্জিত আচরণ’ আর তাতে লাভ হয় বেশি — ‘আমি প্রায়ই দেখেছি যে যারা নিরীহভাবে আত্মসমর্পণ করেন আমলারা তাদের ভয় দেখানোর রীতিই গ্রহণ করেন আর যারা ভয় না পেয়ে সোজাসাপ্টা ব্যবহার করেন তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করেন’।
আসবে খরচাপাতির কথা। বহুবার তা উঠেছে। এখানেও সোজাসাপ্টা সিদ্ধান্ত — ‘যারা ভবিষ্যতে জনসেবার কাজ করতে চান তাদের অবগতির জন্য এ কথা জানাই যে আমরা এই প্রতিনিধি দলে খরচার হিসেব রাখতে এত যত্ন নিতাম যে অতি ক্ষুদ্র বিষয় যেমন স্টিমারে সোডার দাম ইত্যাদিও রশিদশুদ্ধু হিসেবে লিখতাম। আমরা টেলিগ্রামের রশিদগুলোও রেখে দিয়েছিলাম। বিশদে হিসেব লেখবার কারণে বিবিধ খাতে কিছু লিখি নি। যদি কখনো-বা বিবিধ খাতে কিছু খরচ দেখানো হয়ে থাকত তা জোর দু-চার আনার, তাই খরচের বিবরণ লেখার সময় যথাযথভাবে মনেও পড়ত না। যদি কোনও মাইনে পাওয়া চাকর কাজ ও পয়সার হিসেব দিতে বাধ্য থাকে, তবে স্বেচ্ছাসেবক দ্বিগুণ বাধ্য। কেননা সেবা করার সন্তোষই স্বেচ্ছাসেবকের মজুরি। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং অনেক সংস্থায় এই বিষয়ে যথেষ্ট নজর দেয়া হয় না বলেই এখানে এ সম্বন্ধে বিশদে লিখলাম’।
পাস নেবার ও বৈধ হবার সময় শুরু হলো। ততদিনে দক্ষিণ আফ্রিকা পাচ্ছে সুশিক্ষিত একটি মানবগোষ্ঠী। তারা কি শিখল?
১. সমগ্র প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাচ্ছে বলে বেআইনি ঘোষিত হতে পারে, তাতে করে অন্যান্য আইনের বিরুদ্ধে লড়াই করার সম্ভাবনা কমে যাবে।
২. যারা এতদিন অর্থ সাহায্য করছিলেন তারা রাষ্ট্রদ্রোহী সংস্থায় অর্থ দিলে আইনত দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন তাই তারা পিছিয়ে আসতে পারেন।
৩. ‘সবশেষে সত্যাগ্রহীরা এও স্থির করেছিলেন যে, কেউ এই যুদ্ধে বিশ্বাসের অভাব বা দুর্বলতা কি অন্য কোনো কারণে যোগ না দিলে সত্যাগ্রহীরা তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবেন না। শুধু তাই নয়, সত্যাগ্রহীরা তাদের সঙ্গে বর্তমানের সদ্ভাব অক্ষুণ্ণ রেখে সত্যাগ্রহ ছাড়া অন্য কাজে তাদের সঙ্গে একযোগে কাজও করবেন’।
৪. ‘যেখানে যুদ্ধ অভ্যন্তরীণ শক্তির ওপর সর্বতোভাবে নির্ভরশীল, সেখানে সকলে নিয়মানুবর্তিতার শিক্ষা না নিলে যুদ্ধ চালানো যায় না’।
পারবো তো? চটিচাটা বলব না, ভাববই না। ধুতিচাটা বলব না, ভাববই না। শিরদাঁড়ার ক’টা হাড় কম পড়েছে গুনে দেখব না। একটাই লক্ষ্য আমি এবং আমার সহ-নাগরিক আমরা এই পৃথিবীর। শক্তি একটাই আর তা অভ্যন্তরীণ।
রাষ্ট্র তো চাইবেই ধমক দিয়ে অথবা বিপ্লবজীবী আড়কাঠি দিয়ে আন্দোলন ভাঙার। এখানে সত্যাগ্রহীদের কাজ ছিল — পাস দেয়ার অফিসগুলোর সামনে প্রকাশ্যভাবে পিকেটিং করা। পাস নিতে আসছে যে ভারতীয়রা তাদের আসন্ন বিপদ সম্বন্ধে সতর্ক করা। কিন্তু কাউকে বাধা না দেয়া। পুলিশের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করা। পুলিশ দুর্ব্যবহার করলে বাধা না দেয়া। একান্ত নিরুপায় হলে সেখান থেকে সরে আসা, আবার যাওয়া। পুলিশ গ্রেফতার করলে খুশি মনে ধরা দেয়া।
কিন্তু চৌরিচৌরার ভণ্ড তপস্বী যে তখন থেকেই তাঁর ধাত চিনিয়ে দিচ্ছেন —
‘অন্য একদল লোকের উদয় হয় …. যারা এদের ভয় দেখাতেন। খবর পেলে সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন বন্ধ করার কড়া উপায় নেয়া হচ্ছিল। ফলে ভয় দেখানো বন্ধ হলেও ব্যাপারটা নির্মূল করা যাচ্ছিল না। ধমকের ভয়টা কাজ করছিল আর সেই পরিমাণে আমাদের আন্দোলনের যে ক্ষতি হচ্ছিল তা আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। যাদের ভয় হচ্ছিল তারা অবিলম্বে সরকারের সাহায্যে চাইলেন, পেলেনও। এইভাবে সম্প্রদায়ের ভেতরে বিষ ঢুকতে লাগল। যারা দুর্বল ছিলেন তারা আরও দুর্বল হলেন। এতে বিষের তীব্রতা বাড়ল। কারণ দুর্বলের ধর্মই হচ্ছে প্রতিশোধ নেয়া’।
সেই দুর্বল যে প্রতিশোধ নিতে চায়, সবল সেই যে ক্ষমা করতে করতে এগিয়ে যেতে পারে তার লক্ষ্যে।
দশ হাজার ভারতীয়ের মধ্যে পাঁচশো জন পাস নিলেন।
রাষ্ট্রশক্তি এবার আরো কড়া। ধরপাকড় শুরু হলো। পাণ্ডাটি প্রথম চোটেই ধরা পড়লেন। দু মাসের কারাদণ্ড। আবদার করলেন — সশ্রম করা হোক (যারবেদা জেল তো কাঁপিয়ে দেবেন, পরবর্তীতে)। আবেদন মঞ্জুর হলো না। বিনাশ্রম কারাদণ্ড। চললেন। জেল সত্যাগ্রহীতে ভরে উঠেছে। ‘সম্পূর্ণ সুখ ও শান্তিতে জেল কাটাবো’ — লিখলেন। সুখ ও শান্তিপিয়াসী ব্যক্তিটি এবার জেলে ঢুকে বায়না ধরলেন, জেলখানা পরিষ্কার করব!
একটা সন্ধি প্রস্তাব এল। গান্ধি তা বিশ্বাস করলেন এবং ঠকলেন। গান্ধি বিশদে তার বর্ণনা করেছেন। আমি সেটায় যাচ্ছি না। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এটাই বুঝব যে, সন্ধিপ্রস্তাব এল, গান্ধি বিশ্বাস করলেন, পাস সবাই নিল এবং ঠকল।
অতএব আবার রাস্তায়। পাস পোড়ানো শুরু হলো। সারা বিশ্ব তা দেখল। ঘুসপেটিয়া ভারতীয়েরা পাস পোড়াচ্ছে।
ঔদ্ধত্যের সমুচিত আঘাত সঙ্গেসঙ্গেই চলে এল। আবার একটা বিল, আবার একটা আইন। নির্বাসিত করো এদেরকে।
শুরু হলো সত্যাগ্রহের যুদ্ধ। কি তার সংজ্ঞা? অন্য অন্য যুদ্ধ থেকে এর তফাৎ কোথায়? —
১. এর দাবিটা ন্যূনতম। এত কম যে ‘এর থেকে আর কমানো যায় না’।
২. তাই এর থেকে পিছু হটবার আর অবকাশ নেই। সৎ থাকব এমন কি বেশি? এককথায়। এই উপমাটিও তাঁর দেয়া। গঙ্গা যখন চলে তখন তো তার শাখা উপশাখা মিলিয়ে মিশিয়ে একটা বিশাল ব্যাপার, একূল ওকূল দেখা যায় না। যখন মেশে সমুদ্রে? কোথায় তার শেষ আর সমুদ্রের কোথায় শুরু — সেও বোঝা যায় না। শুদ্ধ যুদ্ধে শুদ্ধতাটাই দাবি। অন্য যুদ্ধে দাবিদাওয়ার বিশাল ফর্দ।
শুদ্ধতা। আর তখনই একটা মারাত্মক ‘হিসেবী’ বুদ্ধির দিশা পাই
‘তাই সত্যাগ্রহ যতই দীর্ঘস্থায়ী হয় অর্থাৎ প্রতিপক্ষ তাকে যত দীর্ঘস্থায়ী করেন, নিজের ভূমিকার জন্য প্রতিপক্ষের ততই ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা এবং সত্যাগ্রহী লাভবান হওয়ার। এই নিয়ম মূর্ত হওয়ার অনেক দৃষ্টান্ত আমরা এই যুদ্ধের পরবর্তী ইতিহাসে দেখতে পাব’।
বিশ্বের প্রথম রেকর্ডেড সত্যাগ্রহী, সোরাবজি আহমেদিয়া স্বঘোষিত ঘুসপেটিয়া হয়ে ট্রান্সভালে ঢুকলেন। কে কি করে — সেটা দেখাই এখন গান্ধির খেলা। রাষ্ট্র তো মানুষেরই সমষ্টি। সোরাবজি ঘুরছেন। এগিয়ে গেছেন দু'চার খোপ। কিন্তু বেশিটা কি আর এগুনো যাবে? আট খোপে পৌঁছলেই তো বোড়ে মন্ত্রী হয়ে বসে পড়বে! অতএব ধরো। জেলে পোড়ো। আবার একজন। তারপর আরেকজন। ধরা পড়ছে, জেলে যাচ্ছে। জেলখানাও যে পবিত্রতার শ্রীঘর। শুদ্ধ হওয়া যাদের শুরু এবং শেষ ব্রত — তাদের আর সমস্যা কি!
ব্যাপারটা ছেলেখেলার পর্যায়ে চলে এল। জেলে যাচ্ছে, গিয়ে দিব্য রয়েছে। তখন সরকার আরো কড়া হলেন। নির্যাতন মাত্রা ছাড়াল, মারাও গেলেন অনেকে, অসুস্থ তো হলেনই। এতদিন মারধর করে পাশের রাজ্যে ছেড়ে দেয়া হচ্ছিল। এবার বেশ কঠোর সিদ্ধান্ত। স্টিমারে চাপিয়ে ভারতে ছেড়ে আসা। যারা দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্মেছে, তারা তো বিভুঁইয়ে চলে এল, অসহায় হয়ে পড়ল।
বাংলাদেশে পাঠানো এমন কিছু খারাপ নয়, কি বলেন?
অনেকেই এবার ভয় পেলেন। ‘পাকা যোদ্ধারা আমাদের পাশে থেকে গেলেন’।
এবারের পরীক্ষার উত্তর এইরকম। স্বেচ্ছাসেবকেরা আরেকটি বিষয় শিখল, শিখে নিল। নির্বাসিতের দল ভারতবর্ষে পৌঁছে যেন ন্যূনতম খাদ্য বস্ত্র আশ্রয়টুকু পায়, সেই যোগাযোগ সেই বার্তা নিয়ে এবার নির্বাসিতের সঙ্গে তারাও স্টিমারে চেপে বসল। ভারতীয় বন্ধুদের কাছে এদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য অনুরোধ যেতে শুরু করল। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রিটেন, ভারতবর্ষ সর্বত্র — সত্যাগ্রহের শুদ্ধতা আর নির্বাসিতের বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় যৎসামান্য সহায়তার আবেদন জানিয়ে বার্তা আসা-যাওয়া করতে লাগলো দ্রুতগতিতে।
ওই তিন দেশের মানুষ সোচ্চার হলেন। সরকারের কু-নীতির বিরুদ্ধে বলতে লাগলেন। নির্বাসন মানে নিঃস্ব অবস্থায় ভিনদেশে বিতারণ নয় — নানা কণ্ঠ উঠতে লাগল।
ফলে ওই প্রথা বন্ধ হলো, কিন্তু জেলে নির্যাতন বন্ধ তো হলোই না, আরো বেড়ে চলল। যারা দান-সহায়তা করছিলেন তারাও ভয়ে হাত গুটিয়ে নিচ্ছেন।
জন্ম নিল আমাদের প্রথম পথটি। কমিউন। টলস্টয় ফার্ম। মে, ১৯১০। হেরমান কলেনবেক তেত্রিশশো বিঘের খামারবাড়ি বিনামূল্যে ও বিনা খাজনায় সত্যাগ্রহীদের ব্যবহারের জন্য দান করলেন।
আজকের ঘুসপেটিয়ারা? আপনার আমার বাড়িতে থাকবে। পারবেন তো? আমি পারব।
ফার্মে গান্ধি অজস্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। রামচন্দ্র গুহ তাঁর ‘গান্ধি বিফোর ইন্ডিয়া’ বইতে তার খুঁটিনাটি বিবরণ দিয়ে আমাদের ঋদ্ধ করেছেন। আমি শুধু গান্ধির নিজের লেখা গ্রন্থের একটি অংশ এখানে ব্যবহার করছি। গান্ধি লিখছেন —
‘এইরকম বিপজ্জনক পরীক্ষা কেবল আত্মশুদ্ধির যুদ্ধেরই অঙ্গ হতে পারে। সত্যাগ্রহের অন্তিম যুদ্ধের জন্য টলস্টয় ফার্ম এক আধ্যাত্মিক শুদ্ধি ও তপশ্চর্যার স্থান হয়ে উঠল। টলস্টয় ফার্ম না থাকলে আট বছর পর্যন্ত যুদ্ধ চালানো যেত কিনা, বেশি করে টাকা পাওয়া যেত কিনা, এবং আন্দোলনের অন্তিম পর্যায়ে যে হাজার হাজার লোক যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন তারা যোগ দিতেন কিনা, সে বিষয়ে আমার ঘোর সন্দেহ আছে’।
আধ্যাত্বিক শুদ্ধি। সৎ থাকা। খাদ্য স্বাস্থ্যে স্বাবলম্বী হওয়া। ব্রহ্মচর্য। কঠোরভাবে এই অনুশাসন চলেছিল। বাইরের চোখে কি দেখা যাচ্ছিল? — ‘এরা ভীতু এরা অলস হয়ে পড়েছে, শহর থেকে পালিয়ে জঙ্গলে ফলমূল খাচ্ছে’। ভেতরে চলছে নিজেকে যাচাই করার পরীক্ষা। আত্মসম্মান, স্বনির্ভরতা এবং কৃচ্ছ্রসাধন। সত্যাগ্রহীরা কি করছে? আইন অমান্য করছে, জেলে যাচ্ছে, ছাড়া পাচ্ছে, ফার্মে স্বশ্রমে থাকছে। আবার জেল যাত্রা। এসবের সঙ্গে থাকছে যথাযথ প্রচার আন্দোলন। এও শুদ্ধ। কার মেরুদণ্ড আছে, কার নেই — এমনটা খোঁজা কি বলা নয়।
এইসময়ই এই সংখ্যাটি উঠে এসেছে — ‘গোখেল অঙ্কশাস্ত্রী। আমাদের শান্তিসৈনিকের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সংখ্যা তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন। এর সঙ্গে যোদ্ধাদের নামও দাখিল করতে বললেন। যতদূর মনে পড়ে যে এই সংখ্যাটা সর্বোচ্চ ৬৫ কি ৬৬ আর সর্বনিম্ন ১৬ জন হবে বলে তাঁকে লিখেছিলাম’। আর সত্যাগ্রহ শাস্ত্র সম্পর্কে তাঁর এই ধারণা জেগেছিল —
‘সত্যাগ্রহীর ভালভাবে একথা জেনে রাখা প্রয়োজন যে, তাদের মধ্যে যদি একজনও এমন থাকেন যিনি স্ফটিকের ন্যায় শুদ্ধ, তবে তার আত্মোৎসর্গ লক্ষ্যপূরণের পক্ষে যথেষ্ট। পৃথিবী সত্যের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অসত্যের অর্থ মিথ্যা এবং যা অসৎ বা অস্তিত্ববিহীন তাও বটে। সত্যের অর্থ সৎ অর্থাৎ যা আছে। অসত্যের যখন অস্তিত্বই নেই তখন এর সফলতার প্রশ্নই ওঠে না। আর সত্যের অর্থ যখন সৎ বা যার অস্তিত্ব আছে, তখন কখনও তার বিনাশ নেই। এই সংক্ষেপে সত্যাগ্রহের শাস্ত্র’।
একটু ‘পিছিয়ে পড়া’ আন্দোলন এইসময় বেগবান হয়ে উঠল দু দিক দিয়ে। রাষ্ট্র আরো কঠোর হবার অভিপ্রায়ে জানিয়ে দিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় খৃস্টধর্ম অনুমোদিত ও রেজিস্ট্রিকৃত বিবাহ বাদে আর সব বিবাহ আইনত অশুদ্ধ। ভারতীয় মহিলারা একে নিন্দনীয় অপরাধ মনে করলেন, অপমানজনক মনে করলেন। তারা পথে বার হবেন মনস্থ করলেন। এর সঙ্গে গান্ধি (এতে গোখেলের পরামর্শ ছিল) জুড়ে দিলেন তিন পাউন্ড করের বিষয়টা। এটি ১৮৯৫ থেকেই লাগু ছিল। প্রতিটি ভারতীয়কে তিন পাউন্ড কর দিতে হতো (পরিবারে যত সদস্য সবটা তিন দিয়ে গুণ হবে)। আন্দোলনে এই কর উঠিয়ে দেয়ার বিষয়টা জুড়ে গেল। মেয়েরা পথে নেমে পড়লেন তাদের অপমানের জবাব দিতে। বিনা পাসে। গ্রেপ্তার হলেন তো হলেন। যতটা যেতে পারলেন, সওদাপত্র বিকিকিনি করতে করতে, এই তিন পাউন্ড কর উঠিয়ে দেয়া ও সব ধরনের বিবাহ রীতিকে মান্যতা দেয়ার বিষয়টা বোঝাতে লাগলেন। শ্রমিকমহল্লা, বস্তি — সর্বত্র। এদিকে গ্রেফতার হচ্ছেন, জেল খাটছেন — সভ্য জনসাধারণ সেসব দেখছে, শুনছে। অন্যদিকে মজুর কৃষক সকলে ফুঁসছে। হরতাল হচ্ছে। গ্রেপ্তারের অভিলাষে এবার সকলে, সদলে। হাজারে হাজারে। মারধর, নির্যাতন। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এবং সবকিছু যথাযথভাবে লিখিত হচ্ছে, তথ্য সংগ্রহ চলছে, সারা পৃথিবীতে তা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। গান্ধি ডাক দিলেন — সেটাই ছিল চূড়ান্ত — সবাই তীর্থযাত্রীর মতো বেরিয়ে পড়ো। তীর্থযাত্রী শব্দটা গান্ধিরই দেয়া।
ডান্ডি আন্দোলনের মহড়া। ৫০০০ তীর্থযাত্রী। বেরিয়ে পড়েছে। সুশৃংখলভাবে। পরিছন্নতা, সৌহার্দ্যতা বজায় রাখতে রাখতে। মিছিল হাঁটছে। চারপাশের মানুষ দেখছে। মিছিলে সঙ্গ দিচ্ছে। মিছিল ক্রমশ ভারে ও বহরে দীর্ঘতর হয়ে উঠছে। যৎকিঞ্চিত রুটি আর গুড় নিয়ে হাঁটা। সৈনিকদের জানানো হলো —
‘নির্দিষ্টকালের জন্য কষ্টসাধ্য এই যাত্রা। যারা পারবে তারা আসবে। লড়াই কবে শেষ হবে তা ঠিক নেই। — সে কথা এবং জেলের দুঃখের কথা বললাম। কিন্তু কিছুতেই তারা বিচলিত হলেন না। নির্ভীকভাবে তারা জবাব দিলেন যে যতক্ষণ আমি তাদের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করব তারা কিছুতেই নিরুৎসাহ হবেন না। তারা কষ্ট সহ্য করতে অভ্যস্ত বলে আমি যেন তাদের প্রতি উদ্বিগ্ন না হই সে অনুরোধও করলেন’।
১৯১৩, ১৮ অক্টোবর।
হাঁটা চলছে। ধরপাকড় চলছে। এক নেতা যাচ্ছেন আর এক নেতা আসছেন। কে গেলে তারপর কে আসবে এসব আগে থেকেই ঠিক করে রাখা হচ্ছে। এত মানুষ অথচ কোনো নোংরা নেই, নেই কোনো রোগব্যাধি। সম্পূর্ণ ‘শান্তিতে’ চলছে সে মিছিল। গর্ভবতী মা-ও ছিলেন এমন উল্লেখ আছে। হাতের কাজ সমাপ্ত করে তারা আসছেন। চাষের কাজ — করে আসছেন। খনির কাজ — করে আসছেন। ইউরোপীয় অ-ইউরোপীয় সকলে বিস্মিত। সাহায্যের হাত তখন বিস্তৃততর রূপ নিয়ে এসেছে।
চলছে প্রচার অভিযান, আগের মতোই। ডিসেম্বর ১৯১৩। ভারতের ভাইসরয় হার্ডিঞ্জ প্রতিবাদ করলেন। ইংল্যান্ড এতে আলোড়িত হলো। কিন্তু রণক্ষেত্রে তার প্রভাব কই? এবার নির্বিচারে লাঠি গুলি। হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। তবু হাঁটা থামছে না। শক্তি দেখাতে দেখাতে শক্তি খুইয়ে ফেলা। ১৯১৪। অবশেষে জয়। অন্যায় যত আইন সবকিছু বাতিল করে নেয়া।
আমি আন্দোলনের পুরো বর্ণনা দিতে চাইনি। কিভাবে এই ধারার আন্দোলন গড়ে তোলা যায় তার গুণগত দিকগুলো শুধু এখানে এনেছি। পাঠক যে তিনটি বইতে এর ডিটেইল পাবেন সেগুলি হচ্ছে — ১. গান্ধির ‘দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্যাগ্রহ’, ২. রামচন্দ্র গুহ’র ‘গান্ধি বিফোর ইন্ডিয়া’ এবং ৩. ‘বাপু হাঁটছেন’ (এই বইটি আমারই সম্পাদিত, এখানে বাপুর তিন সময়ের তিনটে হাঁটার বর্ণনা আছে, বইটি কলেজ স্ট্রিটে ‘এবং মুশায়েরা’য় পাওয়া যায়)।
সারাৎসার তাই। এক, শুদ্ধ ও সুস্থ পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে একটি পথ চলা। টাকাকে তার বিষদাঁত ফোটাবার সুযোগ না দিয়ে স্বনির্ভর জীবনে যাওয়া। হাতে হাত ধরে। আর ধরিত্রীর সেবাসহচর্যে। এ এক লাগাতার প্রক্রিয়া। নিজেকে নিঃস্ব করতে করতে বিশ্ব হয়ে ওঠা। দুই, অন্যায় যদি কিছু দেখি, অন্যায্য যদি কিছু দেখি, তার সৎ প্রতিবাদ, রাষ্ট্রের নিয়মের মধ্যে থেকে অনিয়মকে চিহ্নিত করে, অথচ সামান্যতম ঘৃণা বিরক্তি ভয়ের উদ্রেক না হওয়া। এও এক লাগাতার চলা। তিন, সেই পথ যা চলতে চলতে হয়ে উঠল এক অনন্যোসাধারণ পথ — দক্ষিণ আফ্রিকায়।
প্রশ্ন এরপর — কাগজ দেখাব, না, দেখাব না? দেখাব। যা আছে তা দেখাব। তারপর রাষ্ট্র-নির্দেশিত কাগজের অভাবে যদি ভোটাধিকার ছাপিয়ে ঘুসপেটিয়া চিহ্নিতকরণ হয়, তখন ভেতরের বাপু কি করবেন? চটজলদি বিচারে বাপু যে ভণ্ড তপস্বী তা বুঝতে অন্য কোনো বই না পড়লেও চলে, তাঁর বই পড়লেই বোঝা যায়। দক্ষিণ আফ্রিকাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি, খেয়েও ছিলেন লাঠির ঘা! সমস্যা হয় তাদের, যারা, রবীন্দ্রনাথ হয়ে গান্ধিতে যান, যারা আইনস্টাইন, বার্নার্ড শ, রমাঁ রলাঁ পার করে গান্ধিতে যান। আবার সেখানেও আরেকটা মুশকিল তৈরি হয়। এটাই সবচেয়ে বড় রকমের ঝামেলা। বাপুকে বুঝতে হলে নিজেকে কিছুমাত্র হলেও শুদ্ধ হতে হয়, তাঁর পথ-প্রক্রিয়ায় আসতে হয়। ভেতরের বাপুকে জাগাতেই হয়। একটা প্লেজ না নিলে চলে না।
তাই ঘুসপেটিয়া যদি আমি হই তো উত্তম। তবে কিনা, আমি খাঁটি ঘটির পো, ফলে সে সম্ভাবনা কিছুটা হলেও কম। তাই এটাই আমার প্লেজ — আমার সঙ্গে আছেন এমন সহ-নাগরিক, যাকে আমি চিনি, জানি, ভরসা করি, তিনি যদি উইপোকা হয়ে যান, তার সঙ্গে, তার পরিবারের সঙ্গে আমি থাকব। জড়িয়ে থাকব। রাষ্ট্রকে জানাব, তার পরিবারের ভালো-মন্দের দায় আমার দায়। সে যা ভালো করবে তাতে তো সমাজ সমৃদ্ধ হবে। আর সে যদি খারাপ কিছু করে, তার দায় আমি নেব। অবশ্যই তাকে এবং আমাকে রাষ্ট্রীয় নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে (আয়কর, জিএসটি যেমন দিয়ে চলি)। তাকে শুদ্ধ হতে হবে, সৎ হতে হবে, পরিশ্রমী হতে হবে। জীবনযাপনের জন্য তো প্রথম আন্দোলনটি চলমান।
যারা ঢুকেছেন তারা রুজি রুটি নিরাপত্তা ও সুসাংস্কৃতিক আশ্রয়ে এসেছেন। আবার এ কথাও অন্যায্য নয় যে, রাষ্ট্র কেন ভিনদেশীদের জন্য তার আশ্রয় উন্মুক্ত রাখবে। কিন্তু তারা তো ভিনদেশী এখন নন — তারা এদেশে এসেছেন (কিভাবে? কোন পথে?), কাগজপত্র বানিয়েছেন (কিভাবে? কারা রাষ্ট্রীয় কাগজপত্র বানিয়ে দিল?) — সবেতে রাষ্ট্রের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। তাই শুভ সমাধান কি? এখন যদি তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে থাকা কাগজপত্র দেখাতে না পেরে ডি-ভোটার থেকে বে-নাগরিক হন — আপনি তো পারবেন না তাদের ভিনদেশে ছুঁড়ে ফেলতে। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইননিয়মের নানা বাধানিষেধ থাকবে। সুতরাং মানবিক হওয়াটাই কি শুভ নয়? কঠোর হোন কিন্তু শুভবুদ্ধি রাখুন। ‘ফ্রি’তে সুযোগ-সুবিধা দেবেন না। যে দামে আমি আপনি জমি কিনেছি, জিনিসপত্র দিনে জমি বাড়ি বানাচ্ছি, তাদের সেটা দিতে হবে, তা সে রেল লাইনের পাশে ঝুপড়ি বানিয়ে থাকুক বা যেখানে খুশি। জবরদখল নয়, বাজারদর দিয়েই তা পজেস করতে হবে। রাষ্ট্রকে ট্যাক্স দিতে হবে, যাতে সেই ট্যাক্সের টাকায় সর্বসাধারণের খাদ্য স্বাস্থ্য শিক্ষা কৃষ্টির সুরাহা মেলে। এককালীন দিতে না পারলে ঋণী হয়ে ধাপে ধাপে শোধ করতে হবে। প্রয়োজনে রাষ্ট্র তাদের দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজোপযোগী সামাজিক কাজে বাধ্যতামূলক অংশ নিতে বলুক — আমি নিজে এমন স্বেচ্ছাশ্রম দিতে রাজি (আমার দৌড় অবশ্য গাছ লাগানো — কোথায় গাছ লাগাতে হবে বলুন, লাগাব, যত্নআত্তি করব)। তারা পরিচ্ছন্নতা শিখবে, সামাজিকতার চর্চা করবে, ধরিত্রীর সেবা করবে। শুদ্ধতা শিখবে। অসুবিধা কোথায়? আমি মনে করি দু ধারার মানুষ এখানে জুড়ে আছেন। একদল ভয় দেখিয়ে ব্যবসা বাড়াতে চাইছেন। আরেক দলের সে ক্ষেত্রে উচিত শুভবুদ্ধির ওপর ভরসা করে স্বামীজির পথ, চোখের জল মোছানোর পথ খুঁজুক, করুক এবং বলুক। আপনি যদি স্বামীজিকে যথার্থ মনে করেন তাহলে, কঠোর হয়েই, কোনরকম ছাড় না দিয়েই, ‘বে-নাগরিক’দের মেইনস্ট্রিমে আনার কথা রাষ্ট্রকে বলতে থাকুন, রাষ্ট্রের ওপর ছেড়ে না দিয়ে। রাষ্ট্রকে শুভ কথা বলার আগ্রহ আমাদের থাকা উচিত, কেবল খুঁত না ধরে। মাথা উঁচু করে আমরা সবাই থাকব। তার জন্য আমাদের রাষ্ট্রকে নিরাপত্তার শক্তিতে এবং সাংস্কৃতিকে বলীয়ান করার মন্ত্র আমাদের নিতে হবে। আজকে ভারত-রাষ্ট্র নিরাপদ ও রুচিশীল বলেই সবাই ভিনদেশ থেকে এখানে আসছেন। সেই নিরাপত্তা আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে রক্ষা করতে হবে। করতে হবে এবং বলতে হবে। একদিকে একটা-দুটো পরিবারকে নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করা যাক, রাষ্ট্রকে জানিয়েই রাষ্ট্রের সুকাঠামো লংঘন না করে। সেইমতো রাষ্ট্রকে বলার চেষ্টা করা যাক এই মানবিক উদ্যোগ নিয়ে। শুভ বুদ্ধি তাই বলে।
সুহৃদজন শুনবেন? ধর্মাচরণ করতে করতে বিশ্বকে শেখাবেন সৎধর্ম? বিশ্ব ভারতের থেকে এই বাণীটাই শুনতে চায়। বুদ্ধ গান্ধি রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দ — এই ভারতেরই।