সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
আত্মদীপের উজ্জ্বল আলোয় ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল ১, রাতের অন্ধকারে যুদ্ধক্ষেত্রে ঘুরতেন। হাতে প্রদীপের আলো, মুমূর্ষু কোনো সৈনিকের মুখে দিতেন জল, নিবারণ করতেন তাঁর তৃষ্ণাটুকু। তাঁরই যোগ্য উত্তরাধিকারী মাদার টেরিসা২ , মৃত্যু অপেক্ষায় থাকা পথবাসীদের জন্য তাঁর ‘নির্মল হৃদয়’। সেখানে তাদের শেষ সেবাটুকু দিতে চেয়েছেন। কত অবাঞ্ছিত বা অবৈধ নবজাতক আশ্রয় পেল ‘মিশনারিজ অফ চ্যারিটিজ’-এর স্নেহভরা কোলে, আর দেশে-বিদেশে না জানি কত না নিরাশ্রয় আশ্রয় পেল।
এমন সব মানবহৃদয়ের কথা স্মরণে এলে, দূরে থাকেন না আইরিশ কন্যা মিস মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল। তাঁর জন্মস্থান আয়ার্ল্যান্ড, পিতা ও পিতামহ উভয়েই ধর্মযাজক ছিলেন। কর্মসূত্রে ৩৪ বছর বয়সে পিতা সপরিবারে ম্যানচেস্টার শহরে আসেন। তাঁর অকালমৃত্যু হলে মার্গারেটের মা মেরী তিন পুত্রকন্যাকে নিয়ে আয়ার্ল্যান্ডে পিতৃগৃহে ফিরে আসেন। সেখানে হ্যালিফ্যাক্স বিদ্যালয়ে মার্গারেটের পড়াশুনো শুরু হয়। বিদ্যালয়ে থাকাকালীন যেমন তাঁর সঙ্গীত ও কলাবিদ্যার প্রতি আকর্ষণ ছিল, তেমনি উদ্ভিদ ও পদার্থবিদ্যার প্রতিও। বিদ্যালয়ের পাট সমাপ্ত হলে শিক্ষকতার মাধ্যমে যেমন কিছু করার দিকে তাঁর মন ঝুঁকেছিল, তেমনি জনসেবার প্রতিও। ইতিমধ্যে তাঁর ছোট বোন লিভারপুলে শিক্ষকতার কাজ নেন এবং তাঁদের পরিবার এই শহরেই বসতি করেন। মার্গারেট তাঁর কর্মস্থল চেস্টার থেকে সেখানে যাওয়া-আসা করতেন। যুগ যুগ ধরে মার্গারেট নোবেল আমাদের কাছে পরিচিত হয়ে আছেন স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা বলে। স্বামিজী তাঁকে এই পরাধীন দেশে মেয়েদের শিক্ষাদানের ব্রতে দীক্ষিত করেছিলেন।৩
সন্ধ্যার আকাশে ফুটে ওঠে সন্ধ্যাতারা, আসন্ন প্রভাতের বুকে তারাই শুকতারা রূপে দেখা দেয় প্রতিদিন। ভগিনী নিবেদিতার জীবনে স্বামী বিবেকানন্দ সেই চিরউজ্জ্বল শুকতারার মতো।
তোমারে করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা৪
উনবিংশ শতাব্দীর তখন শেষ দশক, ১৮৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শিকাগো শহরে আয়োজিত ‘পার্লামেন্ট অফ রিলিজিয়ান’ -এ যোগ দিতে স্বামী বিবেকানন্দ তখন আমেরিকায় এসেছিলেন। ‘হিন্দু ধর্ম’ সম্পর্কে তাঁর ভাষণ শ্রোতাদের এতই মুগ্ধ করেছিল যে, এরপর বিভিন্ন শহরের ছোট-বড় সভায় এই সন্ন্যাসীর বক্তৃতা অত্যন্ত সমাদৃত হয়। সে দেশের অনেক মানুষকেই তা যথেষ্ট প্রভাবিত করে।
স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৫ সালে ইংল্যান্ডে পৌঁছলেন। এই হিন্দু যোগী সম্পর্কে সেখানে অনেকেই কৌতূহলী হয়ে উঠছিলেন। লেডি মার্জেসন৫ তাঁর বাড়িতে তাঁকে কিছু বলার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন, সেই ঘরোয়া সভায় আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন গৃহকর্ত্রীর কিছু পরিচিত মানুষ, তার মধ্যে মার্গারেটও ছিলেন। অল্প বয়স থেকেই মার্গারেটের মন মানববিদ্যার প্রায় সকল বিষয়েই আকর্ষণ বোধ করত। শিশু-শিক্ষণ পদ্ধতি থেকে ধর্মচর্চার আন্তরিক পথ, আবার কলাবিদ্যা ও সেইসঙ্গে বিজ্ঞানচর্চার নানা দিকের প্রতি মার্গারেট যথেষ্ট কৌতূহলী ছিলেন।
লেডি মার্জেসনের বাড়িতে মার্গারেট প্রথম যেদিন স্বামী বিবেকানন্দকে দেখেছিলেন, শুনেছিলেন ভারতীয় ধর্ম ও দর্শন সম্পর্কে তাঁর আলোচনা, ‘The master as I saw him’ ৬ গ্রন্থে তা তিনি এভাবে বিবৃত করেছেন:
‘The time was a cold Sunday afternoon in November and the place, it is true, a west end drawing room. But he was seated, facing a half circle of listeners with the fire on the hearth behind him, as he answered question after question, breaking now and then into the chanting of some Sanskrit text in illustrations of his reply, the scene must have appeared to him. While twilight passed into darkness, only as a curious variant upon the Indian garden, or on the group of hearers gathered at sundown, round the Sadhu who sits beside the well, or under the tree outside the village bounds ... only this time we were but fifteen or sixteen guests, intimate friends, many of us, and he sat amongst us in his Crimson robe and girdle, as one bringing us news from a far land with a curious habit of saying now and again “Shiva! Shiva.’৭
এরপরেও মার্গারেট তাঁর স্বদেশে স্বামিজীর বেশ কয়েকটি বক্তৃতা শোনেন। কিন্তু সেইসব সভায় সেই প্রথম ঘরোয় ক্ষুদ্র সমাবেশে স্বামিজীকে যেমন দেখেছিলেন, তেমনভাবে পাননি। সেই প্রসঙ্গে নিজেই বলেছেন,
‘Never again in England did I see the Swami as a teacher in such simple fashion. Later, he was always lecturing, or the questions he answered were put with formality by member of larger audiences.’৮
স্বামিজী হিন্দুধর্মের বিচিত্র চরিত্রের যে ব্যাখ্যা সেইসব সভায় দিচ্ছিলেন, মার্গারেটের অন্তর যে সেইসব প্রথম দর্শনেই গ্রহণ করতে পেরেছিল তা নয়, তবু স্বামিজীর ব্যক্তিত্ব ও তাঁর বিশ্লেষণাত্মক ধর্মব্যাখ্যা শুনতে শুনতে, স্বামিজী ইংল্যান্ড ছেড়ে পুনরায় আমেরিকা পাড়ি দেবার পূর্বেই, মার্গারেটের অন্তর স্বামিজীকে ‘My master’ বলে গ্রহণ করেছিল।
‘The time came before the Swami left England, when I addressed him as ‘Master’. I had recognised the heroic fibre of the man and desire, to make myself the servent of his love for his own people. But it was his character to which I had thus done obeissence.’৯
মার্গারেট লক্ষ করেছিলেন, যদিও স্বামিজী একজন ধর্মীয় শিক্ষাগুরু, কিন্তু নির্দিষ্ট ধর্মচিন্তা প্রচারই তাঁর উদ্দেশ্য নয়। বাস্তবিক যা ফলপ্রসূ নয়, সে যতই প্রতিষ্ঠিত ধর্মমত হোক, যথার্থ কারণ না থাকলে সে মতকে প্রয়োজনে বর্জন করতে তাঁর মনে কোনো দ্বিধা নেই। এই উপলব্ধি থেকেই মার্গারেট মন থেকে সব দ্বিধা সরিয়ে অন্তরে অন্তরে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন।
‘... And to the extent that this recognition implies, I became his disciple.’১০
বলা বাহুল্য, অতি সাধারণ মানুষের জীবনপথও এতটা মসৃণ নয়, এই দুটি মানুষের জীবন সম্পর্কেও অবশ্যই সে কথা প্রযোজ্য। জগদীশ ভট্টাচার্য তাঁর ‘বিবেকানন্দের মহাপ্রয়াণে রবীন্দ্রনাথের কবিতা’ প্রবন্ধে বলেছেন—
“বয়সে চার বছরের বড় এই তরুণ সন্ন্যাসীকে দেখে নিবেদিতার চিত্তে যুগপৎ উদিত হল শ্রদ্ধা ও অনুরাগ। কিছুদিন লন্ডনে থেকে স্বামিজী নভেম্বরে চলে গেলেন আমেরিকায়। ফিরে এলেন ১৮৯৬ সনের এপ্রিলে। ততদিনে নিবেদিতার চলেছে নিরলস আত্মপরীক্ষা। নিবেদিতা তাঁর জীবনকে স্বামিজীর সঙ্গে এক করে দেবার স্বপ্ন দেখলেন। স্বামিজীকে স্বামীরূপে পাবার একটি সুকুমার বাসনা তাঁর চিত্তে মুকুলিত হয়ে উঠল। তাহলেই তো তিনি হতে পারবেন স্বামিজীর ডান হাত। একদিন শরমে সম্ভ্রমে নিবেদিতা তাঁর বাসনাকে ভাষা দিলেন বিবেকানন্দের কাছে। (...) সন্ন্যাসীকে স্পর্শ করল কুমারীর অনুরাগ। কিন্তু তিনি তাঁকে পরিত্যাগ করলেন না; তাঁর চিত্তকে পরিশুদ্ধ করে তাঁকে করলেন আজীবন ব্রহ্মচারিণী, শিবের কাছে সর্বস্বনিবেদিতা তপস্বিনী উমা।”১১
‘The Master as I Saw Him’ গ্রন্থে একথাও স্মরণ করেছেন যে, বহু ধর্মপ্রচারকের বক্তৃতা তিনি তাঁদের প্রচারবেদীতে বসেই শুনেছেন, কিন্তু স্বামিজী যেভাবে অত্যন্ত সাধারণ মানুষকেও আহ্বান করে বলতেন— তার নিজের মধ্যে যা মহত্তম বা শ্রেষ্ঠ, তাই তাকে দিতে হবে, তেমন কথা অন্যের ভাষণে তিনি কখনো শোনেননি।
“He was, to his own thinking at least, as clearly an apostle, making an appeal to men, as any poor evangelical preacher, or salvation Army Officer, calling on the world to enter into the Kingdom of the God. And yet he took his stand on what was noblest and best among us.”১২
ওই বছর ডিসেম্বরে স্বামিজী যখন আবার আমেরিকায় ফিরে গেলেন, তখন মার্গারেট ভারতীয় ধর্ম ও দর্শন বিষয়ে স্বামিজীর জ্ঞানের যে বিশাল পরিধি, তা যেমন অনুভব করতে পারছিলেন, তেমন এটাও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে, ইউরোপে স্বামিজী যে ভাবধার বহন করে এনেছেন তা অতুলনীয়।
স্বামিজী পুনরায় লন্ডনে ফিরে এলে মার্গারেট বিভিন্ন সভায় তাঁর বক্তৃতা শোনবার অবকাশ পেয়েছিলেন। এক সভায় তিনি বজ্রকঠিন কণ্ঠে শ্রোতাদের মধ্যে ২০ জন এমন পুরুষ ও নারীকে অগ্রসর হয়ে আসবার আহ্বান জানালেন যাঁরা সমস্ত জীবন মানবকল্যাণে উৎসর্গ করবেন।
সমসময়ে এক ভক্তকে তিনি লিখেছিলেন—
“The world is in need of those whose life is one burning love—selfless. The life will make every word tell like a thunderbolt. Awake, Awake, great souls! The world is burning in misery. Can you sleep?”১৩
লন্ডনে একদিন কথা প্রসঙ্গে স্বামিজী তাঁকে বলেন—
“I have plans for the women of my own country in which you, I think, could be of great help to me,” and I (Nivedita) knew that I had heard a call which would change my life.”১৪
এর পরের উল্লেখযোগ্য ঘটনা মার্গারেটের ভারতযাত্রা, স্বদেশ ত্যাগের পূর্বমুহূর্তে স্বামিজীর যে চিঠি মার্গারেটের হাতে পৌঁছেছিল, তাতে তিনি লিখেছিলেন—
“I will stand by you unto death, whether you work for India or not, whether you give up Vedanta, or remain in it. The tusks of the elephant come out, but they never go back. Even so are the words of a man.”১৫
দীর্ঘ সমুদ্রপথ অতিক্রম করে ‘মম্বাসা’ জাহাজ মাদ্রাজ বন্দরে উপনীত হল ২৪ জানুয়ারি ১৮৯৮। আরো চারদিন পর ২৮ জানুয়ারী কলকাতা বন্দরে সে জাহাজ ভিড়ল, স্বামী বিবেকানন্দ স্বয়ং জেটিতে উপস্থিত থেকে মার্গারেটকে অভ্যর্থনা জানালেন।
প্রথম কয়েকদিন চৌরঙ্গী অঞ্চলে বাস করলেও পরে স্বামী বিবেকানন্দের অনুরাগী মিস জোসেফিন ম্যাকলাউড১৬ ও মিসেস ওলি বুল১৭ এসে পৌঁছলে মার্গারেট তাঁদের সঙ্গে বেলুড়ে রামকৃষ্ণ মঠের জন্য প্রস্তাবিত জমির অন্তর্গত একটি পুরনো বাড়িতে আশ্রয় পেলেন।
সেবছরই ২৭ মার্চ স্বামী বিবেকানন্দ মার্গারেটকে ব্রহ্মচর্যব্রতে দীক্ষা দিলেন, নতুন নামকরণ করলেন ‘নিবেদিতা’। উক্ত গ্রন্থে স্বামিজীর ব্যক্তিত্ব ও জীবন সম্পর্কে নিবেদিতা যা জেনেছিলেন, স্বামিজীর অতীত জীবন, রামকৃষ্ণদেবের কাছে দক্ষিণেশ্বরে তাঁর আগমন, তাঁর জীবনে গুরুর প্রভাব, বিশেষ করে সন্ন্যাস জীবনে তাঁর ভারত পরিক্রমা, বেলুড় মঠে গুরুভাইদের সঙ্গে তাঁর দিনযাপন ইত্যাদি বহু প্রসঙ্গ তাঁর বিস্তৃতভাবে জানা হয়েছিল, স্বামিজীর প্রথম শিষ্য স্বামী সদানন্দের কাছে১৮। তাঁর গ্রন্থে নিবেদিতা কলকাতার জেটিতে নেমে পর্যন্ত স্বামিজীকে ইতিপূর্বে যেমন তিনি নিজে দেখেছিলেন, আর এমন যেমন দেখছেন, তা তাঁকে যে বিস্মিত ও হতবাক করেছে, সে কথা বলেছেন। কোথায় সেই ভারতীয় ধর্ম ও দর্শন ব্যাখ্যাতা, শান্ত-প্রফুল্ল মনে জিজ্ঞাসুর প্রশ্নের উত্তরদাতা তরুণ সন্ন্যাসী! এখন যাঁকে নিবেদিতা দেখছেন তিনি যেন জালে আটকে পড়া সিংহের মতো ছটফট করছেন। পশ্চিমি দুনিয়া স্বামিজীকে দেখেছিল ‘Apostle of Hinduism’ রূপে, সময় পেলেই তাদের কাছে তিনি ভারতীয় ইতিহাসের যুগের পর যুগ ব্যাখ্যা করেছেন, কখনো বা আলোচনা করতে করতে তাঁর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়তে দেখা যেত।
“From the moment of my landing in India, however, I found something quite unexpected underlying all this. It was not Ramakrishna Paramahamsa, nor even the ideas which were connected with him, that formed so strong a revelation here. It was the personality of my master himself, in all the fruitless struggle and torture of a lion caught in a net. For, from the day that last serene moment, when at the hour of cowdust, he passed out of this village of world, leaving the body behind him, like a folded garment. I was always conscious of this element inwoven with the other, in his life.”১৯
১৮৯৮-র গ্রীষ্মে আলমোড়ায় সেভিয়ার দম্পতির২০ অতিথি হয়ে স্বামিজী, মিসেস ওলি বুল, জোসেফিন ম্যাকলাউড, কলকাতার এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান অফিসারের স্ত্রী ও নিবেদিতাকে সঙ্গে নিয়ে একমাস ছিলেন। তারপর পাটনা, কাশী, লক্ষ্ণৌ প্রভৃতি প্রাচীন শহর দেখে তাঁরা কাশ্মীরে যান। নানা অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এই ভ্রমণের বেশ খানিকটা বিবরণ নিবেদিতা দিয়েছেন তাঁর গ্রন্থে।
আলোচ্য গ্রন্থে ‘The Awakener of Souls’ ও ‘Flashes from the Beacon Fire’ বলে দুটি অধ্যায় আছে, যেখানে নিবেদিতা গুরু সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব উপলব্ধির বিষয়ে বলেছেন, আর বলেছেন স্বামিজীর আরেক শিষ্য স্বামী স্বরূপানন্দের২১ কাছে যেমন তিনি বাংলা শিখছিলেন, তেমনি আধ্যাত্মিক জীবনের পথে অগ্রসর হবার জন্য যা করণীয় তার ইঙ্গিত পাচ্ছিলেন এবং হিন্দুধর্মচর্চায় সেই ইঙ্গিতগুলি বিনা বিচারে অবশ্যপালনীয় বলে গ্রহণ করেছিলেন। বন্ধু নেলকে লেখা চিঠিতে নিবেদিতা স্বরূপানন্দকে ‘বন্ধু’ বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু একথাও অনুক্ত রাখেননি যে স্বামিজী যাকে চিঠিতে ‘King’ বলে উল্লেখ করে থাকেন কিন্তু বহিরঙ্গ সর্বস্ব বিভিন্ন আচরণবিধি বা পশুচর্মের আসনে বসে ধ্যান করলেই মনকে সহজে বাইরের সব কিছু থেকে সরিয়ে এনে কেন্দ্রস্থ করা যায়, এসবের প্রতি তাঁর আস্থা ছিল না।
অর্জিত যা হচ্ছিল, তার সঙ্গেই তাঁর নিজস্ব অত্যন্ত প্রিয় বিশ্বাস ও ভাবনা, যা পরিত্যাগ করবার আহ্বান সেইসব উপদেশের মাধ্যমে তিনি পাছিলেন, তা তাকে অনেকটাই বিচলিত করছিল। এর মধ্যে একদিন তাদের দলের যিনি সবচেয়ে বয়স্কা মহিলা ছিলেন, সম্ভবত মিসেস ওলি বুলের কথাই বলা হচ্ছে, নিবেদিতার সদানিপীড়িত ব্যথিত চিত্তের আভাস পেয়ে স্বামী বিবেকানন্দকে সেকথা বললেন। স্বামিজী স্মিতমুখে বললেন—
“You were right. There must be a change. I am going away into the forest to be alone, and when I come back I shall bring peace.”২২
সেদিন শুক্লপক্ষের প্রথম সন্ধ্যা, স্বামিজী আকাশের দিকে তাকিয়ে উল্লসিত কণ্ঠে বললেন—
'“See! the Mohammedans think much of the new moon. Let us also with the new moon begin a new life!” As the words ended, he lifted his hands and blessed, with silent depths of blessings, his most rebellious disciple, by this time knelling before him…'২৩
পরবর্তী ঘটনার অভিঘাত নিবেদিতাকে এক নূতন উপলব্ধিতে উপনীত করেছিল, তাঁর বর্ণনায় যা পাই তা এই—
“That evening at Almora, I proved the truth of his Prophecy. For alone, in meditation, I found myself gazing deep into an Infinite Good, to the recognition of which no egoistic reasoning had let me, I learnt, too, on the physical plane, the simple everyday reality of the experience related in the Hindu books on religious psychology. And I understood for the first time, that the greatest teachers may destroy in us a personal reclamation only in order to bestow the impersonal vision in its place!”২৪
পরবর্তী অধ্যায় ‘Flashes from the Beacon Fire’।
নিবেদিতা আপন ভাবের সাগরেই আরো যেন বেশি করে ডুবে আছেন। স্বামিজী যখন একাকী দূরে চলে গেলেন, জঙ্গলের ধারে একটা তাঁবুতে তাঁর দলের বাকি সদস্যরা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। স্বামিজী ফেরার পরে নানা কথার আলোচনার মধ্যে একদিন হাউসবোটে এই কথাটা উঠল যে, এবার এই দলের অনেকেই পশ্চিমে তাঁদের আপন আপন গৃহাভিমুখী হবেন, শুধু একজনই এই দেশে থেকে যাবেন।
তাঁর দিকে ফিরে স্বামিজী বললেন, “কিন্তু এমন মনমরা কেন! তোমাদের দেশে আমি দেখেছি, সব মানুষই বাইরে উৎফুল্ল, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তারা দুঃখের ভার বহন করে চলে, মন তাদের অবিরত কাঁদছে। আর এদেশে আমাদের দেখো, বাইরে অভাবগ্রস্ত, হাজারো সমস্যার মুখোমুখি, কিন্তু সেসব নিয়ে ভ্রুক্ষেপমাত্র না করে আমাদের অন্তরে আনন্দস্রোত প্রবহমান।”২৫
আর একদিনের কথা লিখেছেন নিবেদিতা, সেদিন সকলে নদীর ধারে একটি বড় গাছের তলায় বসেছিলেন, নানা কথার মধ্যে স্বামিজী একসময় বললেন—
“I am persuaded that a leader is not made in one life. He has to learn for it. For the difficulty is not in organisation, and making plans; the test, the real test of a leader lies in holding widely different people together, along the line of their common sympathies. And this can only be done unconsciously, never by trying.”২৬
বিভিন্ন জনের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে স্বামিজী সেদিন বিবিধ বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। তারপর বিশেষ একজনের দিকে লক্ষ করে বললেন—
“And so you see, all this is but a feeble manifestation of the great ideas in you, and here is an attempt to manifest it! The attempt falls short still in many ways— still go on! You will interpret the ideal some day.”২৭
আর একদিন ভিন্ন এক প্রসঙ্গে বললেন—
“I cannot feel the longing to get out of life that Hindus feel.”২৮
ভ্রমণপথেই স্বামিজী স্থির করেছিলেন অমরনাথ দর্শন করবেন আর সঙ্গে নেবেন তাঁর কন্যাকে। একথা শুনে দলের সকলেই খুব খুশি হয়েছিলেন, অন্যত্র নিবেদিতা প্রসঙ্গত বলেছেন, “এদেশের সকলের কাছেই আমি স্বামিজীর মানসকন্যা বলে পরিচিত।”২৯
এই প্রসঙ্গে অন্য একটি প্রবন্ধের অংশবিশেষ উল্লেখ করতে চাই—
“কিন্তু এই অধ্যাত্মিক পিতাকন্যার সম্পর্কে পৌঁছতে নিবেদিতাকে কম যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়নি, প্রথম দর্শনে তিনি স্বামিজীকে দয়িতরূপেই কামনা করেছিলেন। ভারতে আসার প্রথমদিকে সম্পর্কটি ছিল অন্তহীন বিরোধ ও সংঘাতের, স্বামিজীর ভর্ৎসনা ও নির্মমতা এমন তীব্র হয়ে উঠেছিল যে, স্বামিজীর অন্যান্য শিষ্যাদেরও আশঙ্কা হয়েছিল, এতটা আঘাত নিবেদিতারও সহ্যশক্তির পক্ষে দুঃসহ ও দুর্বহ হবে। যতদিন যাচ্ছিল ততই নিবেদিতা বুঝতে পেরেছিলেন এ সম্পর্কের মধ্যে ব্যক্তিগত মাধুর্যের কোনো স্থান নেই।”৩০
অমরনাথ যাত্রার পূর্বে শুক্লপক্ষের প্রথমে তিথিতে নিবেদিতা স্বামিজীর আশীর্বাদ লাভ করেছিলেন, সে প্রসঙ্গ আমরা আগেই পেয়েছি।
জগদীশ ভট্টচার্য এর পরে আধ্যাত্মিক সম্পর্কের যে বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর প্রবন্ধে, সেই মূল্যবান আলোচনারও এখানে উল্লেখ প্রয়োজন—
“ব্যক্তিসম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে ব্যক্তিচেতনামুক্ত এই ভাবদৃষ্টি অধ্যাত্মচেতনারই দ্যোতক। সে স্তরে সমস্ত লৌকিক সম্পর্কই অর্থহীন ও অসম্পূর্ণ বলে দেখা দেয়। সে সম্পর্ককে কোনো লৌকিক নামেই চিহ্নিত করা যায় না, এক অতীন্দ্রিয় দিব্য করুণা ও মমতায় তা পূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই স্তরে বীতরাগ বিবিধ সন্ন্যাসীর কাছে তাঁর প্রিয়শিষ্যা সর্বমমতার আধারভূতা কন্যা মূর্তিতেই সমূদ্ভাসিতা, কিন্তু বলাই বাহুল্য, এই পরিচিতিও লৌকিক পরিমিতির মধ্যেই পরিসীমিত। নিবেদিতার অন্তর্গূঢ় অধ্যাত্ম অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।”৩১
পহেলগাম থেকে অমরনাথ তীর্থযাত্রা শুরু হল, প্রায় তিনহাজার মানুষ চলেছে, সকলেই যে হিন্দু তা নয়, মুসলমান যাত্রীরাও আছেন, সাধু সন্ন্যাসীর সংখ্যা প্রায় শ-খানেক। নিবেদিতার গ্রন্থে ‘অমরনাথ’ যাত্রাপথের বিস্তৃত বিবরণ আছে।
যাত্রাপথের সকল বিধি মেনে চলেছিলেন স্বামিজী। পথে একে একে পাঁচটি নদীর বরফগলা জলে স্নান করে উপবাসবিধি মেনে জপ করতে করতে তিনি চলেছিলেন। অবশেষে অমরনাথ গুহায় যখন প্রবেশ করলেন মনে হল, তিনি যেন শিবকে সামনে দেখতে পাচ্ছেন। চারিদিকে সমবেত যাত্রীদের ‘হর হর মহাদেব’ নামোচ্চারণের মধ্যে স্বামিজী বার কয়েক সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন। তারপর নিজেকে সংযত করে নিঃশব্দে সেখান থেকে ফিরে এলেন। ফিরে এসে বলেছিলেন, সেই মুহূর্তে তিনি শিবের কাছ থেকে অমরত্বের বরলাভ করেছেন, ইচ্ছামৃত্যুর বর পেয়েছেন। স্মৃতিচারণ করতেন, শৈশবকাল থেকে এই একটি আবেগ তাঁর মনকে ঘিরেছিল যে, অনেক দূর পর্বতের কোনো শিবমন্দিরে তাঁর মৃত্যু হবে। পরেও অমরনাথ যাত্রার স্মৃতিরোমন্থন করতে গিয়ে তিনি বার বার করে বলতেন, এই গুহায় তিনি ঈশ্বরের দর্শন পেয়েছেন।
অমরনাথ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে সমৃদ্ধ অনাড়ম্বর এক তীর্থস্থান। গুহার বাইরে অসহায় মানুষদের উপর কোনো ব্রাহ্মণ পুরোহিতের উপদ্রব ছিল না। রাখিবন্ধনের দিন তাঁরা সেখানে পৌঁছেছিলেন। প্রত্যেকের হাতে লাল-হলুদ সুতোর রাখি বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। তাঁবুতে ফিরে আসার আগে তারা একটি উঁচু পাথরের উপর বসে প্রাতঃরাশ সেরেছিলেন। একসময় তাঁর দীর্ঘ মৌনতা ভেঙে স্বামিজী বলেছিলেন— “আমি কল্পনায় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, অনেকদিন আগে একদল মেষপালক এক গ্রীষ্মের দিনে তাদের ভেড়াগুলো কোথায় গেল খুঁজতে খুঁজতে এই গুহায় ঢুকে শিবলিঙ্গ দেখতে পেয়েছিল এবং গ্রামে ফিরে তারা বলেছিল, কিভাবে অকস্মাৎ তাদের সঙ্গে মহাদেবের সাক্ষাৎ হয়েছে।”৩২
নিবেদিতা অনুভব করেছিলেন, তাঁর গুরুর জীবনও এই কাহিনীর অনুরূপ। এই তুষারলিঙ্গের শুভ্রতা ও শুদ্ধতা তাঁকে চমৎকৃত ও আচ্ছন্ন করেছিল। তাঁর মনে হয়েছিল, এই বিশাল গুহা কৈলাশের মতোই রহস্যাবৃত। ‘The Master as I Saw Him’ গ্রন্থে অমরনাথ তীর্থ ভ্রমণান্তে নিবেদিতা তাঁর আনন্দের কথা বলেছিলেন। এই ভ্রমণপর্বে ৭ আগষ্ট ১৮৯৮ তাঁর বন্ধু নেলকে যে চিটি লিখেছিলেন তাতে অমরনাথ তীর্থ থেকে ফেরার পথে স্বামিজীর সঙ্গে তাঁর কথাবার্তার যে বিবরণ পাই, তা থেকে বোঝা যায় নিবেদিতা আশা করেছিলেন, স্বামিজী তাঁকে প্রত্যক্ষত মুক্তির পথে অগ্রসর করে দেবেন, চিঠির সেই অংশ এখানে উদ্ধৃত করছি—
“For him it was a wonderfully solemn moment. He was utterly absorbed though he was only there two minutes, and then he fled last emotion should get the upper hand. He was utterly exhausted too—for we had had a long and dangerous climb on foot—and his heart is weak. But I wish you could see his faith and courage and joy ever since. He says Siva gave him and Amar (immortality) and now he cannot die till he himself wishes it. I am so so glad to have been there with him. That must be a memory forever, mustn’t it? And he dedicates me to Siva too—though it’s not the Hindu way to let one share in the dedication—and since he told me so I have grown Hindu in taste with alarming rapidity.
I am so deeply and intensely glad of this revelation that he has had. But on Nell dear—it is such terrible pain to come face to face with something which is all inwardness to someone you worship and for yourself to be able to get little further than externals. Swami could have made it live—but he was lost.
Even now I can scarcely look back on those hours without dropping once more into their abyss of anguish and disappointments, but I know that I’m wrong—for I see that I am utterly forgiven by the King and that in some strange way. I am nearer to him and to God for the pilgrimage. But on for the bitterness of a lost chance—that can never never come again. For I was angry with him and wouldn’t listen to him when he was going to talk. I have a feeling, dear Nell, that you will have some strong quiet peace of comfort in your brave heart—but if you only I had not been a discordent note in it all for him! If I had myself part of it, by a little patience and sympathy! And that can never be undone. The only comfort is that it was my own loss—but such a loss!
You see I told him that if he would not have to remember that we were nothing more to each other than an ordinary man and woman, and so I snubbed him and shut myself up in a hard shell.
He was so exquisite about it. Not a bit angry—only caring for little comforts for me. I suppose he thought I was tired—only he could not tell me about myself any more! and the next morning as we came home he said, “Margot, I haven’t the power to do these things for you—I am not Ramakrishma Paramhamsa.” The most perfect because the most unconscious humility you ever saw.”৩৩
ভারতে আসার প্রথম বছরেই নিবেদিতা অমরনাথ তীর্থ দর্শনে যেতে পেরেছিলেন। গ্রীষ্মে জগদীশচন্দ্র বসুদের সঙ্গে আবার কাশ্মীর যাবার সম্ভাবনা যখন দেখা দিয়েছে ১১ এপ্রিল ১৯০৭ বন্ধু জোসেফিনকে তিনি লিখলেন— সত্যই যদি জগদীশ বসুদের সঙ্গে তাঁর কাশ্মীর যাওয়া হয়, তাহলে হয়তো আরেকবার অমরনাথ তীর্থেও যাবেন।৩৪
কাশ্মীরে থাকতেই একদিন স্বামিজী নারী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। উত্তরে নিবেদিতা আগ্রহভরে বলেছিলেন, অন্য কোনো সহযোগী ছাড়াই তিনি সম্পূর্ণ আত্মচেষ্টায় খুব ছোট আকারে তেমন একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে চান। এই প্রস্তাবে স্বামিজীর দ্বিমত ছিল না। এখানে উল্লেখ করি, এর আগে যেসব বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এই বিষয়ে ভেবেছেন তাঁদের সেইসব পরিকল্পনা সম্পর্কে নিবেদিতা যথেষ্ট ওয়াবিহাল ছিলেন। এই ব্যাপারে স্বামিজীর যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পরিচয় নিবেদিতা পেয়েছিলেন তা হল, তাঁকে মানসিক দিক থেকে প্রস্তুত হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিতে স্বামিজীর দ্বিধা ছিল না। নিবেদিতা অনুভব করেছিলেন এই বিদ্যালয় স্থাপিত হলে, প্রাথমিকভাবে তা হবে সম্ভাব্য এবং পরীক্ষামূলক। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা অর্জন শিক্ষার্থীর প্রচেষ্টা ও প্রবণতার উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। এই বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ছিল—
“But I had no definite plans or expectations, save to make some educational discovery which would be qualitatively true and universally applicable to the work of the modern education of Indian women.”৩৫
প্রসঙ্গত আমাদের মনে পড়ছে নিবেদিতা একসময় ভেবেছিলেন ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথের সহযোগে বালিকা বিদ্যালয় গড়ে তুলবেন, সে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটেনি। আরো মনে পড়ছে, নিবেদিতা নারীশিক্ষা বিস্তারের কাজে সরলা দেবীর৩৬ সহায়তার উল্লেখ করেছেন। স্বামী বিবেকানন্দ প্রথম দিকে নিবেদিতাকে ব্রাহ্মদের ব্যূহভেদ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, পরে অবশ্য তিনি নিজে এই নির্দেশ থেকে একেবারেই সরে আসেন।
সরলা দেবী নিজেই নিবেদিতার সঙ্গে পরিচয় করতে তাঁর কাছে আসেন। জোসেফিনকে লেখা একটি চিঠিতে উল্লেখ পাই, “Sarala Ghosal has just gone—after 2 hours visit.”৩৭
সরলা দেবীর মতই সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের৩৮ সঙ্গেও নিবেদিতার সম্পর্ক বেশ গাঢ় হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে বোধহয় এই পরাধীন দেশ সম্পর্কে নিবেদিতার আলোচনা হত। বিভিন্ন সময়ে বন্ধুদের কাছে লেখা চিঠিতে তারও উল্লেখ পাই।
ভ্রমণ শেষে নিবেদিতা তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করে তুলতে একলাই কলকাতায় চলে এসেছিলেন এবং ষ্টেশন থেকে একেবারেই শহরের উত্তর প্রান্তে এসে পৌঁছলেন। কিন্তু কারো বাড়িতে যে অতিথি হতে পারবেন সে সম্ভাবনা ছিল না। স্বামিজী আগেই ফিরেছিলেন, তাঁর চেষ্টায় বাগবাজার অঞ্চলে সঙ্ঘজননী সারদাদেবীর বাসগৃহে নিবেদিতা একটি ঘর পেতে পারেন এমন সম্ভাবনা ছিল। ভিন্ন জাতি ও ধর্মের কোনো মানুষকে আশ্রয় দিলে আশ্রয়দাত্রী এবং তাঁর আত্মীয়স্বজন সুদূর গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত সামাজিক নানা সমস্যার সম্মুখীন হবেন, তা জেনে নিবেদিতা যেকোনো মূল্যে এই আশ্রয় ত্যাগ করতে চাইলেন।
মায়ের বাড়ির নিকটে ১৬ নং বোসপাড়া লেনে স্বামিজীর চেষ্টায় ও প্রভাবে একটি বাড়ি তাঁর বসবাসের জন্য ধার্য হল। সঙ্গে রইলেন ‘বেট’ নামের পরিচারিকা, যিনি মার্গারেটের সঙ্গে এদেশে এসেছিলেন। পরে সিস্টার ক্রিস্টিন গ্রীনস্টাইডেল৩৯ এর বাড়িতে এসে উঠছিলেন এবং ভগিনী নিবেদিতার অকালমৃত্যুর পর তিনি এখানে যে কন্যা বিদ্যালয়ের সূচনা হয়েছিল তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। চৌরঙ্গী অঞ্চল থেকে এসে এই অপরিচ্ছন্ন পল্লিতে বাস করে নিবেদিতা শুধু নারীশিক্ষা নিয়েই চিন্তিত ছিলেন না, এই পল্লীর সাধারণ মানুষের জন্য তাঁর কাজ ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছিল। প্লেগরোগের আক্রমণ যখন ভয়াবহ, নিবেদিতা দ্বিধাহীন চিত্তে সেই রোগাক্রান্তদের মধ্যে সেবার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ডা. রাধাগোবিন্দ কর-এর বিবরণ থেকে জানা যায়—
“১৮৯৯ খৃষ্টাব্দে প্লেগ সংহারকরূপে দেখা দেয়, পূর্ববৎসর তাহার আর্বিভাব সূচনায়, বিধিব্যবস্থা—বিভীষিকা ভয়ে ভীত জনগণ শহর হইতে পলায়ন করে।... এই বৎসর ছোটলাট স্যার জন উডবার্ন আশ্বাস দেন, কোনো রোগীকে বলপূর্বক গৃহান্তরিত করা হইবে না।... সেই সময়ে একদিন চৈত্রের মধ্যাহ্ণে রোগী পরিদর্শনান্তে গৃহে ফিরিয়া দেখিলাম, দ্বারপথে ধূলি-ধূসর কাষ্ঠাসনে একজন য়ূরোপীয় মহিলা উপবিষ্টা। ইনিই ভগিনী নিবেদিতা; একটি সংবাদ জানিবার জন্য আমার আগমন প্রতীক্ষায় বহুক্ষণ অপেক্ষা করিতেছেন।
সেইদিন প্রাতে বাগবাজারে কোন বস্তীতে আমি একটি প্লেগাক্রান্ত শিশুকে দেখিতে গিয়াছিলাম। রোগীর অবস্থা সম্বন্ধে অনুসন্ধান ও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যই সিস্টার নিবেদিতার আগমন।
আমি বলিলাম, “রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন।” বাগদীবস্তিতে কিরূপে বিজ্ঞানসম্মত পরিচর্যা সম্ভব তাহার আলোচনা করিয়া আমি তাহাকে বিশেষ সাবধান হইতে বলিলাম। অপরাহ্ণে পুনরায় রোগী দেখিতে যাইয়া দেখিলাম, সেই অস্বাস্থ্যকর পল্লিতে সেই আর্দ্র-জীর্ণ কুটিরে নিবেদিতা রোগগ্রস্ত শিশুটিকে ক্রোড়ে লইয়া বসিয়া আছেন। দিনের পর দিন, রাত্রির পর রাত্রি তিনি স্বীয় আবাস পরিত্যাগ করিয়া সেই কুটীরে রোগীর সেবায় নিযুক্ত রহিলেন। গৃহ পরিশোধিত করা প্রয়োজন, তিনি স্বয়ং একখানি ক্ষুদ্র মই লইয়া গৃহে চুনকাম করিতে লাগিলেন। রোগীর মৃত্যু নিশ্চিত জানিয়াও তাঁহার শুশ্রূষায় শৈথিল্য সঞ্চারিত হইল না। দুইদিন পরে সেই শিশু এই করুণাময়ীর স্নেহতপ্ত অঙ্কে অন্তিম নিদ্রায় নিদ্রিত হইল।”৪০
রবীন্দ্রনাথের একটি গানের কথা মনে এল, তার সঞ্চারী অংশে আছে—
“আমার মুক্তি সর্বজনের মনের মাঝে,
দুঃখবিপদ-তুচ্ছ-করা কঠিন কাজে।
বিশ্বধাতার যজ্ঞশালা, আত্মহোমের বহ্নিজ্বালা—
জীবন যেন দিই আহূতি মুক্তি-আশে।”৪০ক
পাশ্চাত্যে যে পরিবেশে জন্মেছিলেন নিবেদিতা, যেখানে তাঁর জীবনের ৩০ বছর কেটেছে, স্বামী বিবেকানন্দের দুর্বার প্রভাবে ৩১ বছর বয়সে তিনি পূর্ব গোলার্ধের এই অংশে এসে পড়লেন। এখানে এসে যে ভিন্ন পরিস্থিতি ও পরিবেশের সম্মুখীন হলেন তা তাঁর নিজের ভাষাতেই ব্যক্ত হয়েছে—
“I spent all my afternoons in the mother’s room. And when the hot weather came, it was by her express command that I returned to her better arranged house, for sleeping quarters. And then I occupied no room apart, but shared the cool and simple dormitory of the others, with its row of mats, pillows and nets, against the polished red earthenware of the floor.”৪১
এরপরেও মা সারদার বাড়িতেই এক সন্ন্যাসীর, সম্ভবত স্বামী যোগানন্দের৪২ কথা বলা হয়েছে, তাঁর কাছেই নিবেদিতা বাংলা শিক্ষার পাঠ নেন।
“It was a strange household, of which I now found myself a part. Downstairs, in one of the guard-rooms beside the front-door, lived a monk, whose severe austerities, from his youth up, had brought him to the threshold of death from consumption, in the prime of manhood. To his room I used to go for Bengali lessons. In the kitchen behind, worked a disciple of his and a Brahmin cook; while to us women-folk belonged all above-stairs, with roofs and terraces, and the sight of the Ganges hard by.”৪৩
এখানেই শ্রীমা-র৪৪ ঈষৎ বিস্তৃত পরিচয় দিয়েছেন তিনি। শ্রীমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি জ্ঞান ও সারল্যের এক আশ্চর্য সফল মিশ্রণ। ক্রমে ক্রমে স্বামিজীর অধ্যাত্ম-চেতনার স্বরূপ যেন অনুধাবন করতে পারছিলেন নিবেদিতা। অধ্যাত্মবিষয়ে স্বামিজী এক জন্মশিক্ষক এমনই তাঁর মনে হত। কথাপ্রসঙ্গে নিবেদিতা একদিন বললেন, “শিব তো কল্যাণ ও রুদ্রের মিলিত রূপ, কালীকে কি তাঁর অন্তর্দৃষ্টি বলতে পারি?” তাঁর দিকে একমূহূর্ত চেয়ে থেকে স্বামিজী উত্তর দিলেন, “বেশ, বেশ, তোমার নিজের মতো করে ব্যাখ্যা কর।”৪৫
একদিন নিবেদিতা স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে জোড়াসাঁকোয় যাচ্ছিলেন, বর্ষীয়ান দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের৪৬ সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। আগের রাতে নিবেদিতা এক মৃত্যুদৃশ্যের সামনে উপস্থিত ছিলেন, তাই মৃত্যু সম্পর্কে তাঁর মনোভাব কি তা স্বামিজী জানতে চাইলেন। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ধর্মের ভিতর দিয়েই একমাত্র মানুষকে বোঝা যায়, শুনে স্বামিজী স্মরণ করেছিলেন রামকৃষ্ণদেব ঠিক এই কথাই বলতেন।৪৭ স্বামিজীর সঙ্গে এমনই নানা প্রসঙ্গের আলোচনার কথা স্মরণ করেছেন নিবেদিতা।
স্বামিজীর আদেশে তাঁর বিদেশ যাত্রার সঙ্গী হতে হল তাঁকে। দেশে থাকতেই স্বামিজীর স্বাস্থ্যভঙ্গ হচ্ছিল দ্রুতলয়ে। ফলে চিকিৎসকদের পরামর্শে পাশ্চাত্যদেশে যাওয়া স্থির করেন তিনি। জাহাজ ছাড়ল ২০ জুন ১৮৯৯। তাঁরা লন্ডনে পৌঁছলেন ৩১ জুলাই। স্বামিজী, স্বামী তুরীয়ানন্দ৪৮ সহ উইম্বলডনে নিবেদিতার মায়ের বাড়িতে অবস্থান করেন সেইসময়। ১৬ আগষ্ট দুই স্বামিজী সেখান থেকে নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। নিবেদিতা ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছলেন। মিস্টার ও মিসেস লেগেটের৪৯ আতিথ্যে ‘রিজলি ম্যানর’-এ অবস্থানকালে নিবেদিতা ‘Kali the Mother’৫০ গ্রন্থটি লেখেন, ৭ নভেম্বর তিনি শিকাগোর উদ্দেশ্যে রওনা হন।
এইসময়ে বিভিন্ন জায়গায় গেছেন তিনি, নানা মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, বিবিধ ভাবনা ও কাজের মধ্যে আছেন, ছোট ছোট সভায় বক্তৃতা করছেন, ক্রমে অনেক হিতৈষী মানুষের সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে, কলকাতায় নিজের স্কুলের জন্য কিছু অর্থ সংগ্রহের সুযোগও ঘটছে।
সে বছরই অর্থাৎ ১৯০০ সালে প্যারিসে এক বিজ্ঞান প্রদর্শনীর আয়োজন হয়, যার বিজ্ঞান বিভাগের দায়িত্ব বহুলাংশে ছিল অধ্যাপক মিস্টার গেডেসের৫১ উপর। তাঁর অনুরোধে নিবেদিতা ২৮শে জুন প্যারিসে আসেন তাঁকে কাজে সহায়তা করবেন বলে।৫২
এখানেই তাঁর সস্ত্রীক জগদীশচন্দ্র বসুর৫৩ সঙ্গে পরিচয়। স্বামী বিবেকানন্দও পরে এই প্রদর্শনী উপলক্ষে প্যারিসে এসেছিলেন। বসু দম্পতির সঙ্গে এই সহৃদয় বন্ধুত্ব সম্পর্ক আমৃত্যু ছিল নিবেদিতার।
জগদীশচন্দ্র বসুর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ বৈজ্ঞানিকদের সমক্ষে তাঁর নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে প্রতিষ্ঠিত করা। এই পর্বে অনিবার্যকারণে তাঁর শরীরে অস্ত্রোপচার হয় এবং নিবেদিতা তাঁকে উইম্বলডনে মায়ের বাড়িতে বিশ্রাম ও সেবার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। জগদীশচন্দ্র প্রায় অবিলম্বেই বিশ্রামের দিনগুলিতে সে বাড়ির রান্নাঘরকে তাঁর ল্যাবরেটরীতে পরিণত করে ফেলেছিলেন।
জগদীশচন্দ্রের আরোগ্যলাভের পর নিবেদিতা কাজ আরম্ভ করলেন, লন্ডনের পত্রিকা “ডেলী নিউজ”-এ তাঁর বক্তৃতার বিবরণ থাকত। বক্তৃতার উদ্দেশ্যে তিনি স্কটল্যান্ডেও গিয়েছেন। ভারত সম্পর্কে একটি গ্রন্থ রচনার ইচ্ছা নিবেদিতার মনে ছিল। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র দত্তও৫৪ তাঁকে এই বিষয়ে অনুরোধ করেন, ফলে এই উদ্দেশ্য সাধনে এই সময়েই নিবেদিতা ‘The Web of Indian Life’৫৫ গ্রন্থটি লিখতে শুরু করেন। বিদ্যালয়ের জন্য এই গ্রন্থ সহায়ক হবে, এমন আশাও করেছিলেন। প্যারিস প্রদর্শনীর মুখ্য পরিচালক অধ্যাপক গেডেসের অনুরোধে গ্লাসগো প্রদর্শনীতেও তিনি বক্তৃতা করেন।
ইতিমধ্যে মিসেস ওলি বুলের ইচ্ছায় তাঁর সঙ্গে নিবেদিতা নরওয়েতেও যান, সেসময় নিবেদিতার শরীর সুস্থ ছিল না, হয়তো তাই সেখানে তিনি মাস তিনেক ছিলেন।
১৯০২ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারী তিনি ভারতে ফিরলেন। আগের মতোই নানা কাজে ও পরিকল্পনায় তাঁর দিনগুলি অতিবাহিত হচ্ছিল।
প্রসঙ্গত স্বামিজীর কাছে শোনা ভারতবর্ষের ইতিহাস এবং ভারতের বিবিধ ধর্মীয় ভাব ও ভাবনার বিশ্লেষণ তাঁর ‘The Master as I Saw Him’ গ্রন্থে আছে।
স্বামী বিবেকানন্দ পাশ্চাত্য মহাদেশের নানা স্থান ঘুরে, মধ্যপ্রাচ্যের ও কয়েকটি স্থান দেখে ভারতে ফিরলেন ১৯০০ সালের শেষের দিকে। ফিরবার পথে তিনি আসাম ও ঢাকার কয়েকটি তীর্থস্থান দর্শন করেছিলেন। ক্রমেই যে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে, তা তাঁর গুরুভাইদের মতো নিবেদিতাও টের পাচ্ছিলেন। সেবছরের গ্রীষ্মকাল বেলুড় মঠে অতিবাহিত করলেও, শীতকালে তিনি বুদ্ধগয়া ও কাশীতে ঘুরে আসেন। একটু উল্লেখ করি, ৬ জানুয়ারী ১৯০২ মনীষী ওকাকুরা৫৬ মিস ম্যাকলাউডের সঙ্গে বেলুড় মঠে এসেছিলেন স্বামিজীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে, জাপান তাঁর স্বদেশ। ‘Asia is One’ এই আদর্শ প্রচারকল্পে তিনি ভারতে আসেন এবং স্বামী বিবেকানন্দকে জাপানে যাবার আমন্ত্রণ জানান। রবিজীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল বলেছেন— “মঠের কাজ ও স্বাস্থ্যের জন্য স্বামিজীর যাওয়া হয়নি।৫৭ ‘দিন অবসান হল/আমার আঁখি হতে অস্তরবির আলোর আড়াল তোল’৫৭ক
স্বামিজী ফেরার পরে বিদেশ থেকে তাঁর শিষ্যরা সকলেই তাঁকে দেখতে এসেছিলেন। কাশী থেকে ফিরে আসার পরেই কথাপ্রসঙ্গে স্বামিজী তাঁর শিষ্যদের কাছে একথা যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে বলেছিলেন যে, তিনি মনে করেন শিষ্যদের সঙ্গে তাদের গুরু যে অবিছিন্নভাবে যুক্ত হয়ে থাকবেন, এ কাম্য নয়। গুরুর অবর্তমানে শিষ্যরা দৃঢ়তার সঙ্গে আপন আপন পথ অনুসরণ করবেন এমনটাই হওয়া উচিত। নিজের ভগ্নস্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারেও এসময় তিনি যথেষ্ট মনোযোগী হয়েছিলেন। এপ্রিল, মে, জুন এই তিনমাস সম্ভবত ডাক্তারী বিধানেই তিনি একফোঁটা শীতল জলপান করেননি, সেজন্যও বেশ খুশির ভাব দেখা যেত তাঁর মধ্যে। জুন মাস শেষ হয়ে এলে তিনি বেশ বুঝতে পারছিলেন, শেষের সেদিন আসন্ন। ১১ মে নিবেদিতা, ওকাকুরা ও ক্রিস্টিন সহ মায়াবতীতে গিয়েছিলেন। কলকাতায় ফিরে আসেন ২৬শে জুন। ২৮শে জুন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে স্বামিজী বোসপাড়া লেনে তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন।
মৃত্যুর ২ দিন আগে স্বামিজী তাঁর শিষ্যাকে বলেছিলেন, “আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হচ্ছি, এক গভীর তপস্যা ও ধ্যানের ভাবে আমার মন পূর্ণ।”৫৮
সেদিন ছিল বুধবার, একাদশী তিথি। স্বামিজী সমস্তদিন কঠোর উপবাসব্রত পালন করেছিলেন, অথচ সেদিনই তিনি এই শিষ্যাকে আহারের জন্য আমন্ত্রণ করেন, নিজ হাতে পরিবেশন করে খাওয়ান।
খাদ্য তালিকায় ছিল— ভাত, কাঁঠালের বিচি ও আলু সিদ্ধ এবং শেষ পাতে ঠান্ডা দুধ, পরিবেশন করার সময় বেশ মজা করে কথা বলছিলেন স্বামিজী। খাওয়া হয়ে গেলে নিজ হাতে তাঁর হাতে জল ঢেলে দিলেন। তারপর নিজেই তোয়ালে দিয়ে তাঁর হাত মুছিয়ে দিলেন। নিবেদিতা ঈষৎ প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, “স্বামিজী, এতো আমার করবার কথা আপনাকে, আপনি কেন করবেন?” উত্তরে স্বামিজী বলেছিলেন, “যীশু তো এইভাবেই শিষ্যদের হাত ধুইয়ে দিয়েছিলেন।”৫৯
নিবেদিতা প্রায় বলতেই যাচ্ছিলেন, “সে তো সেই শেষ সময়।”৬০ বলতে গিয়েও নিরুত্তর রইলেন। শেষের দিনগুলিতে কোন দুঃখের ভাব বা বিষণ্ণতা স্বামিজীর মধ্যে ছিল না। বরং প্রকৃতির বিভিন্ন রূপ, পশু, পাখি ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতেন, কোনো বই বা দুরস্থিত বন্ধু প্রসঙ্গেও।
শুক্রবার, ৪ জুলাই, তাঁকে যেন তুলনায় অনেক স্থাস্থ্যবান ও প্রফুল্ল দেখাচ্ছিল যা কয়েক বছরে দেখা যায়নি, যেদিন গোধূলিবেলায় তাঁর শেষ নিশ্বাস পড়েছিল।
সেদিন স্বামিজী ধ্যানস্থ হয়ে বহু সময় কাটান। তারপর ব্রহ্মচারীদের তিনি সংস্কৃত পাঠদান করেন। সব শেষে মঠ থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় বহুদূর পর্যন্ত হেঁটে আসেন। ফিরলেন যখন, তখন সন্ধ্যারতির ঘণ্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। স্বামিজী নিজের ঘরে গঙ্গাভিমুখী হয়ে পুনরায় ধ্যানে বসলেন। স্বামিজীর পার্থিব জীবনের অন্তিম মুহূর্তের বর্ণনা নিবেদিতা যেমন দিয়েছেন:
“It was the last time. The moment was come that had been foretold by his master from the beginning. Half an hour went by, and then, on the wings of that meditation, his spirit soared whence there could be no return, and the body was left, like a folded vesture on the earth.”৬১
১. Florence Nightingale (১২ মে ১৮২০ - ১৩ আগস্ট ১৯১০)—
জন্ম ইটালীর ফ্লোরেন্স শহরে। তিনি একাধারে লেখিকা ও পরিসংখ্যানবিদ, কিন্তু সেবিকা পরিচয়েই তিনি অমর হয়ে আছেন। তাঁর জন্মদিন International Nurses Day হিসেবে পালিত হয়।
২. মাদার টেরিজা (২৬শ আগস্ট ১৯১০ - ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭) নাম ছিল Anjeze Gonxhe Bozaxhiu। জন্ম বর্তমান উত্তর ম্যাসিডোনিয়া দেশের স্কপিয়ে শহরে। ১৯২৯ সালে ধর্মপ্রচারক হিসেবে ভারতে আসেন। ১৯৩১ সালে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালের ৭ অক্টোবর মিশনারীস অফ চ্যারিটিজ প্রতিষ্ঠা করেন।
৩. ‘ভগিনী নিবেদিতা’ প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা, সপ্তম সংস্করণ, মে, ১৯৯৮. প্রকাশক- রামকৃষ্ণ সারদা মিশন সিস্টার নিবেদিতা গার্লস স্কুল। Page 17, Letters of Sister Nivedita, Edited by Sankari Prasad Basu, volume 1.
৪. ‘তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা’
“তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা,
এ সমুদ্রে আর কভু হব নাকো পথহারা।
যেথা আমি যাই নাকো তুমি প্রকাশিত থাকো,
আকুল নয়নজলে ঢালো গো কিরণধারা।
তব মুখ সদা মনে জাগিতেছে সংগোপনে,
তিলেক অন্তর হলে না হেরি কূল-কিনারা।
কখনো বিপথে যদি ভ্রমিতে চাহে এ হৃদি
অমনি ও মুখ হেরি শরমে সে হয় সারা।”
৫. ইসাবেল মার্জেসন (১৮৬৩ - ১৯৪৬)- ছিলেন লন্ডনের সিসেমি ক্লাবের প্রতিষ্ঠাত্রী। নারীমুক্তি আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন এবং দরিদ্র নারীদের জন্যে কাজ করেছেন।
৬. ‘The Master as I Saw Him’, 1910, Published by Longman Green and Co.
৭. ‘The Master as I Saw Him’, নবম সংস্করণ, উদ্বোধন কার্যালয়, পৃ: 3, 4
৮. তদেব, পৃ: 4
৯. তদেব, পৃ: 10
১০. তদেব, পৃ:. 10
১১. ‘বিবেকানন্দের মহাপ্রয়াণে রবীন্দ্রনাথের কবিতা’, জগদীশ ভট্টাচার্য, প্রথম প্রকাশ, ২০০৪, প্রকাশক ভারবী, পৃ. ৬১
১২. ‘The Master as I Saw Him’, পৃ: 12
১৩. তদেব, পৃ: 21, 22
১৪. তদেব, পৃ: 28
১৫. তদেব, পৃ: 20
১৬. জোসেফিন ম্যাকলাউড (১৮৫৮ - ১৯৪৯) স্বামিজীর সঙ্গে প্রথম পরিচয় ২৯ জানুয়ারী ১৮৯৫ নিউ ইয়র্কের এক বক্তৃতা সভায়। স্বামিজীর শিষ্যা নন তিনি, তাঁর সঙ্গে জোসেফিনের বন্ধুত্বের সম্পর্ক, আজীবন স্বামী বিবেকানন্দের বাণী তিনি প্রচার করেন।
১৭. মিসেস ওলি বুল (১৮৫০ - ১৯১১) সম্পূর্ণ নাম সারা চ্যাপমান বুল। তাঁর স্বামী ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত বেহালাবাদক ওলি বুল। সারা ছিলেন অত্যন্ত ধনী এবং বৃহৎ ব্যবসায়ের পরিচালিকা। স্বামিজীর প্রতি তিনি অত্যন্ত স্নেহপরায়ণা ছিলেন, এবং তাঁকে তাঁর সংকল্পের কাজে যথেষ্ট অর্থসাহায্যও করেছেন। জগদীশচন্দ্র বসুকেও তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন ও পাশ্চাত্য দেশে নানাভাবে তাঁকে সহায়তা দান করেছেন।
১৮. স্বামী সদানন্দ (১৮৬৫ - ১৯১১) জন্মসূত্রে নাম শরৎচন্দ্র গুপ্ত। সম্ভবত স্বামিজীর প্রথম শিষ্য, ‘গুপ্ত মহারাজ’ বলে ডাকতেন সকলে।
১৯. ‘The Master as I Saw Him’, P. 32
২০. সেভিয়ার দম্পতি: ক্যাপ্টেন জেমস হেনরি সেভিয়ার (? - ১৯০০) ও শার্লট এলিজাবেথ সেভিয়ার (১৮৪৭ -১৯৩০)। প্রথম সাক্ষাৎ থেকেই স্বামী বিবেকানন্দের আপনজন। স্বামিজী তাঁদের ‘পিতাজী’ এবং ‘মা’ বলে সম্বোধন করতেন। হেনরি সেভিয়ার ছিলেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার। হিমালয়ের কোলে মঠ স্থাপনের ইচ্ছা স্বামিজীর ছিল, সেই ইচ্ছা সেভিয়ার দম্পতি পূরণ করেন। ১৯ মার্চ, ১৮৯৯ সালে তাঁরা মায়াবতীতে জমি দেখেন এবং পরবর্তীকালে সেখানেই ‘অদ্বৈত আশ্রম’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
২১. স্বামী স্বরূপানন্দ (০৮. ০৭. ১৮৭১ - ২৭. ০৬. ১৯০৬): জন্মসূত্রে নাম অজয়হরি বন্দ্যোপাধ্যায়। স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্য।
২২. ‘The Master as I Saw Him’, P. 88
২৩. তদেব, পৃ:. 88
২৪. তদেব, পৃ: 69
২৫. তদেব,পৃ:. 96
২৬. তদেব, পৃ:97
২৭. তদেব, পৃ:97
২৮. তদেব, পৃ: 97
২৯. তদেব, পৃ: 84
৩০. ‘বিবেকানন্দের মহাপ্রয়াণে রবীন্দ্রনাথের কবিতা’, পৃ. ৫২, ৫৩
৩১. তদেব, পৃ. ৫৪
৩২. ‘The Master as I Saw Him’, পৃ: 103
৩৩. ‘Letters of Sister Nivedita’, Vol. I, পৃ: 17
৩৪. ‘Letters of Sister Nivedita’, Vol. II, পৃ: 138
৩৫. ‘The Master as I Saw Him’, পৃ: 117
৩৬. সরলা দেবী (১৮৭২ - ১৯৪৫) স্বর্ণকুমারী দেবীর বহুগুণান্বিতা কন্যা। নিবেদিতার সঙ্গে প্রথম পর্যায়েই আলাপ করেন, স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ে তাঁরও ঔৎসুক্য ছিল, জাতীয় চেতনা জাগরণে বিশেষত দেশের তরুণদের দেহে ও মনে বলিষ্ঠ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন করে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদিকা ছিলেন। ১৯০০ সালে স্বামী বিবেকানন্দ যখন পাশ্চাত্যে যান, নিবেদিতাও তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলেন, সরলা দেবীরও যাবার কথা ছিল, শেষপর্যন্ত যাওয়া হয়নি।
৩৭. ‘Letters of Sister Nivedita’, Vol. I, পৃ: 37
৩৮. সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭২ - ১৯৪০) সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র।
৩৯. Christine, Cristine Greenstidel (১৮৬৬ - ১৯৩০) স্বামিজীর জার্মান শিষ্যা, ১৪ ফেব্রুয়ারী ১৮৯৪ সালে স্থানীয় ইউনিটোরিয়াম চার্চে স্বামিজীর বক্তৃতা শোনেন ও উদ্ধুদ্ধ হন। ৭ এপ্রিল ১৯০২ সালে ভারতে আসেন নারীশিক্ষা বিস্তারের কাজে নিবেদিতার সাহায্যকল্পে।
৪০. ‘ভগিনী নিবেদিতা’, প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা, পৃ. ১৩০
৪০ক. ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’, গীতবিতান, পূজা পর্যায়
৪১. ‘The Master as I Saw Him’, পৃ: 120
৪২. স্বামী যোগানন্দ (১৮৬১ - ১৮৯৯) জন্মসূত্রে নাম যোগীননাথ রায় চৌধুরী, শ্রীরামকৃষ্ণদেবের শিষ্য।
৪৩. ‘The Master as I Saw Him’, পৃ: 120
৪৪. শ্রীমা সারদাদেবী (২২ ডিসেম্বর ১৮৫৩ - ২০ জুলাই ১৯২০)
৪৫. ‘The Master as I Saw Him’,পৃ:138
৪৬. দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৫ মে ১৮১৭ - ১৯ জানুয়ারী ১৯০৫)
৪৭. ‘The Master as I Saw Him’, P. 138
৪৮. স্বামী তুরীয়ানন্দ (৩ জানুয়ারী ১৮৬৩ - ২৮ ডিসেম্বর ১৯২২) জন্মসূত্রে নাম হরিনাথ চট্টোপাধ্যয়, ‘হরি মহারাজ’ নামে পরিচিত ছিলেন।
৪৯. লেগেট দম্পতি : ফ্রান্সিস হেনরি লেগেট (১৮৪০ - ১৯০৯) ও বেটি লেগেট (১৮৫২ - ১৯৩১) মিস্টার লেগেট ছিলেন বিত্তবান ব্যবসায়ী ও মিসেস লেগেট ছিলেন জোসেফিন ম্যাকলাউডের বোন।
৫০. ‘Kali the Mother’, নিবেদিতার প্রথম প্রকাশিত বই, প্রকাশকাল ১৯০০, প্রকাশক Swan Sonnenschein & Co.
৫১. প্যাট্রিক গেডেস: (২ অক্টোবর ১৮৫৪ - ১৭ এপ্রিল ১৯৩২)
৫২. ‘ভগিনী নিবেদিতা’, প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা, পৃ. ১৮৩
৫৩. জগদীশচন্দ্র বসু (৩০ নভেম্বর ১৮৫৮ - ২৩ নভেম্বর ১৯৩৭)
৫৪. রমেশচন্দ্র দত্ত (১৩ আগস্ট ১৮৪৮ - ৩০ নভেম্বর ১৯০৯) স্বনামধন্য প্রতিভাবান আই. সি. এস., পরাধীন ভারতে যোগ্যতার বিচারে যথেষ্ট পদোন্নতির সম্ভাবনা নেই বুঝে পদত্যাগ করেন ১৮৯৭ সালে। এরপর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস অধ্যাপনা এবং সেই সঙ্গে ভারতীয় ইতিহাস ও অর্থনীতি সম্বন্ধে গবেষণা করেন। ১৯০৪ সালে ভারতে ফিরে বরোদা রাজ্যে অর্থমন্ত্রীরূপে যোগ দেন ও অল্পদিনেই দেওয়ান হন। পাবনায় প্রজাবিদ্রোহ শুরু হলে ‘ARCYDAE’ নামে বেঙ্গল ম্যাগাজিনে বহু প্রবন্ধ লেখেন। বহু মূল্যবান গবেষণা গ্রন্থের রচয়িতা। জাতীয় কংগ্রেসেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন।
৫৫. ‘The Web of Indian Life’: নিবেদিতার দ্বিতীয় প্রকাশিত বই, প্রকাশকাল ১৯০৪, প্রকাশক William Heinemann। রমেশচন্দ্র দত্ত দ্বারা অনুরুদ্ধ হয়ে নিবেদিতা ভারতীয় সমাজজীবন প্রসঙ্গে এই বইটি লেখেন।
৫৬. ওকাকুরা (১৪ ফেব্রুয়ারী ১৮৬৩ - ২ সেপ্টেম্বর ১৯১৩) পুরো নাম ওকাকুরা কাকুজো, ‘Asia is One’ এই বাণীকে বাস্তবায়িত করতে চেয়েছিলেন। David. B. Gordon-র লেখা ‘Vivekananda and Okakura — On What East Offers West’ বইটি এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়।
৫৭. রবিজীবনী, পঞ্চম খণ্ড, পৃ. ৬৪
৫৭ ক. ‘দিন অবসান হল’, গীতবিতান, পূজা পর্যায়
৫৮. ‘The Master as I Saw Him’, পৃ:. 328
৫৯. তদেব, পৃ: 331
৬০. তদেব, পৃ: 331
৬১. তদেব, পৃ:. 332