সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক
কালধ্বনি
In Search of a decent living
জীবনের অন্বেষণে
আমাদের দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি গভীরভাবে জল ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িয়ে, কারণ ৬৫% ভারতীয়, কৃষির উপর নির্ভরশীল আর কৃষি উৎপাদনশীলতা সরাসরি জল এবং মাটির মতো প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে যুক্ত । ভারতে ৫০০০ এর বেশি বড় নদী বাঁধ ও তাদের ক্যানেল নির্ভর সেচ দেশের পুরো সেচ জমির মাত্র ২৫% প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম। বর্তমানে খরা প্রবণ পশ্চিম ও মধ্যভারতের বিস্তীর্ণ মালভুমি অঞ্চলে এই সীমাবদ্ধতা প্রায় সকলেই লক্ষ্য করছেন। অন্যদিকে ভারতবর্ষে গত শতাব্দীর পাঁচের দশক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা এই সব অঞ্চলে জল বিভাজিকা উন্নয়নে খরচ হলেও সফল জল বিভাজিকার সংখ্যা হাতে গোনা। একই সঙ্গে এটাও ভাবার মতো ব্যাপার যে সফল জল বিভাজিকা উন্নয়ন যা দীর্ঘ মেয়াদী গ্রাম উন্নয়নের ভিত্তি, সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব কতটা। আমাদের দেশে এটা খুব স্পষ্ট নয় যে জল বিভাজিকা উন্নয়নের বিনিয়োগের প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতিতে কি হতে পারে যা বড় বাঁধ নির্মাণের সময় হিসাব করা হয়। অথচ এই উন্নয়নে যদি গ্রামীণ উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বাড়ে তাহলে তার প্রভাব সামগ্রিক ভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে পড়তে বাধ্য। কিন্তু যেহেতু ক্ষুদ্র-জলবিভাজিকা উন্নয়নে কোন বড় সিভিল পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ হয় না কেবল বিকেন্দ্রীভুত পরিকল্পনায় ছোট ছোট বিনিয়োগ হয় তাই এই বিনিয়োগকে মূলত ভর্তুকি বা সমাজ উন্নয়ন হিসাবে ধরা হয়। বহুবছর ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে বিশেষ করে মধ্য ভারতের খরা প্রবণ এলাকায় ওয়াটারশেড বা জল বিভাজিকা উন্নয়নের কাজে যুক্ত থাকার সুযোগে এই ব্যাপারটা আমাকে বারবার ভাবিয়েছে। আমাদের দেশের মতো ভৌগলিক বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশে এই উন্নয়নের তাৎপর্য বুঝতে গেলে অবশ্যই জলবিভাজিকাকে সেই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি, পরিবেশ ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রয়োজন।
সরকারি প্রকল্পের খামার স্তরের ভর্তুকি এবং কৃষি ঋণের মাধ্যমে কৃষকরা কেবল তাদের নিজেদের খামারের মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার, পুকুর তৈরি, ড্রিপ সেচ, পলিহাউস ইত্যাদির মতো নতুন প্রযুক্তি স্থাপনের মতো কাজ করতে পারে। কিন্তু একজন কৃষক কেবল তার নিজের খামারে কাজ করে তার উৎপাদনশীলতা কতটা উন্নত করতে পারে তার একটি সীমা আছে, বিশেষ করে যখন পরিবার প্রতি জমির মালিকানা ক্রমশ কমছে। প্রাকৃতিক সম্পদের ভিত্তি কেবলমাত্র কৃষি জমির সীমানাকে মেনে চলে না, তা নির্ভর করে জলবায়ু, জমির অবস্থান, ভূ-জলবিদ্যা, মাটির অবস্থা এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নির্ভর প্রাকৃতিক সীমানার উপর। সুতরাং প্রাকৃতিক সম্পদ নির্ভর গ্রাম উন্নয়নের জন্য জল বিভাজিকা এবং নদী অববাহিকার মতো প্রাকৃতিক সীমানা ভিত্তিক, বিকেন্দ্রীভূত, গ্রাম উন্নয়নই সঠিক পথ। কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে সরকারি সম্পদের বেশিরভাগ পরিকল্পনা এবং বরাদ্দ মানুষের তৈরি প্রশাসনিক সীমানা নির্ভর, যেমন গ্রামের সীমা যা গ্রাম পঞ্চায়েত দ্বারা পরিচালিত এবং তারপর ব্লক এবং জেলা, জেলা পরিষদ দ্বারা পরিচালিত, যা প্রাকৃতিক সীমানা অনুসরণ করে না। মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন, প্রাকৃতিক সীমানা নির্ভর গ্রাম উন্নয়নে ব্যবহার করা যেতে পারত কিন্তু পশ্চিম বঙ্গ সরকারের ঊষর মুক্তির মতো কিছু অল্প প্রকল্প ছাড়া নদী অববাহিকা ভিত্তিক গ্রামীণ জল সম্পদ তৈরিতে এই প্রকল্পের ব্যবহার তেমন দেখা যায় না।
একটু গভীর ভাবে দেখলে বোঝা যায় যে জল বিভাজিকা বর্ষার জল দ্বারা তৈরি প্রাকৃতিক সীমানা যা সেই অঞ্চলের ইকোসিস্টেমের একটা একক, যাদের সমষ্টিগত অবস্থানে এক বৃহত্তর নদী অববাহিকার ইকোলজি গড়ে ওঠে। যার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সেখানকার জলবায়ু, পাথর, মাটি, উদ্ভিদ, জীবজগৎ এবং যার উপর নির্ভর করে পরবর্তী সময়ে সেখানে মানুষের বাসস্থান, জীবন ও জীবিকা গড়ে ওঠে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই এই ক্ষুদ্র জল বিভাজিকার একককে ধরে কোন প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর গ্রাম সমাজ ও গ্রাম উন্নয়ন, এক বিজ্ঞান সম্মত প্রচেষ্টা। যে ভাবে এই জলবায়ু পরিবর্তনের সময় দেশের বিভিন্ন ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়ছে সেই সময় জল বিভাজিকা উন্নয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রকল্প কোন অঞ্চলের ভেঙে পড়া ইকোসিস্টেম বা ক্ষয়িষ্ণু প্রাকৃতিক সম্পদের পুনর্জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের - মূলত খরা-প্রবণ দারিদ্র্য প্রভাবিত অঞ্চলে - জীবিকার সাহায্যের জন্য গ্রামের মানুষের কাছে, বেশিরভাগ সময়েই এই ধারণা নিয়ে আসে ওপর থেকে সরকারি বা বেসরকারি স্বশাসিত সংগঠন। কিন্তু উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া এই উন্নয়নের প্রক্রিয়া বেশিরভাগ সময়েই স্থানীয় মানুষের কাছে খুব একটা স্পষ্ট হয় না, বহু সময়তো ক্ষুদ্র জল বিভাজিকাকে তারা মাঠে বুঝতে পারে না, অথচ এর সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িয়ে থাকে তাদের জল-জমি-জংগল। এছাড়াও ক্ষুদ্র জলবিভাজিকে উন্নয়নে আর্থ-সামজিক ও পরিবেশের উপর এর গুরুত্ব নিয়ে বহু সময়েই সঠিক চিন্তা করা হয় না।
ঝাড়খণ্ড, পশ্চিম উড়িষ্যা, ছত্তিসগড়ের মতো মধ্যভারতের মালভুমি অঞ্চলে কাজের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারি যে সঠিক পরিকল্পনার সাথে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় ক্ষুদ্র জল-বিভাজিকা উন্নয়নের কাজ হলে, সম্পূর্ণ বিনিয়োগ, প্রজেক্ট সম্পূর্ণ হওয়ার ২ বছরের মধ্যে ফেরত আসা সম্ভব। এই আলোচনায় আমরা একটি ক্ষুদ্র-জলবিভাজিকা উন্নয়নের অর্থনৈতিক বিনিয়োগের রিটার্ন নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতার আলোচনা করব। আমরা ২০১৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত খরাপ্রবণ কোডারমা জেলার মাইকা খনি অঞ্চলের দেওপুর গ্রামকেন্দ্রিক একটি ক্ষুদ্র-জলবিভাজিকা উন্নয়নে কাজ করি। দেওপুর ক্ষুদ্র জল বিভাজিকাটি ঝাড়খণ্ড ও বিহার সীমান্তে, সকড়ি নদী অববাহিকায়, এক জংগলঘেরা পাহাড়ি অঞ্চল। খরা প্রধান কৃষি নির্ভর এই গ্রামের জনসংখ্যা প্রায় ৬৫০। কৃষিকাজ মূলত বর্ষার ধান ও ভুট্টা চাষের উপর নির্ভরশীল। সময়ে জলের অভাবে বছর বছর ফসলের ক্ষতি হয় যার ফলে এখনকার মানুষের আয় খুব কম। দেওপুরের মানুষ, চাষের জলের জন্য, গ্রামের একটু উপরের পাহাড়ের ধারের দুটি বড় চ্যাটালো নিচু জায়গাকে বড় জলাশয়ে পরিবর্তন করার চেষ্টা করে। তাদের জায়গা নির্বাচন সঠিক ছিল এবং নিজেরাই একদিকে বড় মাটির বাঁধ দিয়ে সেখানে জল আনার চেষ্টা করে। স্থানীয় ভাষায় এই জলাশয়কে এঁরা ‘আহার’ বলেন। কিন্তু সেই বড় আহার দুটিতে বছরের বেশিরভাগ সময়ই জল থাকত না কারণ আহার দুটি বর্ষার জলে পুরোপুরি ভরত না। কারণ পাশের পাহাড়ের বর্ষার জল আহারের থেকে প্রায় আধ কিমি দূরের এক নালা দিয়ে বেরিয়ে যায়। সেই নালার গতিপথ বন্ধ করে গ্রামের মানুষ নিজেদের পরিশ্রমে বাইরের কোন সাহায্য ছাড়াই, পাহাড়ের ধারের পাথর ও মাটি কেটে আধ কিমি লম্বা এক ক্যানেল বানিয়ে জল আনার চেষ্টা করে। কিন্তু বর্ষার জল পাহাড়ি ঢাল দিয়ে তার গতিপথ খুঁজে পুরানো নালা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে তাদের চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেয়। গত ১৫ বছরে অসংখ্য বার চেষ্টা করেও স্থানীয় মানুষ আহারে জল আনতে পারে না, এবং কোন সরকারি সাহায্যও এই প্রান্তিক গ্রামে আসে না।
রুক্ষ পাথুরে এই ৮৫২ হেক্টর জলবিভাজিকার মাত্র ১১৩ হেক্টর এলাকা কৃষিক্ষেত্র বাকি ৮৫% ক্ষয়িষ্ণু শেষ হয়ে যাওয়া ঝোপঝাড় ঢাকা বনাঞ্চল ও শুষ্ক টাঁড় পাথুরে জমি আর কিছু গাছপালাসহ বসতি, নালার ধারে কিছু প্রাকৃতিক জলাশয় ছিল যা বছরের বেশিরভাগ সময় শুকনো থাকতো। এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বছরে গড়ে ১০০০ মিমি থেকে ১১০০মিমি। যার অর্থ প্রায় ৭১০ লক্ষ ঘন মিটার বৃষ্টির জল এই জলবিভাজিকার উপর দিয়ে বয়ে যায়, যা স্থানীয় চাষের এবং মানুষের প্রয়োজনের থেকে অনেক বেশি। তা সত্ত্বেও সঠিক জল সংরক্ষণের অভাবে গরমে গ্রামের কুয়ো প্রায় শুকিয়ে যেতো এবং কুয়োর তলানি জলের জন্য সকাল থেকে গ্রামের মেয়েরা হা পিত্যেশ করে বসে থাকতেন।
আমাদের কাজ শুরুর আগে গ্রামে মোট জল ধরার মতো না-সংস্কার করা জলাশয়ের জলধারণ ক্ষমতা ছিল মাত্র ৬২ হাজার ঘন মিটার যা বেশির ভাগ সময়েই শুকনো থাকতো। আমাদের কাজ শুরু হয় আহারে জল আনার মধ্যে দিয়ে, পাহাড়ের যে জায়গা দিয়ে জল বেরিয়ে যেতো তা ছিল জল প্রবাহের প্রাকৃতিক গতিপথ। সেই গতিপথের উপরের দিকে আহারের ধারণ ক্ষমতার প্রয়োজনাতিরিক্ত জল হিউম পাইপের মধ্যে দিয়ে ঐ বিশেষ জায়গাকে অতিক্রম করিয়ে এনে গ্রামের মানুষের তৈরি ক্যানেলের মাধ্যমে আহারে নিয়ে যাওয়ায়, আহার প্রথম বছরে সম্পূর্ণ ভরে যায়, দেওপুরের মানুষের বিশ্বাস বাড়ে।
ধীরে ধীরে পরের ছয় বছরে গ্রামের মানুষের উৎসাহে ও সক্রিয় অংশগ্রহণে সঠিক পরিকল্পনামাফিক জল বিভাজিকার কাজ এগোতে থাকে। তারা জানত গাছ ও জঙ্গলের প্রয়োজনীয়তা এবং গ্রামের কাছের জঙ্গল সংরক্ষণে গ্রামের মানুষের বিশেষ করে মহিলাদের অংশগ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জল বিভাজকার ধারণা বুজতে পরায় তারা পতিত ট্যাঁড় জমিতে গাছ লাগানো ও জঙ্গলের ভিতর নালা ও ভুমি সংরক্ষণের সঙ্গে তাদের মাঠের চাষের ও ব্যবহারের জলের সম্পর্ক বুঝতে পারে। তাদের ছয় বছরের কাজের ফলে জঙ্গল বাড়তে থাকে এবং ভূগর্ভস্থ জলের স্তর ধীরে ধীরে উপরে উঠতে থাকে, গত তিন বছরে সমস্ত কুয়োয় গরমের সময়ও পর্যাপ্ত জল থাকে, নালার জলের বহমানতা প্রায় তিন মাস বেড়ে যায়। কাজের শেষে দেখা যায় গ্রামে ১৮৬০০ ঘন মিটার জল ধারণ ক্ষমতার ব্যবস্থা করা হয়েছে যেখানে সারা বছর জল থাকে, গ্রামের চাষের জমির মাটিতে আর্দ্রতা অনেক বেড়েছে। বর্তমানে এই পরিবর্তন ঝাড়খণ্ডের প্রান্তিক গ্রাম দেওপুরের মানুষের জীবন ও জীবিকার আমুল পরিবর্তন করেছে।
এখন দেখা যাক জলবিভাজিকা উন্নয়নে বিনিয়োগের পরিপ্রেক্ষিতে কি পরিবর্তন হয়েছে দেওপুর গ্রামে! একটা সহজ রক্ষণশীল হিসাবের মাধ্যমে দেখা যেতে পারে। এই ক্ষুদ্র-ওয়াটারশেড থেকে আগে গ্রামের মোট সর্বোচ্চ আয় হতো প্রায় ৮০ লক্ষ ৫১ হাজার টাকা (সারণি-১)। ধরে নিচ্ছি যে ধানের উৎপাদনশীলতা জেলার গড় ধানের উৎপাদনশীলতা এবং এমনকি উঁচু জমির ফলের গাছের মূল্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদিও বারবার সময়ে জলের অভাবে ফসল নষ্ট হত। এই গ্রামে জলের অভাবের জন্য রবি মরশুমে কোন চাষ না ধরলেও জলের পরিমাণের কথা ভেবে মাছ চাষের কথাও হিসাব করা হয়েছে, যদিও গ্রামের মানুষ জলের অভাবের জন্য আগে কখনো মাছ চাষ করার কথা ভাবেনি। এই হিসাবে অবশ্য বনজ উৎপাদন থেকে যে ন্যূনতম আয় হত তা বিবেচনা করা হয়নি। এছাড়াও গ্রামের বড় অংশের মানুষ পরিযায়ী শ্রমিকের কাজে বাইরে যেত সেই হিসাবও এই আলোচনার অংশ নয়।
জল বিভাজিকার কাজ শেষ হবার পর হিসাবে দেখা যায় যে এই ছয় বছরে মোট ৫২ লক্ষ টাকা খরচ করা হয় এর উন্নয়নে। কিন্তু আমরা যদি ২০২৪ এর পর বাৎসরিক উৎপাদন ও আয়ের এক সহজ রক্ষণশীল হিসাব করি তাহলে দেখবো, এখন বাৎসরিক মোট আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা, (সারণি-২)। অর্থাৎ যা কিনা জল বিভাজিকার কাজ শুরু হওয়ার আগের থেকে ৯৯.৬৩ লক্ষ টাকা বেশি। এই সহজ হিসাবে ধানের ফলন মাত্র ২৫% বেড়েছে বলে ধরা হয়েছে। রবি চাষে কেবল মাত্র ৩০% জমিতে গম ও সর্ষে চাষ ধরা হয়েছে যা বর্তমানে বেড়ে ৫০% এর বেশি হয়েছে। এছাড়া নিয়মিত সব্জি চাষের হিসাব ধরা হয়নি, দেওপুরের চাষিরা এখন নিয়মিত বাদাম চাষও করছে। এখানকার তৈরি হওয়া ৪০ টার বেশি জলাশয়ে এখন নিয়মিত মাছ চাষ হয়। কিন্তু মাছের উৎপাদনশীলতা ন্যূনতম ০.৫ কিলো প্রতি ঘন মিটার জলের হিসাবে ধরা হয়েছে, বর্তমানে যেখানে মাছের উৎপাদনশীলতা তার থেকে বেশী। অব্যবহৃত উঁচু জমিকে বর্তমানে উৎপাদনশীল করে ৩০০০ এরও বেশি গাছ লাগানো হয়েছে তবে গণনায়, কেবলমাত্র ১০০০ ফলের গাছকে বিবেচনা করা হয়েছে। উপরের হিসাবে দেখা যায় ছয় বছরে ৫২ লক্ষ টাকার বিনিয়োগের বিনিময়ে দেওপুর জলবিভাজিকায় বার্ষিক মোট আয় বেড়েছে ১.৮০ কোটি টাকা। এখন আমরা যদি এই মোট আয়ে, ফসলের ক্ষেত্রে ৩০% লাভ ধরি, মাছ চাষে ৬০% লাভ ধরি এবং বাগানে ৫০% লাভ ধরি, তাহলে দেখবো ২০১৮-র আগে যেখানে লাভ হতো ৩৩ লক্ষ ৪৭ হাজার টাকা (প্রকৃত লাভ এর থেকে অনেক কম হতো), তা ২০২৪- র পর বেড়ে হয়েছে ৮৩ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা, লাভ বেড়েছে ৪৯ লক্ষ ৬৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ যত টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছিল ৬ বছরে তার প্রায় ৯৫%-ই এক বছরে ফিরে আসে। এছাড়া বিগত ছয় বছরে প্রতি বছর যে ধাপে ধাপে আয় বেড়েছে তা এখানে ধরা হয়নি। সেই লাভ ধরলে প্রজেক্ট শেষের এক বছরের মধ্যে বিনিয়োগ করা টাকার পুরোটাই ফিরে আসে।
এখনকার চাষের জমিতে মাটির আর্দ্রতা অনেক বেশি এবং সেচের সুবিধা অনেক বেড়েছে কারণ সারা বছর সব পুকুরে এখন জল থাকে। এটিও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে কৃষি জমিতে পুকুর তৈরির পরে সামগ্রিক ভাবে গ্রামে ফসলের ধরন পরিবর্তিত হয়েছে এবং উৎপাদনশীলতার আমুল পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে গ্রামের চাষিদের উদ্যোগে ও উৎসাহে দেওপুর ওই অঞ্চলের সব্জি উৎপাদনে এক মুখ্য ভুমিকা পালন করছে। প্রায় ২৫% পরিবার কেবল বেগুন বিক্রি করে বছরে ২৫০০০ থেকে ৩০০০০ টাকা লাভ করে যা এই হিসাবে ধরা হয়নি। গ্রামে পলায়ন বা বাইরে যাবার প্রবণতা অনেক কমেছে। স্থানীয় সুত্রে শোনা যায় যে কোডারমার জেলাশাসক ২০২৩ সাল নাগাদ দেওপুরকে আদর্শ গ্রাম বা মডেল গ্রাম হিসাবে ঘোষণা করার কথা বলে।
উপরের হিসাব সাধারণ ক্ষুদ্র জলবিভাজিকায় উন্নয়নের বিনিয়োগের ও তার থেকে রিটার্নের এক সহজ হিসাব, যা আমরা অন্য জল বিভাজিকায়ও দেখে থাকি। পশ্চিমবাংলা ও ঝাড়খণ্ড সীমান্তে বীরভূম জেলার ময়ূরাক্ষী নদীর অববাহিকায় রাজনগর ব্লকের এক গ্রামে নিবিড় সমন্বিত ক্ষুদ্র জল বিভাজিকা উন্নয়নের পরিকল্পনার হিসাবে একই ফল দেখা যায়। এই জলবিভাজিকা মাত্র ২৯০ হেক্টর, যার ৩২% চাষের জমি, ২৯% বনভুমি অঞ্চল, ২৬% মতন পতিত ট্যাঁড় জমি এবং বাকি গ্রামের বসতি, গাছপালা ও জলাশয়। এই জলবিভাজিকা উন্নয়নে পাঁচ বছরে ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে তার রিটার্নও ২ বছরেই প্রজেক্ট শেষের দুই বছরে হবে। এছাড়াও এই জলবিভাজিকা উন্নয়নে প্রতি বছর কার্বন-ডাই-অক্সাইড সিকোয়েস্ট্রেশনের (CO2 sequestration) পরিমাণ হবে ২৩৫ টন।
বেশিরভাগ সময়ই যে সব সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান এই পদ্ধতিতে কোন বিশেষ অঞ্চলের উন্নয়নের চেষ্টা করে তাদের সেই সব জল বিভাজিকার গঠন ও ইকোসিস্টেমের বিভিন্ন অংশ ও সেই সব অংশের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্বন্ধে কোন সম্যক ধারণা থাকে না। এই ব্যপারে তারা নির্ভর করে স্থানীয় গ্রামের মানুষের উপর, কিন্তু অর্থনৈতিক দারিদ্র্য প্রভাবিত অঞ্চলের মানুষ যখন অভাবের তাড়নায় নিজেদের অস্তিত্ত্বের সঙ্কটে রয়েছে তখন তাদের পক্ষে স্বাভাবিক কারণেই সামগ্রিক ভাবে জল বিভাজিকা উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে সঠিক ভাবে বোঝার থেকে উন্নয়নের কাজের, মূলত জমিতে জল ও ভুমি সংরক্ষণের বহু ব্যবহৃত পরিকাঠামো যেমন কন্টুর ট্রেঞ্চ, পুকুর, বন সৃজন ইত্যাদি তৈরির মাধ্যমে তাদের নিজেদের রোজগার বাড়ানোর দিকে নজর দিতে বাধ্য হয়। ফলে বেশিরভাগ সময়েই স্থানীয় মানুষ যে জল বিভাজিকা ও তার ইকো সিস্টেম যা তাদের একসঙ্গে বেঁধে রেখেছে তার দীর্ঘ মেয়াদী উন্নয়নের জন্য জল বিভাজিকা গোষ্ঠী তৈরির প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারে না। অথচ এই গোষ্ঠীই ক্ষুদ্র জল বিভাজিকা উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকার কথা যা ভবিষ্যতে জল বিভাজিকার পুরো ইকসিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের পরিবেশ ও অর্থনীতিকে রক্ষা করবে। ভারতবর্ষে জল বিভাজিকা উন্নয়নের ব্যর্থতায় স্থানীয় মানুষের গোষ্ঠীগত ভাবে ভাগীদারিত্বের অভাব এক বড় কারণ।
সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যারা জল বিভাজিকা উন্নয়নে যুক্ত তাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে অঞ্চলের মানুষের জন্য কৃষির সেচ ও কৃষি ভিত্তিক বিকল্প জীবিকা তৈরি। তাদের কাছে জল বিভাজিকার ইকোসিস্টেমের সামগ্রিক পুনর্জীবন খুব একটা গুরুত্ব পায় না। এর ফলে ছক বাঁধা ওয়াটারশেডের পরিকাঠামো সেখানকার মানুষের জীবিকায় কিছু সাময়িক পরিবর্তন আনলেও তা দীর্ঘমেয়াদী হয় না। ইকোসিস্টেমে বড় পরিবর্তন না আসা এবং ইকোসিস্টেম পুনর্জীবনে সামাজিক ভাগীদারিত্বের অভাবে প্রজেক্ট শেষ হওয়ার পর থেকেই তা আবার পুরানো অবস্থায় ফিরতে থাকে। এই প্রসঙ্গে যে বিষয় খুব চোখে পড়ার মতো তা হলো বেশিরভাগ সময় এই প্রজেক্ট শেষ হবার পর সার্ভেতে দেখা হয় কত মানুষের জীবিকা তৈরি হয়েছে ও পরিবার প্রতি বার্ষিক/মাসিক আয় কতো বেড়েছে দেখা হয়। কিন্তু খুব কম জল বিভাজিকায় যত টাকা জল বিভাজিকা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হয়েছে তার সামগ্রিক অর্থনৈতিক রিটার্ন কতো সে ব্যপারে খুব কম তথ্য পাওয়া যায়। যদি সামগ্রিক রিটার্ন যথেষ্ট হয় তা স্থানীয় মানুষের ভাগীদারিত্ব আরও বাড়ায়। ভারতে নদী অববাহিকা বা জল বিভাজিকা উন্নয়ন কেবলমাত্র বৃষ্টির জল সংরক্ষণের বিষয় নয়, অর্থনীতি ও পরিবেশ উন্নয়নে এর প্রভাব সুদুর প্রসারী হতে পারে। দেশের নীতি নির্ধারণে এই উন্নয়ন মূলত ক্ষুদ্র সেচ ও জীবিকা বৃদ্ধির সাথে জড়িত ভর্তুকি হিসাবে ধরা হয় অথচ এই উন্নয়নকে সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে দেখার প্রয়োজন। এতে ভবিষ্যতে গ্রামোন্নয়নে প্রাকৃতিক সম্পদ পুনর্নবীকরণে সঠিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়বে ও গ্রামীণ অর্থনীতি ও পরিবেশের সামগ্রিক উন্নতি হবে।